১৮.মোক্ষযোগ.

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিশ্ববাসীকে উদ্দেশ্য করে অর্জুনকে শ্রীমদ্ভগবদগীতা জ্ঞান দান করেন

       ১৭.শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ..
১৬.দৈবাসুরসম্পদবিভাগযোগ
শ্লোক ও বাংলায় অর্থ দেখতে সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের উপর ক্লিক করুন
 ১৫.পুরুষোত্তমযোগ........
গীতাপাঠপূর্ব মঙ্গলাচরণ:- ও গীতার ধ্যান:- দেখতে ক্লিক করুন  ১৪.গুণত্রয়বিভাগযোগ...
১৩.ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগ..
১২.ভক্তিযোগ.............
শ্রীবৈষ্ণবীয়-তন্ত্রসারে গীতা-মাহাত্ম্য:- - দেখতে ক্লিক করুন  ১১.বিশ্বরূপদর্শনযোগ.
শ্রীশঙ্করাচার্য প্রণীত গীতা-মাহাত্ম্য:- - ক্লিক করুন  ১০.বিভূতিযোগ.......
শ্রীল ব্যাসদেব কৃত গীতা-মাহাত্ম্য:- -  ০৯.রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ.
০৮.অক্ষরব্রহ্মযোগ..
সুনির্বাচিত শ্লোক০৭.জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ
০৬.ধ্যানযোগ........
প্রার্থনা০৫.কর্মসন্যাসযোগ
০৪.জ্ঞানযোগ......
০৩.কর্মযোগ........
০২.সাংখ্যযোগ.......
০১.অর্জুনবিষাদযোগ

কর্মষটক

ভক্তিষটক

জ্ঞানষটক

শ্রীমদ্ভগবদগীতা

1:ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে

2:দৃষ্টা তু পাণ্ডবা 3:পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রা 4:অত্র শূরা মহেষ্বাসা 5:ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতান 6:যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত
7:অস্মাকন্ত্ত বিশিষ্টা 8:ভবান্ ভিষ্মশ্চ কর্ণ 9:অন্যে চ বহবঃ 10:অপর্যাপ্তং তদস্মাক 11:অয়নেষু চ সর্বেষু 12:তস্য সঞ্জনয়ন্ হর্ষ
13:ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্য 14:ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যু 15:পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশ 16:অনন্ত বিজয়ং রা 17:কাশ্যশ্চ পরমেষ্বা 18:দ্রুপদঃ দ্রৌপদেয়া
19:সঃ ঘোষঃ ধার্তরাষ্ট্র 20:অথ ব্যবস্তিতান্ 21:সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে 22:কৈর্ময়া সহ যোদ্ধব্যম 23:যোৎস্যমানান অবে 24:এবমুক্তো হৃষীকেশঃ

25:ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখত

26:তত্রাপশ্যৎ স্থিতান্ 27:তান্ সমীক্ষ্য স.. 28:দৃষ্টেমং স্বজনং কৃষ্ণ 29:বেপথুশ্চ শরীরে 30:ন চ শক্নোম্যবস্থাতু
31:ন চ শ্রেয়োহনুপশ্যা 32:কিং নো রাজ্যেন 33:ত ইমেহবস্থিতা 34:মাতুলাঃ শ্বশুরা 35:অপি ত্রৈলোক্যরাজ্য 36:পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্
37:যদ্যপেতে ন পশ্য 38:কথং ন জ্ঞেয়মস্মা 39:কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি 40:অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ 41:সঙ্করো নরকায়ৈব 42:দোষৈরেতৈঃ কুলঘ্না
43:উৎসন্ন কুলধর্মাণা 44:অহো বত মহৎ 45:যদি মামপ্রতিকারম 46:এবমুক্ত্বার্জুনঃ সংখ্যে শ্রীমদ্ভগবদগীতার সারমর্ম :-
শ্লোক: . .

   অর্থ:- . .

১ম অধ্যায়: অর্জুনবিষাদযোগ- এর সার সংক্ষেপ:
পোস্টটি বা এ উদ্যোগটি আপনার ভাল লাগলে লাইক দিয়ে উৎসাহিত করুনঃ




শ্লোক:

=অর্থ=

শ্লোক:1:
ধৃতরাষ্ট্র উবাচ
ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ ।
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয় ॥১॥

ধর্মক্ষেত্রে, কুরুক্ষেত্রে, সমবেতাঃ, যুযুৎসবঃ,
মামকাঃ, পাণ্ডবাঃ, চ, এব, কিম্, অকুর্বত, সঞ্জয় ॥১॥
অর্থ:- ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন- হে সঞ্জয় ! ধর্মক্ষেত্রে যুদ্ধ করার মানসে সমবেত হয়ে আমার পুত্র এবং পান্ডুর পুত্রেরা তারপর কি করল ?
শ্লোক:2:
সঞ্জয় উবাচ
দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা ।
আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ॥২॥

দৃষ্ট্বা, তু, পাণ্ডব-অনীকম্, ব্যূঢ়ম্, দুর্যোধনঃ, তদা,
আচার্যম্, উপসঙ্গম্য, রাজা, বচনম্, অব্রবীৎ॥২॥
অর্থ:- সঞ্জয় বললেন- হে রাজন্ ! পাণ্ডবদের সৈন্যসজ্জা দর্শন করে রাজা দুর্যোধন দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে বললেন-
শ্লোক:3:
পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম্ ।
ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা ॥৩॥

পশ্য, এতাম্, পাণ্ডুপুত্রাণাম্, আচার্য, মহতীম্, চমূম্
ব্যূঢ়াম্, দ্রুপদপুত্রেণ, তব, শিষ্যেণ, ধীমতা ॥৩॥
অর্থ:- হে আচার্য ! পাণ্ডবদের মহান সৈন্যবল দর্শন করুন, যা আপনার অত্যন্ত বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদের পুত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যূহের আকারে রচনা করেছেন।
শ্লোক:4:
অত্র শূরা মহেষ্বাসা ভীমার্জুনসমা যুধি ।
যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথঃ ॥৪॥

