সনাতন ধর্মের সুনির্বাচিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু শ্লোকঃ- দেখতে- সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর  ক্লিক করুন- 

ভক্ত ও ভক্ত সম্বন্ধীয়ঃ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক

"শ্লোক:
বাঞ্ছাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপাসিন্ধুভ্য এব চ৷
পতিতানাং পাবনেভ্যোঃ বৈষ্ণবেভ্যো নমো নমঃ৷৷ "
অনুবাদঃ- আমি সমস্ত বৈষ্ণবগণকে পুনঃপুনঃ আমার সশ্রদ্ধ দণ্ডবৎ প্রণাম নিবেদন করি। তাঁরা ঠিক কল্পতরুর মতো সকলের বাঞ্ছা পূর্ণ করতে পারেন এবং তাঁরা সমস্ত পতিত জীবদের প্রতি পূর্ণরূপে দয়াশীল ।
শ্লোক:
যে মে ভক্তজনাঃ পার্থ ন মে ভক্ত্যাশ্চ তে জনাঃ ।
মদ্ভক্তানাং চ যে ভক্তাস্তে মে ভক্ততমাঃ মতাঃ ।।
(আদি পুরাণ)
অনুবাদঃ- শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন, "হে পার্থ! যারা কেবল আমারই ভক্ত, তাঁরা বস্তুত আমার ভক্ত নয়। কিন্তু যারা আমার ভক্তের ভক্ত তাদেরই উত্তম ভক্ত বলে জানবে।"
শ্লোক:
নৈষাং মতিস্তাবদুরুক্রমাঙ্ঘ্রিং
স্পৃশত্যনর্থাপগমো যদর্থঃ ।
মহীয়সাং পাদরজোহভিষেকং
নিষ্কিঞ্চনানাং ন বৃণীত যাবৎ ।।
(ভাগবত ৭/৫/৩২)
অনুবাদঃ- মানুষের মতি যতক্ষণ নিষ্কিঞ্চন ভগবদ্ভক্তদের শ্রীপাদপদ্মের ধূলির দ্বারা অভিসিক্ত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা অনর্থ নাশক কৃষ্ণ-পাদপদ্ম স্পর্শ করতে পারে না। (প্রহ্লাদ মহারাজ)
শ্লোক:
সতাং প্রসঙ্গান্মম বীর্যসংবিদো
ভবন্তি হৃৎকর্ণরসায়নাঃ কথাঃ।
তজ্জোষণাদাশ্বপবর্গবর্ত্মনি
শ্রদ্ধা রতির্ভক্তিরনুক্রমিষ্যতি।।
(ভাগবত ৩/২৫/২৫)
অনুবাদঃ- পারমার্থিক মহিমামণ্ডিত ভগবানের কথা ভক্তসঙ্গেই কেবল যথাযথভাবে আলোচনা করা যায় এবং সেই কথা শ্রবণে হৃদয় ও শ্রবণেন্দ্রিয় তৃপ্ত হয়। ভক্তসঙ্গে সেই বাণী প্রীতিপূর্বক শ্রবণ করতে করতে শীঘ্র মুক্তির বর্ত্মস্বরূপ আমার প্রতি প্রথমে শ্রদ্ধা, পরে রতি এবং অবশেষে প্রেমভক্তি ক্রমে ক্রমে উদিত হয়।
শ্লোক:
তুলয়াম লবেনাপি ন স্বর্গং নাপুনর্ভবম্ ।
ভগবৎসঙ্গিসঙ্গস্য মর্ত্যানাং কিমুতাশিষঃ ।।
(ভাগবত ১/১৮/১৩)
অনুবাদঃ- ভগবৎ সঙ্গীর নিমেষ মাত্র সঙ্গ দ্বারা জীবের যে অসীম মঙ্গল সাধিত হয়, তার সঙ্গে স্বর্গসুখ ভোগের বা মুক্তি লাভের কিছুমাত্র তুলনা করা যায় না, তখন মরণশীল মানুষের জাগতিক সমৃদ্ধির কথা আর কি বলার আছে ।
শ্লোক:
'সাধুসঙ্গ', 'সাধুসঙ্গ' - সর্বশাস্ত্রে কয় ।
লবমাত্র সাধুসঙ্গে সর্বসিদ্ধি হয় ।।
(চৈঃ চঃ মধ্য ২২/৫৪)
