সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক বিষয়ঃ অবশ্যই জানা উচিৎ

দেহ ও আত্মার পার্থক্য


দেহ (Body)
আত্মা (Soul)

১.দেহ অচেতন(Unconscious)
১. আত্মা চেতন(Conscious), দেহে পরিব্যাপ্ত চেতনার উৎস;

২.দেহ জড়, আট রকম জড় উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত;
২. আত্মা জড় উপাদানশূন্য, চিন্ময়, চিৎকণা
(তিন রকম চিদ্বিভাবের অভিভাজ্য রূপ)

৩.দেহ সদা পরিবর্তনশীল; প্রতিদিনই দেহের রূপান্তর হয়
৩. আত্মা চির অ-পরিবর্তনীয়, অব্যয়; ‘অবিকারী’,
(বৃদ্ধি-ক্ষয় প্রভৃতি ৬টি পরিবর্তনের অধীন) বৃদ্ধি-ক্ষয় প্রভৃতি পরিবর্তনহীন;

৪.দেহ নশ্বর, বিনাশশীল, অনিত্য;
৪. আত্মা অবিনশ্বর, নিত্য, শাশ্বত;

৫.দেহ ভগবানের বহিরঙ্গা, অপরা জড়া প্রকৃ্তির সৃষ্টি;
৫. আত্মা ভগবানের অবিচ্ছেদ্য-অংশ,
তটস্থা শক্তি, পরা প্রকৃ্তি-সম্ভূত;

৬.দেহ স্থূল, পরিমাপযোগ্য;
৬. আত্মা সূক্ষ্ম, অপরিমেয়;

৭. দেহ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভবযোগ্য;
৭. আত্মা জড় ইন্দ্রিয়ের অগোচর;

৮.দেহ অস্ত্রাদির দ্বারা বিনাশযোগ্য;
৮. আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, অশোষ্য;

৯.দেহ অজ্ঞান বস্তুপিণ্ড;
৯. আত্মা জ্ঞানময়; সকল গুণাবলীর আধার;

১০.দেহ ব্যক্তিত্বহীন যন্ত্র;
১০. আত্মা মূল ব্যক্তি, ব্যক্তিত্বের কেন্দ্র;

১১.দেহ দুঃখ-ক্লেশের আধার নিরানন্দময়;
১১. আত্মা আনন্দময়;

১২.দেহ পরিচালিত যন্ত্র (Car, Instrument);
১২. আত্মা পরিচালক (Driver, user);

১৩.দেহ অনুভব- সামর্থ্যহীন;
১৩. আত্মা অনুভূতিশীল; অনুভবের কেন্দ্র;

১৪.দেহ ইচ্ছা-দ্বেষ-বাসনা-সক্রিয়তা শূন্য;
১৪. আত্মা ইচ্ছা-দ্বেষ-মান-অভিমান-বাসনা-সক্রিয়তা যুক্ত;

১৫.দেহ মিথ্যা অহঙ্কার নামক সূক্ষ্ম উপাদান সমন্বিত;
১৫. আত্মা মিথ্যা অহঙ্কার বিহীন; প্রকৃ্ত আমি
(Real person);

১৬.দেহ জড় ইন্দ্রিয়যুক্ত;
১৬. আত্মা চিন্ময় ইন্দ্রিয়যুক্ত;

১৭.দেহ মন, বুদ্ধি জড়;
১৭. আত্মা মন, বুদ্ধি চিন্ময়;

১৮.দেহ অস্থায়ী পোশাক, ‘বিরূপ’।
১৮. আত্মা শাশ্বত ব্যক্তি, ‘স্বরূপ’।

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

আমি কি ভগবান?

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )
ভারতবর্ষে বর্তমানে অদ্বৈতবাদ, অর্থাৎ “আমি ভগবান। তুমি ভগবান। প্রত্যেকেই ভগবান” – এই দর্শন খুবই প্রচলিত। এই ধরণের দর্শন সেই সব বদ্ধ জীবাত্মাদের অন্তরে অসীম সন্তোষ প্রদান করে থাকে, যাদের ভোক্তা ও নিয়ন্তা হবার বাসনা প্রবল। বদ্ধ জীবাত্মা এমন ভোক্তা ও নিয়ন্তা হতে চায়। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এমন কেউ কি আছে যে নিয়ন্ত্রণাধীন, নিয়ন্ত্রিত নয়? সংজ্ঞানুসারে ভগবান পরম স্বরাট্, স্বাধীন স্বতন্ত্র পুরুষ এবং তিনি কারো নিয়ন্ত্রণাধীন নন। তিনিই পরম নিয়ন্তা। জীব অবিনাশী, শাশ্বত, অব্যক্ত এবং অচিন্ত্য, কিন্তু তবুও সে কি ভগবান হতে পারে? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর আপনার পারমার্থিক জীবনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