অত্র, শূরাঃ, মহেষ্বাসাঃ, ভীমার্জুন-সমাঃ, যুধি,
যুযুধানঃ, বিরাটঃ, চ, দ্রুপদঃ, চ, মহারথঃ ॥৪॥
অর্থ:- সেই সমস্ত সেনাদের মধ্যে অনেকে ভীম ও অর্জুনের মতো বীর ধনুর্ধারী রয়েছেন এবং যুযুধান, বিরাট ও দ্রুপদের মতো মহাযোদ্ধা রয়েছেন।
শ্লোক:5:
ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশিরাজশ্চ বীর্যবান্ ।
পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ ॥৫॥

ধৃষ্টকেতুঃ, চেকিতানঃ, কাশিরাজঃ, চ, বীর্যবান্,
পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ, চ, শৈব্যঃ, চ, নরপুঙ্গবঃ ॥৫॥
অর্থ:- সেখানে ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, কাশিরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ ও শৈব্যের মতো অত্যন্ত বলবান যোদ্ধারাও রয়েছেন।
শ্লোক:6:
যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান্ ।
সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ ॥৬॥

যুধামন্যুঃ, চ, বিক্রান্তঃ, উত্তমৌজাঃ, চ, বীর্যবান্,
সৌভদ্রঃ, দ্রৌপদেয়াঃ, চ, সর্বে, এব, মহারথাঃ ॥৬॥
অর্থ:- সেখানে রয়েছেন অত্যন্ত বলবান যুধামন্যু, প্রবল পরাক্রমশালী উত্তমৌজা, সুভদ্রার পুত্র এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ। এই সব যোদ্ধারা সকলেই এক-একজন মহারথী।
শ্লোক:7:
অস্মাকন্ত্ত বিশিষ্টা যে তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম ।
নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান্ ব্রবীমি তে ॥৭॥

অস্মাকম্, তু, বিশিষ্টাঃ, যে, তান্, নিবোধ, দ্বিজোত্তম,
নায়কাঃ, মম, সৈন্যস্য, সংজ্ঞার্থম্, তান্, ব্রবীমি, তে ॥৭॥
অর্থ:- হে দ্বিজোত্তম ! আমাদের পক্ষে যে সমস্ত বিশিষ্ট সেনাপতি সামরিক শক্তি পরিচালনার জন্য রয়েছেন, আপনার অবগতির জন্য আমি তাঁদের সম্বন্ধে বলছি।
শ্লোক:8:
ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ ।
অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তিস্তথৈব চ ॥৮॥

ভবান্, ভীষ্মঃ, চ, কর্ণঃ, চ, কৃপঃ, চ, সমিতিঞ্জয়ঃ,
অশ্বত্থামা, বিকর্ণঃ, চ, সৌমদত্তিঃ, তথা, এব, চ ॥৮॥
অর্থ:- সেখানে রয়েছেন আপনার মতোই ব্যক্তিত্বশালী-ভীষ্ম, কর্ণ, কৃপা, অশ্বত্থামা , বিকর্ণ ও সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা, যাঁরা সর্বদা সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে থাকেন।
শ্লোক:9:
অন্যে চ বহবঃ শূরাঃ মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ।
নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধবিশারদাঃ ॥৯॥

অন্যে, চ, বহবঃ, শূরাঃ, মদর্থে, ত্যক্তজীবিতাঃ,
নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ, সর্বে, যুদ্ধ-বিশারদাঃ ॥৯॥
অর্থ:- এ ছাড়া আরও বহু সেনানায়ক রয়েছেন, যাঁরা আমার জন্য তাঁদের জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত । তাঁরা সকলেই নানা প্রকার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং তাঁরা সকলেই সামরিক বিজ্ঞানে বিশারদ।
শ্লোক:10:
অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম্ ।
পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম্ ॥১০॥

অপর্যাপ্তম্, তৎ, অস্মাকম্, বলম্, ভীষ্মাভিরক্ষিতম্ ।
পর্যাপ্তম্, তু, ইদম, এতেষাম্, বলম্, ভীমাভিরক্ষিতম্ ॥১০॥
অর্থ:- আমাদের সৈন্যবল অপরিমিত এবং আমরা পিতামহ ভীষ্মের দ্বারা পূর্ণরূপে সুরক্ষিত, কিন্তু ভীমের দ্বারা সতর্কভাবে সুরক্ষিত পাণ্ডবদের শক্তি সীমিত।
শ্লোক:11:
অয়নেষু চ সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ ।
ভীষ্মমেবাভিরক্ষন্ত্ত ভবন্তঃ সর্ব এব হি ॥১১॥

অয়নেষু, চ, সর্বেষু, যথাভাগম্, অবস্থিতাঃ ।
ভীষ্মম্, এব, অভিরক্ষন্ত্ত, ভবন্তঃ, সর্বে, এব, হি ॥১১॥
অর্থ:- এখন আপনারা সকলে সেনাব্যূহের প্রবেশপথে নিজ নিজ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থিত হয়ে পিতামহ ভীষ্মকে সর্বতোভাবে সাহায্য প্রদান করুন।
শ্লোক:12:
তস্য সঞ্জনয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ ।
সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্ ॥১২॥

তস্য, সঞ্জনয়ন্, হর্ষম্, কুরুবৃদ্ধঃ, পিতামহঃ,
সিংহনাদম্, বিনদ্য, উচ্চৈঃ, শঙ্খম্, দধ্মৌ, প্রতাপবান্ ॥১২॥
অর্থ:- তখন কুরুবংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম দুর্যোধনের হর্ষ উৎপাদনের জন্য সিংহের গর্জনের মতো অতি উচ্চনাদে তাঁর শঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক:13:
ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ ।
সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোভবৎ ॥১৩॥