অনুবাদঃ- সমস্ত শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে, শুদ্ধ ভক্তের সঙ্গ যদি মুহূর্তের জন্যও লাভ করা যায়, তা হলেই সর্বসিদ্ধি লাভ হয়।
শ্লোক:
তর্কোহপ্রতিষ্ঠঃ শ্রুতয়ো বিভিন্না
নাসাবৃষির্যস্য মতং ন ভিন্নম্ ।
ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং
মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ ।।
(মহাভারত, বনপর্ব ৩১৩/১১৭)
অনুবাদঃ- তর্কের দ্বারা প্রকৃত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করা যায় না। পক্ষান্তরে, তার ফলে শ্রুতিসমূহ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় এবং যাঁর মত ভিন্ন নয়, তিনি ঋষি হতে পারেন না। তাই ধর্মতত্ত্ব গূঢ়রূপে আচ্ছাদিত হয়ে আছে, অর্থাৎ শাস্ত্র আদি পাঠ করে ধর্মতত্ত্ব পাওয়া কঠিন । সুতরাং যাঁকে মহাজন বলে সাধুরা স্থির করেছেন, তিনি যে পন্থাকে শাস্ত্রপন্থা বলেছেন, সেই পথেই সকলের অনুগমন করা উচিত। (যুধিষ্ঠির মহারাজ)
শ্লোক:
দুর্জনঃ পরিহর্তব্যো বিদ্যয়ালঙ্কৃতোহপি সন।
মণিনা ভূষিতঃ সর্পঃ কিমসৌ ন ভয়ঙ্করঃ ।।
( চাণক্য পণ্ডিত)
অনুবাদঃ- বিদ্যার দ্বারা অলঙ্কৃত হলেও দুর্জন ব্যক্তিকে পরিহার করা কর্তব্য। সে ঠিক একটি মণিভূষিত বিষাক্ত সর্পের মতো। সেই রকম সাপ কি ভয়ঙ্কর নয়?
শ্লোক:
তীর্থযাত্রা পরিশ্রম কেবল মনের ভ্রম
সর্বসিদ্ধি গোবিন্দচরণ।
(নরোত্তম দাস ঠাকুর, প্রার্থনা )
অনুবাদঃ- পরিশ্রম করে তীর্থভ্রমণ কেবল মনের ভ্রম মাত্র, কেন না পারমার্থিক প্রগতির জন্য গোবিন্দচরণকে আশ্রয় করলেই সর্বসিদ্ধি লাভ হবে ।
"শ্লোক:
মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ ।
আগমাপায়িনোহনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত ॥
(গীতা ২/১৪) "
অনুবাদঃ- হে কৌন্তেয় ! ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের সংযোগের ফলে অনিত্য সুখ ও দুঃখের অনুভব হয় ৷ সেগুলি ঠিক যেন শীত এবং গ্রীষ্ম ঋতুর গমনাগমনের মতো । হে ভরতকুল-প্রদীপ ! সেই ইন্দ্রিয়্জাত অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সেগুলি সহ্য করার চেষ্টা কর।
"শ্লোক:
যং হি ন ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষর্ষভ ।
সমদুঃখসুখং ধীরং সোহমৃতত্বায় কল্পতে ॥
(গীতা ২/১৫) "
অনুবাদঃ- হে পুরুষশ্রেষ্ঠ (অর্জুন) ! যে জ্ঞানী ব্যক্তি সুখ ও দুঃখকে স মান জ্ঞান ক রেন এবং শীত ও উষ্ণ আদি দ্বন্দ্বে বিচলিত হন না, তিনিই মুক্তি লাভের প্রকৃত অধিকারী।
শ্লোক:
বিপদঃ সন্তু তাঃ শশ্বত্তত্র তত্র জগদ্ গুরুো ।
ভবতো দর্শনং যৎ স্যাদপুনর্ভবদর্শনম্ ।।
(ভাগবত ১/৮/২৫)