ভগবদগীতা এ-বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে জীব কখনো ভগবান নয়, কখনো সে ভগবান হতেও পারবে না; সমস্ত জীবসত্তা ও ভগবান নিত্য স্বতন্ত্র, যদিও উভয়ে চিন্ময়, সেজন্য গুণগতভাবে উভয়েই এক। জীব ক্ষুদ্রচিদ্ অণু, তাই সূর্যের কিরণকণা যেমন সূর্যের মতো ধর্ম বিশিষ্ট হলেও স্বয়ং সূর্য নয়, তেমনি চিৎ-কণাজীব ভগবানের মতো চিদ্ধর্ম বিশিষ্ট হলেও পরিমাণগতভাবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র। ভগবদগীতায় এটাও দ্বার্থহীন ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে যে এমনকি মোক্ষ বা মুক্তিলাভের পরও জীব আত্মস্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ভগবানে একীভূত হয়ে যায় না; প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বই শাশ্বত। ভগবদগীতায় বলা হয়েছে (১৫/১৬)ঃ

দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ। ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কুটস্থোহক্ষর উচ্যতে।। “ক্ষর এবং অক্ষর দুই প্রকার জীব রয়েছে। এই জড় জগতে প্রতিটি জীবই ক্ষর এবং চিজ্জগতে প্রতিটি জীবই অক্ষর।”
অবশিষ্ট অংশ পার্শ্ববর্তী কলামে, এখানে ক্লিক করুন
পার্শ্ববর্তী বিবরণের পরবর্তী অংশ

এই জগতে আমরা যারা আমাদের শাশ্বত চিন্ময় স্বরূপ সম্বন্ধে অসচেতন, তারা ক্ষর (পরিবর্তনশীল দেহ-সম্পন্ন জীব)। এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মা থেকে শুরু করে নগণ্য একটি পিঁপড়ে পর্যন্ত যে জীব-সত্তাই জড়ের সংস্পর্শে এসেছে, জড়-পদার্থের আবরণে তৈরী দেহাবয়ব ধারণ করেছে, সে ক্ষর। কিন্তু চিন্ময় জগতে দেহটি জড় পদার্থের তৈরী নয়, সেজন্য সেই দেহে কোনো পরিবর্তন হয় না; ঐ চিদ্-দেহ চির-শাশ্বত, অপরিবর্তনীয়। ঐ দেহে কখনো জরা-ব্যাধি-বার্ধক্য আসে না, সেই দেহের জন্ম-মৃত্যুও নেই। যে সব জীবসত্তা চিন্ময় জগতে পরম পুরুষ ভগবানের সংগে আনন্দবিলাসরত, তাঁরা সকলেই অক্ষর (অপরিবর্তনীয়), তাঁরা অনন্তকালের জন্য অপরিবর্তনীয় শাশ্বত আনন্দময় স্বরূপ-বিশিষ্ট।

উত্তম পুরুষস্ত্বন্যঃ পরমাত্মেত্যুদাহৃঢ়ঃ।। যো লোকত্রয়মাবিশ্য বিভর্ত্যব্যয় ঈশ্বরঃ।। “এই উভয় পুরুষ থেকে ভিন্ন, পুরুষোত্তম, পরমাত্মা রূপে সমগ্র বিশ্বে প্রবেশ করে তাদের পালন করেন” (ভ. গী. ১৫/১৭)। এখানে এটা অত্যন্ত সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে অগণিত জীবসত্তা-সমূহের মধ্যে কিছু জীব বদ্ধ, এবং অন্য সমস্ত জীব মুক্ত; এবং এই বদ্ধ ও মুক্ত (ক্ষর ও অক্ষর) উভয় জীবসত্তার মধ্যে পরম পুরুষোত্তম হচ্ছেন পরমাত্মা, ভগবান।