ততঃ, শঙ্খাঃ, চ, ভের্যঃ, চ, পণব-আনক-গোমুখাঃ,
সহসা, এব, অভ্যহন্যন্ত, সঃ, শব্দঃ, তুমুলঃ, অভবৎ ॥১৩॥
অর্থ:- তারপর শঙ্খ, ভেরী, পণব, আনক, ঢাক ও গোমুখ শিঙাসমূহ হঠাৎ একত্রে ধ্বনিত হয়ে এক তুমুল শব্দের সৃষ্টি হল।
শ্লোক:14:
ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ ।
মাধবঃ পান্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ ॥১৪॥

ততঃ, শ্বেতৈঃ, হয়ৈঃ, যুক্তে, মহতি, স্যন্দনে, স্থিতৌ,
মাধবঃ, পান্ডবঃ, চ, এব, দিব্যৌ, শঙ্খৌ, প্রদধ্মতুঃ ॥১৪॥
অর্থ:- অন্য দিকে, শ্বেত অশ্বযুক্ত এক দিব্য রথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন উভয়ে তাঁদের দিব্য শঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক:15:
পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ ॥
পৌন্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদরঃ ॥১৫॥

পাঞ্চজন্যম্, হৃষীকেশঃ, দেবদত্তম্, ধনঞ্জয়ঃ,
পৌন্ড্রম্, দধ্মৌ, মহাশঙ্খম্, ভীমকর্মা, বৃকোদরঃ ॥১৫॥
অর্থ:- তখন, শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চজন্য নামক তাঁর শঙ্খ বাজালেন, অর্জুন বাজালেন, তাঁর দেবদত্ত নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজনপ্রিয় ও ভীমকর্মা ভীমসেন বাজালেন পৌণ্ড্র নামক তাঁর ভয়ংকর শঙ্খ।
শ্লোক:16:
অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ ।
নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ ॥১৬॥

অনন্তবিজয়ম্, রাজা, কুন্তীপুত্রো, যুধিষ্ঠিরঃ,
নকুলঃ, সহদেবঃ, চ, সুঘোষ-মণিপুষ্পকৌ ॥১৬॥
অর্থ:- কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ বাজালেন এবং নকুল ও সহদেব বাজালেন সুঘোষ ও মণিপুষ্পক নামক শঙ্খ।
শ্লোক:17:
কাশ্যশ্চ পরমেষ্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ ।
ধৃষ্টদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিতঃ ॥১৭॥

কাশ্যঃ, চ, পরমেষ্বাসঃ, শিখণ্ডী, চ, মহারথঃ,
ধৃষ্টদ্যুম্নোঃ, বিরাটঃ, চ, সাত্যকিঃ, চ, অপরাজিতঃ ॥১৭॥
অর্থ:- হে মহারাজ ! তখন মহান ধনুর্ধর কাশীরাজ, প্রবল যোদ্ধা শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট, অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং অন্য সকলে তাঁদের নিজ নিজ পৃথক শঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক:18:
দ্রুপদো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্বশঃ পৃথিবীপতে ।
সৌভদ্রশ্চ মহাবাহুঃ শঙ্খান্ দধ্মুঃ পৃথক্ পৃথক্ ॥১৮॥

দ্রুপদঃ, দ্রৌপদেয়াঃ, চ, সর্বশঃ, পৃথিবীপতে ।
সৌভদ্রঃ, চ, মহাবাহুঃ, শঙ্খান্, দধ্মুঃ, পৃথক্, পৃথক্ ॥১৮॥
শ্লোক:19:
স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ, ।
নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলোহভ্যনুনাদয়ন্ ॥১৯॥

সঃ, ঘোষঃ, ধার্তরাষ্ট্রাণাম্, হৃদয়ানি, ব্যদারয়ৎ,
নভঃ, চ, পৃথিবীম্, চ, এব, তুমুলঃ, অভি-অনুনাদয়ন্ ॥১৯॥
অর্থ:- শঙ্খ-নিনাদের সেই প্রচণ্ড শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় বিদারিত করতে লাগল।
শ্লোক:20:
অথ ব্যবস্তিতান্ দৃষ্ট্বা ধার্তরাষ্ট্রান্ কপিধ্বজঃ ।
প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম্য পান্ডবঃ ।
হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে ॥২০॥

অথ, ব্যবস্তিতান্, দৃষ্ট্বা ধার্তরাষ্ট্রান্ কপিধ্বজঃ ।
প্রবৃত্তে, শস্ত্রসম্পাতে, ধনুঃ, উদ্যম্য, পান্ডবঃ ।
হৃষীকেশম্, তদা, বাক্যম্, এদম্, আহ, মহীপতে ॥২০॥
অর্থ:- সেই সময় পান্ডু পুত্র অর্জুন হনুমান চিহ্নিত পতাকা শোভিত রথে অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁর ধনুক তুলে নিয়ে শ্বর নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হলেন। হে মহারাজ ! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সমর সজ্জায় বিন্যস্ত দেখে অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণকে এই কথাগুলি বললেন-
শ্লোক:21:
অর্জুন উবাচ
সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে রথং স্থাপয় মেহচ্যুত ।
যাবদেতান্নিরীক্ষেহহং যোদ্ধুকামানবস্থিতান্ ॥২১॥

সেনয়োঃ, উভয়োঃ, মধ্যে, রথম্, স্থাপয়, মে, অচ্যুত ।
যাবৎ, এতান্, নিরীক্ষে, অহম্, যোদ্ধুকামান্, অবস্থিতান্ ॥২১॥
অর্থ:- অর্জুন বললেন- হে অচ্যুত ! তুমি উভয়ে পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে আমার রথ স্থাপন কর, যাতে আমি দেখতে পারি যুদ্ধ করার অভিলাষী হয়ে কারা এখানে এসেছে এবং এই মহা সংগ্রামে আমাকে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে।
শ্লোক:22:
কৈর্ময়া সহ যোদ্ধব্যমস্মিন্ রণসমুদ্যমে ॥২২॥