অনুবাদঃ- হে জগদীশ্বর ! আমি কামনা করি যেন সেই সমস্ত সঙ্কট বারে বারে উপস্থিত হয়, যাতে বারে বারে আমরা তোমাকে দর্শন করতে পারি। কারণ, তোমাকে দর্শন করলেই আমাদের আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হবে না বা এই সংসার চক্র দর্শন করতে হবে না। (শ্রীকৃষ্ণের প্রতি কুন্তীদেবী)
"শ্লোক:
যং লব্ধ্বা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ
যস্মিন্ স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে ॥
(গীতা ৬/২২) "
অনুবাদঃ- পারমার্থিক চেতনায় অবস্থিত হলে যোগী আর আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান থেকে বিচলিত হন না এবং তখন আর অন্য কোন কিছু লাভই এর থেকে অধিক বলে মনে হয় না।
"শ্লোক:
উদ্ধরেদাত্মনাত্মানং নাত্মানমবসাদয়েৎ ৷
আত্মৈব হ্যত্মনো বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ ॥৫॥
(গীতা ৬/৫) "
অনুবাদঃ- মানুষের কর্তব্য তার মনের দ্বারা নিজেকে জড় জগতের বন্ধন থেকে উদ্ধার করা, মনের দ্বারা আত্মাকে অধঃপতিত করা কখনই উচিত নয়। মনই জীবের অবস্থা ভেদে বন্ধু ও শত্রু হয়ে থাকে ।
"শ্লোক:
চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢ়ম্ ৷
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্ ॥৩৪॥
(গীতা ৬/৩৪) "
অনুবাদঃ- হে কৃষ্ণ ! মন অত্যন্ত চঞ্চল, শরীর ও ইন্দ্রিয় আদির বিক্ষেপ উৎপাদক, দুর্দমনীয় এবং অত্যন্ত বলবান, তাই তাকে নিগ্রহ করা বায়ুকে বশীভূত করার থেকেও অধিকতর কঠিন বলে আমি মনে করি৷
"শ্লোক:
অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্ ৷
অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে ॥৩৫॥
(গীতা ৬/৩৫) "
অনুবাদঃ- পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে মহাবাহো ! মন যে দুর্দমনীয় ও চঞ্চল তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু হে কৌন্তেয় ! ক্রমশ অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা মনকে বশীভূত করা যায়।
শ্লোক:
মন এব মনুষ্যাণাং কারণং বন্ধমোক্ষয়োঃ ।
বন্ধায় বিষয়াসঙ্গো মুক্ত্যৈ নির্বিষয়ং মনঃ ।।
(অমৃতবিন্দু উপনিষদ-২)
অনুবাদঃ- মনই মানুষের বন্ধন ও মুক্তির কারণ। বিষয়ে আসক্ত মনই বন্ধনের কারণ এবং বিষয়ে অনাসক্ত মনই মুক্তির কারণ। অতএব যে মন সর্বদাই শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত, তা পরম মুক্তির কারণ।
"শ্লোক:
যঃ ইদং পরমং গুহ্যং মদ্ভক্তেষ্বভিধাস্যতি ।
ভক্তিং ময়ি পরাং কৃত্বা মামেবৈষ্যত্যসংশয়ঃ ॥
(গীতা ১৮/৬৮) "