সংক্ষেপে ভগবান ও জীবের পার্থক্য

অতএব, সংক্ষেপে আমাদের উপলব্ধি করা উচিতঃ

***আমরা জীবাত্মা; ভগবান হচ্ছেন পরমাত্মা;

***আমরা অণূ (ক্ষুদ্র চিৎ-কণ); ভগবান বিভু (অসীম);

***আমরা কেবল আমাদের নিজ দেহটি সম্বন্ধে সচেতন, অবগত; ভগবান প্রত্যেকের সম্বন্ধে এবং সমস্তকিছু সম্বন্ধে অবগত;

***আমরা নিত্যকালের জন্য পরমেশ্বর ভগবানের প্রেমময় সেবক, দাস, আর ভগবান হচ্ছেন আমাদের প্রেমময় প্রভু;

***আমরা গুণগতভাবে ভগবানের সংগে অভেদ, কিন্তু পরিমাণগতভাবে আমরা ভগবান হতে ভিন্ন। এই বাস্তব সত্যকে স্বীকার করে নেওয়ার উপর আমাদের জীবনের পরম সার্থকতা লাভ নির্ভর করে।

পরমাত্মাঃ জীবাত্মার বন্ধু

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )
যখন জীবাত্মা এই জড় জগতে পতিত হয়, তখন তাকে নানা দেহে দেহান্তরিত করা, তার তত্ত্বাবধান করা এবং তাকে পথনির্দেশ দানের জন্য পরমপুরুষ ভগবানের এক প্রকাশ জীবাত্মার সঙ্গী হন। শ্রীকৃষ্ণের এই প্রকাশ প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজ করেন- ঈশ্বর সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেঃ অর্জুন তিষ্ঠতি- ভ. গী. ১৮/৬১), এবং প্রত্যেক পরমাণুর মধ্যেও তিনি প্রবেশ করেন (পরমাণুচয়ান্তরস্থং, ব্রহ্মসংহিতা – ৩৫)। তাঁকে বলা হয় পরমাত্মা

পরমাত্মাঃ জীবাত্মার বন্ধু

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )
যখন জীবাত্মা এই জড় জগতে পতিত হয়, তখন তাকে নানা দেহে দেহান্তরিত করা, তার তত্ত্বাবধান করা এবং তাকে পথনির্দেশ দানের জন্য পরমপুরুষ ভগবানের এক প্রকাশ জীবাত্মার সঙ্গী হন। শ্রীকৃষ্ণের এই প্রকাশ প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজ করেন- ঈশ্বর সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেঃ অর্জুন তিষ্ঠতি- ভ. গী. ১৮/৬১), এবং প্রত্যেক পরমাণুর মধ্যেও তিনি প্রবেশ করেন (পরমাণুচয়ান্তরস্থং, ব্রহ্মসংহিতা – ৩৫)। তাঁকে বলা হয় পরমাত্মা

দুই প্রকারের আত্মা রয়েছেঃ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চিৎ-কণ (অণু-আত্মা, জীবাত্মা), এবং পরম আত্মা (বিভু-আত্মা, পরমাত্মা)। জীবাত্মার অর্থ একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা, পরমাত্মার অর্থ একজন পরম ব্যক্তিসত্তা। জীবাত্মা ও পরমাত্মা উভয়েরই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব রয়েছে, উভয়েই ব্যক্তিত্ব সমন্বিত। উভয়ের মধ্যে পার্থক্য এই যে, জীবাত্মা কেবল একটি বিশেষ দেহে আবদ্ধ, পক্ষান্তরে পরমাত্মা সর্বত্র বিরাজমান। কঠোপনিষদেও একথা সমর্থিত হয়েছেঃ

অণোরণীয়ান্মহতো মহীয়ান্
আত্মাস্য জন্তোর্নিহিত গুহায়াম্।
তমক্রতুঃ পশ্যতি বীতশোকো
ধাতুঃ প্রসাদন্মহিমানমাত্মনঃ।।

“পরমাত্মা এবং জীবাত্মা উভয়েই বৃক্ষসদৃশ জীবদেহের হৃদয়ে অবস্থিত। যিনি সব রকম জড় বাসনা এবং সব রকমের শোক থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন, তিনিই কেবল ভগবানের কৃপার ফলে আত্মার মহিমা উপলব্ধি করতে পারেন।”

পরমাত্মার কৃপার ফলেই অণু আত্মা ভিন্ন ভিন্ন দেহ প্রাপ্ত হয়। বন্ধু যেমন বন্ধুর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে, পরমাত্মাও তেমনি অণু আত্মার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন।

এর পর দেখুনঃ এর অবশিষ্ট অংশ

সাইট-টি আপনার ভাল নাও লাগতে পারে, তবুও লাইক দিয়ে উৎসাহিত করুনঃ

শেয়ার করে প্রচারে অবদান রাখতে পারেন