কৈঃ, ময়া, সহ, যোদ্ধব্যম্, অস্মিন্, রণসমুদ্যমে ॥২২॥
শ্লোক:23:
যোৎস্যমানানবেক্ষেহহং য এতেহত্র সমাগতাঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধের্যুদ্ধে প্রিয়চিকীর্ষবঃ ॥২৩॥

যোৎস্যমানান্, অবেক্ষে, অহম্, যে, এতে, অত্র, সমাগতাঃ,
ধার্তরাষ্ট্রস্য, দুর্বুদ্ধেঃ, যুদ্ধে, প্রিয়চিকীর্ষবঃ ॥২৩॥
অর্থ:- ধৃতরাষ্ট্রের দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন পুত্রকে সন্তুষ্ট করার বাসনা করে যারা এখানে যুদ্ধ করতে এসেছে, তাদের আমি দেখতে চাই৷
শ্লোক:24:
সঞ্জয় উবাচ:
এবমুক্তো হৃষীকেশো গুড়াকেশেন ভারত ।
সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম্ ॥২৪॥

এবম্, উক্তঃ, হৃষীকেশঃ, গুড়াকেশেন, ভারত,
সেনয়োঃ, উভয়োঃ, মধ্যে, স্থাপয়িত্বা, রথঃ, উত্তমম্ ॥২৪॥
অর্থ:- সঞ্জয় বললেন- হে ভরত-বংশধর ! অর্জুন কতৃক এভাবে আদিষ্ট হয়ে, শ্রীকৃষ্ণ সেই অতি উত্তম রথটি চালিয়ে নিয়ে উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রাখলেন।
শ্লোক:25:
ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম্ ।
উবাচ পার্থ পশ্যৈতান্ সমবেতান্ কুরূনিতি ॥২৫॥

ভীষ্ম-দ্রোণ-প্রমুখতঃ, সর্বেষাম্, চ, মহীক্ষিতাম্,
উবাচ, পার্থ, পশ্য, এতান্, সমবেতান্, কুরূন্, ইতি ॥২৫॥
অর্থ:- ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ পৃথিবীর অন্য সমস্ত নৃপতিদের সামনে ভগবান হৃষীকেশ বললেন, হে পার্থ ! এখানে সমবেত সমস্ত কৌরবদের দেখ।
শ্লোক:26:
তত্রাপশ্যৎ স্থিতান্ পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান্ ।
আচার্যান্মাতুলান্ ভ্রাতৃন্ পুত্রান্ পৌত্রান্ সখীংস্তথা ।
শ্বশুরান্ সুহৃদশ্চৈব সেনয়োরুভয়োরপি ॥২৬॥

তত্র, অপশ্যৎ, স্থিতান্, পার্থঃ, পিতৃন্, অথ, পিতামহান্,
আচার্যান্, মাতুলান্, ভ্রাতৃন্, পুত্রান্, পৌত্রান্, সখীন্, তথা,
শ্বশুরান্, সুহৃদঃ, চ, এব, সেনয়োঃ, উভয়োঃ, অপি ॥২৬॥
অর্থ:- তখন অর্জুন উভয় পক্ষের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাংক্ষীদের উপস্থিত দেখতে পেলেন।
শ্লোক:27:
তান্ সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান্ বন্ধূনবস্থিতান্।
কৃপয়া পরয়াবিষ্টো বিষীদন্নিদমব্রবীৎ ॥২৭॥

তান্, সমীক্ষ্য, সঃ, কৌন্তেয়ঃ, সর্বান্, বন্ধূন্, অবস্থিতান্,
কৃপয়া, পরয়া, অবিষ্টঃ, বিষীদন্, ইদম্, অব্রবীৎ ॥২৭॥
অর্থ:- যখন কুন্তীপুত্র অর্জুন সকল রকমের বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত দেখলেন, তখন তিনি অত্যন্ত কৃপাবিষ্ট ও বিষণ্ণ হয়ে বললেন।
শ্লোক:28:
অর্জুন উবাচ
দৃষ্ট্বেমং স্বজনং কৃষ্ণ যুযুৎসুং সমুপস্থিতম্ ।
সীদন্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুষ্যতি ॥২৮॥

দৃষ্ট্বা, ইমান্, স্বজনান্, কৃষ্ণ, যুযুৎসূন্, সম-অবস্থিতম্ ।
সীদন্তি, মম, গাত্রাণি, মুখম্, চ, পরিশুষ্যতি ॥২৮॥
অর্থ:- অর্জুন বললেন- হে প্রিয়বর কৃষ্ণ ! আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের এমনভাবে যুদ্ধাভিলাষী হয়ে আমার সামনে অবস্থান করতে দেখে আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হচ্ছে এবং মুখ শুষ্ক হয়ে উঠছে।
শ্লোক:29:
বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে ।
গান্ডীবং স্রংসতে হস্তাৎ ত্বক্ চৈব পরিদহ্যতে ॥২৯॥

বেপথুঃ, চ, শরীরে, মে, রোমহর্ষঃ, চ, জায়তে,
গান্ডীবম্, স্রংসতে, হস্তাৎ, ত্বক্, চ, এব, পরিদহ্যতে ॥২৯॥
অর্থ:- আমার সর্বশরীর কম্পিত ও রোমাঞ্চিত হচ্ছে, আমার হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ছে এবং ত্বক যেন জ্বলে যাচ্ছে।
শ্লোক:30:
ন চ শক্নোম্যবস্থাতুং ভ্রমতীব চ মে মনঃ ।
নিমিত্তানি চ পশ্যামি বিপরীতানি কেশব ॥৩০॥