অনুবাদঃ- যিনি আমার ভক্তদের মধ্যে এই পরম গোপনীয় গীতাবাক্য উপদেশ করেন, তিনি অবশ্যই পরা ভক্তি লাভ করে নিঃসংশয়ে আমার কাছে ফিরে আসবেন।
"শ্লোক:
ন চ তস্মান্মনুষ্যেষু কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ ।
ভবিতা ন চ মে তস্মাদন্যঃ প্রিয়তরো ভুবি ।
(গীতা ১৮/৬৯) "
অনুবাদঃ- এই পৃথিবীতে মানুষদের মধ্যে তাঁর থেকে অধিক প্রিয়কারী আমার কেউ নেই এবং তাঁর থেকে অন্য কেউ আমার প্রিয়্তর হবে না।
"শ্লোক:
মৎচ্চিত্তা মদ্ গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরস্পরম্ ।
কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ ॥
(গীতা ১0/৯) "
অনুবাদঃ- যাঁদের চিত্ত ও প্র্রাণ সম্পূর্ণরূপে আমাতে সমর্পিত, তাঁরা পরস্পরের মধ্যে আমার কথা সর্বদাই আলাচনা করে এবং আমার সম্বন্ধে পরস্পরকে বুঝিয়ে পরম সন্তোষ ও অপ্রাকৃত আনন্দ লাভ করেন।
শ্লোক:
তিতিক্ষবঃ কারুণিকাঃ সুহৃদঃ সর্বদেহিনাম্ ।
অজাতশত্রবঃ শান্তাঃ সাধবঃ সাধুভূষণাঃ ।।
(ভাগবত ৩/২৫/২১)
অনুবাদঃ- ভগবদ্ভক্ত সর্বদাই সহিষ্ণু, অত্যন্ত কৃপা পরায়ণ, সর্বজীবের সুহৃদ, শাস্ত্রানুগ, অজাতশত্রু, শান্ত - এই সকল গুণাবলী সাধুর ভূষণস্বরূপ।
"শ্লোক:
মৎচ্চিত্তা মদ্ গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরস্পরম্ ।
কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ (গীতা ১০/৯) "
অনুবাদঃ- যাঁদের চিত্ত ও প্র্রাণ সম্পূর্ণরূপে আমাতে সমর্পিত, তাঁরা পরস্পরের মধ্যে আমার কথা সর্বদাই আলাচনা করে এবং আমার সম্বন্ধে পরস্পরকে বুঝিয়ে পরম সন্তোষ ও অপ্রাকৃত আনন্দ লাভ করেন।
"শ্লোক:
চতুর্বিধা ভজন্তে মাং জনাঃ সুকৃতিনোহর্জুন ।
আর্তো জিজ্ঞাসুরর্থার্থী জ্ঞানী চ ভরতর্ষভ ।।
(গীতা ৭/১৬) "
অনুবাদঃ- হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন ! আর্ত, অর্থাথী, জিজ্ঞাসু ও জ্ঞানী- এই চার প্রকার পুণ্যকর্মা ব্যক্তিগণ আমার ভজনা করেন।
শ্লোক:
কৃষ্ণভক্ত- নিষ্কাম, অতএব 'শান্ত' ।
ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধি-কামী-- সকলি 'অশান্ত' ।।
(চৈঃ চঃ মধ্য ১৯/১৪৯)
অনুবাদঃ- কৃষ্ণভক্ত নিষ্কাম বলেই শান্ত। সকাম কর্মীরা জড় ভোগ কামনা করেন, জ্ঞানীরা মুক্তি কামনা করেন, আর যোগীরা জড়-জাগতিক সিদ্ধি কামনা করেন। তাই এরা সকলেই কামার্ত ও অশান্ত।
শ্লোক:
যৎপাদসংশ্রয়াঃ সূত মুনয়ঃ প্রশমায়নাঃ ।
সদ্যঃ পুনন্ত্ত্যপস্পৃষ্টাঃ স্বর্ধুন্যাপহনুসেবয়া ।।
(ভাগবত ১/১/১৫)
অনুবাদঃ- হে সূত গোস্বামী ! যে সমস্ত মহর্ষিরা সর্বতোভাবে পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তাঁদের সঙ্গ প্রভাবে অর্থাৎ দর্শন মাত্রই জীব পবিত্র হয়, কিন্তু সুরধনী গঙ্গার জল সাক্ষাৎ সেবা অর্থাৎ স্পর্শন, অবগাহন আদি করার পরেই কেবল মানুষকে পবিত্র করে।