ন, চ, শক্নোমি, অবস্থাতুম্, ভ্রমতি, ইব, চ, মে, মনঃ,
নিমিত্তানি, চ, পশ্যামি, বিপরীতানি, কেশব ॥৩০॥
অর্থ:- হে কেশব ! আমি এখন আর স্থির থাকতে পারছি না। আমি আত্মবিস্মৃত হচ্ছি এবং আমার চিত্ত উদ্ ভ্রান্ত হচ্ছে। হে কেশীদানবহন্তা শ্রীকৃষ্ণ ! আমি কেবল অমঙ্গলসূচক লক্ষণসমূহ দর্শন করছি।
শ্লোক:31:
ন চ শ্রেয়োহনুপশ্যামি হত্বা স্বজনমাহবে ।
ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ ॥৩১॥

ন, চ, শ্রেয়োঃ, অনুপশ্যামি, হত্বা, স্বজনম্, আহবে,
ন, কাঙ্ক্ষে, বিজয়ম্, কৃষ্ণ, ন, চ, রাজ্যম্, সুখানি, চ ॥৩১॥
অর্থ:- হে কৃষ্ণ ! যুদ্ধে আত্মীয়-স্বজনদের নিধন করা শ্রেয়স্কর দেখছি না। আমি যুদ্ধে জয়লাভ চাই না, রাজ্য এবং সুখভোগও কামনা করি না।
শ্লোক:32:
কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা ।
যেষামর্থে কাংক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ সুখানি চ ॥৩২॥

কিম্, নঃ, রাজ্যেন, গোবিন্দ, কিম্, ভোগৈঃ, জীবিতেন, বা,
যেষাম, অর্থে, কাংক্ষিতম্, নঃ, রাজ্যম্, ভোগাঃ, সুখানি, চ, ॥৩২॥
শ্লোক:33:
ত ইমেহবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ ।
আচার্যাঃ পিতরঃ পুত্রাস্তথৈব চ পিতামহাঃ ॥৩৩॥

ত, ইমে, অবস্থিতাঃ, যুদ্ধে, প্রাণান্, ত্যক্ত্বা, ধনানি, চ,
আচার্যাঃ, পিতরঃ, পুত্রাঃ, তথা, এব, চ, পিতামহাঃ ॥৩৩॥
শ্লোক:34:
মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্তথা ।
এতান্ন হন্তমিচ্ছামি ঘ্নতহপি মধুসূদন ॥৩৪॥

মাতুলাঃ, শ্বশুরাঃ, পৌত্রাঃ, শ্যালাঃ, সম্বন্ধিনঃ, তথা,
এতান্, ন হন্তুম্, ইচ্ছামি, ঘ্নতঃ, অপি, মধুসূদন ॥৩৪॥
শ্লোক:35:
অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে ।
নিহত্য ধার্তরাষ্ট্রান্নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দন ॥৩৫॥

অপি, ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য, হেতোঃ, কিম্, নু, মহীকৃতে,
নিহত্য, ধার্তরাষ্ট্রান্, নঃ, কা, প্রীতিঃ, স্যাৎ, জনার্দন ॥৩৫॥
অর্থ:- হে গোবিন্দ ! আমাদের রাজ্যে কি প্রায়োজন, আর সুখভোগ বা জীবন ধারনেই বা কী প্রয়োজন, যখন দেখছি- যাদের জন্য রাজ্য ও ভোগসুখের কামনা, তারা সকলেই এই রণক্ষেত্রে আজ উপস্থিত? হে মধুসূদন ! যখন আচার্য, পিতৃব্য, পুত্র, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক ও আত্মীয়স্বজন, সকলেই প্রাণ ও ধনাদির আশা পরিত্যাগ করে আমার সামনে যুদ্ধে উপস্থিত হয়েছেন, তখন তাঁরা আমাকে বধ করলেও আমি তাঁদের হত্যা করতে চাইব কেন? হে সমস্ত জীবের প্রতিপলক জনার্দন ! পৃথিবীর তো কথাই নেই, এমন কি সমগ্র ত্রিভুবনের বিনিময়েও আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের নিধন করে কি সন্তোষ আমরা লাভ করতে পারব?
শ্লোক:36:
পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্ হত্বৈতানাততায়িনঃ ।
তস্মান্নার্হা বয়ং হন্তুং ধার্তরাষ্ট্রান্ সবান্ধবান্ ।
স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব ॥৩৬॥

পাপম্, এব, আশ্রয়েৎ, অস্মান্, হত্বা, এতান্, আততায়িনঃ,
তস্মাৎ, ন, অর্হাঃ, বয়ম্, হন্তুম, ধার্তরাষ্ট্রান্, সবান্ধবান্,
স্বজনম্, হি, কথম্, হত্বা, সুখিনঃ, স্যাম, মাধব ॥৩৬॥
অর্থ:- এই ধরনের আততায়ীদের বধ করলে মহাপাপ আমাদের আচ্ছন্ন করবে। সুতরাং বন্ধুবান্ধব সহ ধৃতরাষ্ট্র্রের পুত্রদের সংহার করা আমাদের পক্ষে অবশ্যই উচিত হবে না। হে মাধব , লক্ষ্মীপতি শ্রীকৃষ্ণ ! আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করে আমাদের কী লাভ হবে ? আর তা থেকে আমরা কেমন করে সুখী হব ?
শ্লোক:37:
যদ্যপেতে ন পশ্যন্তি লোভোপহতচেতসঃ ।
কুলক্ষয়কৃতং দোষং মিত্রদ্রোহে চ পাতকম্ ॥৩৭॥

যদি-অপি, এতে, ন, পশ্যন্তি, লোভ-উপহত-চেতসঃ, ।
কুলক্ষয়কৃতম্, দোষম্, মিত্রদ্রোহে, চ, পাতকম্ ॥৩৭॥
অর্থ:- হে জনার্দন ! যদিও এরা রাজ্যলোভে অভিভূত হয়ে কুলক্ষয় জনিত দোষ ও মিত্রদ্রোহ নিমিত্ত পাপ লক্ষ্য করছে না, কিন্তু আমরা কুলক্ষয় জনিত দোষ লক্ষ্য করেও এই পাপ কর্মে কেন প্রবৃত্ত হব ?
শ্লোক:38:
কথং ন জ্ঞেয়মস্মাভিঃ পাপাদস্মান্নিবর্তিতুম্ ।
কুলক্ষয়কৃতং দোষং প্রপশ্যদ্ভির্জনার্দন ॥৩৮॥

কথম্, ন, জ্ঞেয়ম্, অস্মাভিঃ, পাপাৎ, অস্মাৎ, নিবর্তিতুম্,
কুলক্ষয়কৃতম্, দোষম্, প্রপশ্যদ্ভিঃ, জনার্দন ॥৩৮॥
শ্লোক:39:
কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনাতনাঃ ।
ধর্মে নষ্টে কুলং কৃৎস্নমধর্মোহভিভবত্যুত ॥৩৯॥

কুলক্ষয়ে, প্রণশ্যন্তি, কুলধর্মাঃ, সনাতনাঃ,
ধর্মে, নষ্টে, কুলম্, কৃৎস্নম্, অধর্মঃ, অভিভবতি, উত ॥৩৯॥
অর্থ:- কুলক্ষয় হলে সনাতন কুলধর্ম বিনষ্ট হয় এবং তা হলে সমগ্র বংশ অধর্মে অভিভূত হয়।
শ্লোক:40:
অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রীয়ঃ ।
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ ॥৪০॥

অধর্ম-অভিভবাৎ, কৃষ্ণ, প্রদুষ্যন্তি, কুলস্ত্রীয়ঃ,
স্ত্রীষু, দুষ্টাসু, বার্ষ্ণেয়, জায়তে, বর্ণসঙ্করঃ ॥৪০॥
অর্থ:- হে কৃষ্ণ ! কুল অধর্মের দ্বারা অভিভূত হলে কুলবধূগণ ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হয় এবং হে বার্ষ্ণেয় ! কুলস্ত্রীগণ অসৎ চরিত্রা হলে অবাঞ্ছিত প্রজাতি উৎপন্ন হয়।
শ্লোক:41:
সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ ।
পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ ॥৪১॥

সঙ্করঃ, নরকায়, এব, কুলঘ্নানাম্, কুলস্য, চ,
পতন্তি, পিতরঃ, হি, এষাম্, লুপ্ত-পিণ্ড-উদক-ক্রিয়াঃ ॥৪১॥
অর্থ:- বর্ণসঙ্কর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেই কুলে পিণ্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়।
শ্লোক:42:
দোষৈরেতৈঃ কুলঘ্নানাং বর্ণসঙ্করকারকৈঃ ।
উৎসাদ্যন্তে জাতিধর্মাঃ কুলধর্মাশ্চ শাশ্বতাঃ ॥৪২॥

দোষৈঃ, এতৈঃ, কুলঘ্নানাম্, বর্ণ-সঙ্কর-কারকৈঃ,
উৎসাদ্যন্তে, জাতি-ধর্মাঃ, কুলধর্মাঃ, চ, শাশ্বতাঃ ॥৪২॥
অর্থ:- যারা বংশের ঐতিহ্য নষ্ট করে এবং তার ফলে অবাঞ্ছিত সন্তানাদি সৃষ্টি করে, তাদের কুকর্মজনিত দোষের ফলে সর্বপ্রকার জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং বংশের কল্যাণ-ধর্ম উৎসন্নে যায়। ফলে সনাতন জাতিধর্ম ও কুলধর্মও বিনষ্ট হয়।
শ্লোক:43:
উৎসন্ন কুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন ।
নরকে নিয়তং বাসো ভবতীত্যনুশুশ্রুম ॥৪৩॥

উৎসন্ন-কুল-ধর্মাণাম্, মনুষ্যাণাম্, জনার্দন,
নরকে, নিয়তম্, বাসঃ, ভবতি, ইতি, অনুশুশ্রুম ॥৪৩॥
অর্থ:- হে জনার্দন ! আমি পরম্পরাক্রমে শুনেছি যে, যাদের কুলধর্ম বিনষ্ট হয়েছে, তাদের নিয়ত নরকে বাস করতে হয়।
শ্লোক:44:
অহো বত মহৎ পাপং কর্তুং ব্যাবসিতা বয়ম্ ।
যদ্ রাজ্যসুখলোভেন হন্তুং স্বজনমুদ্যতাঃ ॥৪৪॥

অহো, বত, মহৎ, পাপম্, কর্তুম্, ব্যাবসিতাঃ, বয়ম্,
যৎ, রাজ্য-সুখ-লোভেন, হন্তুম্, স্বজনম্, উদ্যতাঃ ॥৪৪॥
অর্থ:- হায় ! কী আশ্চর্যের বিষয় যে, আমরা রাজ্যসুখের লোভে স্বজনদের হত্যা করতে উদ্যত হয়ে মহাপাপ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছি।
শ্লোক:45:
যদি মামপ্রতিকারমশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রা রণে হন্যুস্তন্মে ক্ষেমতরং ভবেৎ ॥৪৫॥

যদি, মাম, অপ্রতিকারম্, অশস্ত্রম্, শস্ত্র-পাণয়ঃ,
ধার্তরাষ্ট্রাঃ, রণে, হন্যুঃ, তৎ, মে, ক্ষেমতরম্, ভবেৎ ॥৪৫॥
অর্থ:- প্রতিরোধ রহিত ও নিরস্ত্র অবস্থায় আমাকে যদি শস্ত্রধারী ধৃতরাষ্ট্র্রের পুত্রেরা যুদ্ধে বধ করে, তা হলে আমার অধিকতর মঙ্গলই হবে।
শ্লোক:46:
সঞ্জয় উবাচ
এবমুক্ত্বার্জুনঃ সংখ্যে রথোপস্থ উপাবিশৎ ।
বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানসঃ ॥৪৬॥