শ্লোক:
ন ধনং ন জনং ন সুন্দরীং
কবিতাং বা জগদীশ কাময়ে ।
মম জন্মনি জন্মনীশ্বরে
ভবতাদ্ভক্তিরহৈতুকী ত্বয়ি ।।
(শিক্ষাষ্টক ৪)
অনুবাদঃ- হে জগদীশ ! আমি ধন, জন, সুন্দরী স্ত্রী অথবা সকাম কর্ম কামনা করি না। আমি কেবল এই কামনা করি যে, জন্ম-জন্মান্তরে যেন আমি তোমার প্রতি অহৈতুকী ভক্তি লাভ করতে পারি।
শ্লোক:
ক্ষান্তিরব্যর্থকালত্বং বিরক্তির্মানশূন্যতা।
আশাবন্ধঃ সমুৎকণ্ঠা নামগানে সদা রূচিঃ ।।
আসক্তিস্তদ্ গুণাখ্যানে প্রীতিস্তদ্বসতিস্থলে।
ইত্যাদয়োহনুভাবাঃ স্যুর্জাতভাবাঙ্কুরে জনে।।
ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ১/৩/২৫-২৬)
অনুবাদঃ- শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভাবের অঙ্কুর যাঁর বিকশিত হয়েছে, তাঁর ব্যবহারে নিম্নোক্ত নয়টি লক্ষণ প্রকাশ পায়- ক্ষমাশীলতা, সময় যাতে বৃথা না যায় সেই চিন্তা, ভোগে বিরক্তি, মিথ্যা অহংকার শূন্যতা, আশাবন্ধন, উৎকণ্ঠা, ভগবানের পবিত্র নামগানে রূচি, ভগবানের দিব্য গুণ আখ্যানে আসক্তি এবং ভগবানের বসতিস্থলে অর্থাৎ মন্দির বা বৃন্দাবনাদি তীর্থে প্রীতি। এগুলিকে অনুভাব বলা হয়, অর্থাৎ এগুলি হচ্ছে ভাবের অধীনস্থ লক্ষণ। যে ব্যক্তির হৃদয়ে ভাবের অঙ্কুর জাত হয়েছে, এই সমস্ত লক্ষণগুলি তাঁর মধ্যে প্রকাশিত হয়।
"শ্লোক:
যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ ।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম ॥৭৮॥
(গীতা ১৮/৭৮) "
অনুবাদঃ- যেখানে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ এবং যেখানে ধনুর্ধর পার্থ, সেখানেই নিশ্চিতভাবে শ্রী, বিজয়, অসাধারণ শক্তি ও নীতি বর্তমান থাকে৷ সেটিই আমার অভিমত।
শ্লোক:
বয়ং তু ন বিতৃপ্যাম উত্তমঃশ্লোকবিক্রমে।
যচ্ছৃণ্বতাং রসজ্ঞানাং স্বাদু স্বাদু পদে পদে ।।
(ভাগবত ১/১/১৯)
অনুবাদঃ- উত্তম শ্লোকের দ্বারা বন্দিত হন যে পরমেশ্বর ভগবান, তাঁর অপ্রাকৃত লীলাকথা যতই আমরা শ্রবণ করি না কেন, আমাদের তৃপ্তি হবে না। যাঁরা তাঁর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে অপ্রাকৃত রস আস্বাদন করেছেন, তাঁরা নিরন্তর তাঁর লীলাবিলাসের রস আস্বাদন করেন।
শ্লোক:
যাঁর চিত্তে কৃষ্ণপ্রেমা করয়ে উদয়।
তাঁর বাক্য, ক্রিয়া, মুদ্রা বিজ্ঞেহ না বুঝয় ।।
চৈঃ চঃ মধ্য ২৩/৩৯)
অনুবাদঃ- যাঁর চিত্তে কৃষ্ণপ্রেমের উদয় হয়, তাঁর কথাবার্তা, কার্যকলাপ এবং আচার-আচরণ বিজ্ঞেরাও বুঝতে পারেন না।
শ্লোক:
যুগায়িতং নিমেষেন চক্ষুষা প্রাবৃষায়িতম্ ।
শূন্যায়িতং জগৎ সর্বং গোবিন্দবিরহেণ মে।।
(শিক্ষাষ্টকম- ৭)
অনুবাদঃ- "হে গোবিন্দ! তোমার অদর্শনে আমার এক নিমেষকে এক যুগ বলে মনে হচ্ছে। চক্ষু থেকে বর্ষার ধারার মতো অশ্রুধারা ঝরে পড়ছে এবং সমস্ত জগৎ শূন্য বলে মনে হচ্ছে।"
শ্লোক:
আশ্লিষ্য বা পাদরতাং পিনষ্টু মা-
মদর্শনান্মর্মহতাং করোতু বা।
যথা তথা বা বিদধাতু লম্পটো
মৎ প্রাণনাথস্তু স এব নাপরঃ ।।
(শিক্ষাষ্টকম-৮)
অনুবাদঃ- এই পাদরতা দাসীকে কৃষ্ণ আলিঙ্গনপূর্বক পেষণ করুক অথবা দেখা না দিয়ে মর্মাহতই করুক, সেই লম্পট পুরুষ আমার প্রতি যেমনই আচরণ করুক না কেন, সে অন্য কেউ নয়, আমারই প্রাণনাথ।
"শ্লোক:
বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি ।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ ॥
(গীতা ৫/১৮) "
অনুবাদঃ- জ্ঞানবান পণ্ডিতেরা বিদ্যা-বিনয়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, গাভী, হস্তী, কুকুর ও চণ্ডাল সকলের প্রতি সমদর্শী হন।
"শ্লোক:
ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি ।
সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্ ॥
(গীতা ১৮/৫৪) "
অনুবাদঃ- ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তি কোন কিছুর জন্য শোক করেন না বা আকাঙ্ক্ষা করেন না৷ তিনি সমস্ত প্রাণীর প্রতি সমদর্শী হয়ে আমার পরা ভক্তি লাভ করেন।
"শ্লোক:
সুখমাত্যন্তিকং যত্তদ্ বুদ্ধি গ্রাহ্যমতীন্দ্রিয়ম্ ৷
বেত্তি যত্র ন চৈবায়ং স্থিতশ্চলতি তত্ত্বতঃ ॥
(গীতা ৬/২১) "
অনুবাদঃ- এই অবস্থায় শুদ্ধ অন্তঃকরণ দ্বারা আত্মাকে উপলব্ধি করে যোগী আত্মাতেই পরম আনন্দ আস্বাদন করেন। সেই আনন্দময় অবস্থায় অপ্রাকৃত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অপ্রাকৃত সুখ অনুভূত হয়। এই পারমার্থিক চেতনায় অবস্থিত হলে যোগী আর আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান থেকে বিচলিত হন না।
"শ্লোক:
যো মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্বং চ ময়ি পশ্যতি ৷
তস্যাহং ন প্রণশ্যামি স চ মে ন প্রণশ্যতি ॥
(গীতা ৬/৩০) "
অনুবাদঃ- যিনি সর্বত্র আমাকে দর্শন করেন এবং আমাতেই সমস্ত বস্তু দর্শন করেন, আমি কখনও তাঁর দৃষ্টির অগোচর হই না এবং তিনিও আমার দৃষ্টির অগোচর হন না ।
(সূত্রঃ- বৈষ্ণব শ্লোকাবলী) এরপর দেখুন= ভক্তিমূলক সেবা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক

সাইট-টি আপনার ভাল নাও লাগতে পারে, তবুও লাইক দিয়ে উৎসাহিত করুনঃ

শেয়ার করে প্রচারে অবদান রাখতে পারেন