এবম্, উক্ত্বা, অর্জুনঃ, সংখ্যে, রথ-উপস্থে, উপাবিশৎ,
বিসৃজ্য, সশরম্, চাপম্, শোক-সংবিগ্ন-মানসঃ ॥৪৬॥
অর্থ:- সঞ্জয় বললেন- রণক্ষেত্রে এই কথা বলে অর্জুন তাঁর ধনুর্বাণ ত্যাগ করে শোকে ভারাক্রান্ত চিত্তে রথোপরি উপবেশন করলেন।
ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে অর্জুনবিষাদযোগো নাম প্রথমোঽধ্যায়ঃ ॥১

গীতার ধর্ম্মঃ- ( শ্রীমদ্ভগবদগীতার সারমর্ম )

-ডাঃ শ্রীমন্ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী
------------------------------------------
       যুদ্ধের প্রাক্কালে কুরুক্ষেত্রে দাঁড়াইয়া দুইটি পরস্পর বিরোধী কর্ত্তব্যের চাপে ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছেন অর্জ্জুন। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি কর্ত্তব্য বলিতেছে, ‘যুদ্ধ কর’। পারিবারিক কর্ত্তব্য দাবি করিতেছে, পিতামহ, গুরু, আত্মীয়-স্বজনকে মারা উচিত নয়। যাঁহারা পূজার পাত্র ভীস্ম দ্রোণ তাঁহাদের বধসাধন কেবল অন্যায় নয়, অত্যন্ত বেদনাদায়কও বটে। সমস্যা এই- কর্তব্যের মধ্যে বিরোধ। একটা কর্ত্তব্য পালন করিতে গেলে, অন্যটা সম্ভব হয় না। কোনটা শ্রেয়, করা উচিত, তাহা অর্জ্জুন বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। তাই ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছেন, বিষাদিত হইয়াছে তাহার চিত্ত।

       জীবনে সকলেরই সমস্যা এই, একটা দিক রাখিতে গেলে, অন্যটি ছাড়িতে হয়। অর্থ উপার্জ্জন করিতে যে ভয়ানক খাটুনি, তাহাতে শরীর থাকে না, আবার শরীর রাখিতে গেলে অর্থাভাবে না খাইয়া মরিতে হয়। বিদ্যালাভের যোগ্যতা ছিল। কিন্তু সংসারের প্রয়োজন মিটাইতে বিদ্যালাভ হইল না। শ্রীরামচন্দ্রের সমস্যা- প্রজারঞ্জন করিতে গেলে স্ত্রীর প্রতি অন্যায় করিতে হয়, স্ত্রীর প্রতি কর্ত্তব্য করিতে গেলে প্রজারঞ্জন হয় না। স্বাধীনতা লাভ করিতে গেলে ভারত দ্বিখণ্ডিত করিতে হয়, দেশের অখণ্ডতা রাখিতে গেলে স্বাধীনতা লাভ হয় না। সর্ব্বত্রই এই দ্বন্দ্ব। কিসে আমাদের কল্যাণ, তা বুঝিতে না পারিয়া জীবন হয় সমস্যাসঙ্কুল এবং বিষাদময়।

       অর্জ্জুনের রথের সারথি ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ। আমাদের জীবনরথের সারথিও তিনি। তাঁহার বাণী শুনিতে পাইনা আমরা, সংসারের কোলাহলে বধির বলিয়া। সকল মানবের প্রতিনিধি অর্জ্জুন, আমাদের হইয়া শুনিয়াছেন সেই বাণী। শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের কৃপায় কুরুক্ষেত্রের কোলাহলে সেই বাণী আজিও হারাইয়া যায় নাই। শ্রীকৃষ্ণার্জ্জুনের এই রোমাঞ্চকর অদ্ভুত পূত সংবাদই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা।

       গীতার আঠারটি অধ্যায় যেন আঠারটি সিড়ি; বিষাদ হইতে মোক্ষে উত্তীর্ণ হইবেন, তবেই গীতা-মায়ের শান্তিময় ক্রোড়ে পৌঁছানো যাইবে। মৃত্যুর পর মুক্তিলাভ গীতার লক্ষ্য নয়, এই জীবনেই মোক্ষের অবস্থা লাভ, ইহাই আদর্শ। এই জীবনে যিনি মুক্তি পাইয়াছেন, পরলোকে তিনি তো মুক্তি পাইবেনই।

       ডাক্তার যেমন রোগীকে জিজ্ঞাসা করে- ওষুধ ঠিকমত খাইয়াছ কিনা? রোগ সারিয়াছে কিনা? গীতার শেষে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে জিজ্ঞাসা করিলেন- তুমি সব মনোযোগ সহকারে শুনিয়াছ তো? তোমার অজ্ঞানতা-জনিত মোহ দূর হইয়াছে কিনা? রোগী কেমন অনুভব করিতেছে, সেটাই বড় কথা। অর্জ্জুন বলিলেন- আমার মোহ দূর হইয়াছে, সংশয় চলিয়া গিয়াছে, ফিরিয়া পাইয়াছি কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্যজ্ঞান। এখন তোমার উপদেশ মতোই কাজ করিব-

নষ্টো মোহঃ স্মৃতির্লব্ধা তৎপ্রসাদান্ময়াচ্যুত।
স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।। ১৮/৭৩ ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র শুনিলেই কাজ হইবে না। তদনুযায়ী কাজ করিতে হইবে। শিক্ষালাভ করিলেই মানুষ হয় না, আধুনিক বিজ্ঞানের নৃশংস প্রয়োগে জগৎ প্রায় ধ্বংসের কিনারায় আসিয়াছে। বুদ্ধি, জ্ঞানের অনুশীলন করিলেই হইবে না, ইচ্ছাশক্তিকে কল্যাণমুখী করিতে হইবে। বুদ্ধির সঙ্গে শুভ ইচ্ছার যোগ হওয়া চাই। বেদে এইরূপ প্রার্থনা আছে- বুদ্ধি, ইচ্ছা মঙ্গলপ্রয়াসে যেন পর্য্যবসিত হয়। গীতার আঠারটি অধ্যায় অনুশীলন করিলে মনে হইবে – যিনি আমার বুদ্ধি চালনা করিতেছেন, তাঁহার ইচ্ছায় চলাই কল্যাণকর।

       গীতা-মায়ের যে স্তনধারা আঠার অধ্যায় ধরিয়া বর্ষিত হইয়াছে, উহা ‘অদ্বৈত অমৃত’। বিশ্বে সকল বিভেদ বিদ্বেষ দূর করিয়া পরাশান্তি দান করিতে সমর্থ। ‘অদ্বৈত’ তত্ত্বের অনুভবই অমৃত। উহা মরণধর্মী জীবকে অমৃতত্ব এবং দুঃখী জীবকে আনন্দের অধিকারী করে। এই তত্ত্বের জ্ঞান না থাকায় আমরা বহু দেখি- লোকজন, হাতিঘোড়া, পশুপাখী ইত্যাদি। সবার মধ্যে যিনি এক ও ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’ রূপে বিরাজিত, তাঁহাকে দেখি না, অনুভব করি না। গীতা আঠার অধ্যায়ে এই তত্ত্বে আমাদিগকে পৌঁছাইয়া দেন।

       অনেক পাণ্ডিত্য যাহার আছে, গীতা তাহাকে পণ্ডিত বলেন নাই। বিদ্যাবিনয়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল, গাভী, হাতি, কুকুর প্রভৃতিতে যিনি সমদর্শী, কোনও পার্থক্যবোধ করেন না, গীতায় তাঁহাকেই পণ্ডিত বলা হইয়াছে। অদ্বৈততত্ত্বজ্ঞানী অনুভব করেন, সর্ব্বভূতে সর্ব্বজীবে এক পরমাত্মাই বিলাস করিতেছেন। তিনি আত্মাকে সর্ব্বভূতে এবং সর্ব্বভূতকে নিজ আত্মায় দর্শন করেন (‘সর্ব্বভূতস্থমাত্মানং সর্ব্বভূতানি চাত্মনি ঈক্ষতে যোগ যুক্তাত্মা সর্ব্বত্র সমদর্শিনঃ।।’ ৬/২৯)

       শুধু তাই নয়, তিনি শ্রীভগবানকে সর্ব্বভূতে অবস্থিত দেখেন এবং শ্রীভগবানের মধ্যে অবস্থিত দেখেন সর্ব্বভূতকে (‘যো মাং পশ্যতি সর্ব্বত্র, সর্ব্বং চ ময়ি পশ্যতি। ৬/৩০) তিনি সকল দ্বন্দ্বের পারে চলিয়া যান। সুখদুঃখ, শত্রুমিত্র, মান-অপমান, লাভ অলাভ সবই তাঁহার নিকট সমান মনে হয়। তিনি সদা সর্ব্বদা শ্রীভগবানে অবস্থান করেন এবং অমৃতত্ব আস্বাদন করেন।

       ঘট আছে পুকুরে জলের মধ্যে, আবার ঘটের মধ্যেও রহিয়াছে জল। বিরাট চৈতন্যের মধ্যে আমরা আছি, আবার আমাদের মধ্যেও আছেন ঐ চৈতন্য। কাউকে আঘাত করিলে নিজেকেই আঘাত করা হয়। ঘট ভাঙ্গিলে ঘটের জল আর পুকুরের জল এক হইয়া যায়। সর্ব্বজীবেই একই চৈতন্যের স্থিতি। এই অনুভব হইলে নশ্বর দেহভাণ্ড ভাঙ্গিয়া গেলে সেই পূর্ণ চৈতন্যে স্থিতিলাভ হয়। এই জ্ঞান না হইলে দেহভাণ্ড যতবার ভাঙ্গিবে, ততবার এই মায়াময় সুখদুঃখপূর্ণ সংসারে ফিরিয়া আসিতে হইবে। গীতায় শ্রীভগবান্ শরণাগত শিষ্যের প্রতি অত্যন্ত দরদমাখান ভাষায় এই তত্ত্ব উদ্ঘাটিত করিয়াছেন। হৃদয়ে দরদ থাকিলে উপদেশে কাজ হয়। বেদ উপনিষদে এই উপদেশ থাকিলেও তাহা তেমন গ্রহণযোগ্য হয় নাই, কারণ সেখানে নাই এই দরদ, ভক্তের জন্য ভগবানের বেদনাবোধ।

       গীতায় শ্রীভগবানের বক্তব্যের ভাষা অতি মধুর, প্রাণস্পর্শী। ভক্তের জন্য প্রাণ কাঁদিয়াছে ভগবানের, তাই দরদ দিয়া তাহার রোগ নিরাময় করিয়া তুলিতে চেষ্টা করিয়াছেন। অপূর্ব্ব মধুর কথা, অর্জ্জুন শুনিয়াছেন মন-প্রাণ দিয়া। মুখে কোন কথা নাই, দুই একটি জিজ্ঞাসা ছাড়া। বিষাদগ্রস্ত রোগী আঠার অধ্যারের শেষে অনুভব করিয়াছেন, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। জীবনের বিশাল কর্মক্ষেত্রে আমরা সকলেই পীড়িত, বিষাদিত। আমাদের জন্য ঐ একই ঔষধ।

       শাস্ত্র দুঃখমুক্তির জন্য বাসনা কামনা ত্যাগের কথা বলিয়াছেন। গীতার উপদেশ তাহা নয়। চিত্তের বহুমুখী বৃত্তি দুঃখ দিবে, উৎপাটন করাও যাইবে না। সব কামনার মূলে একটি কামনা আছে, ভিত্তিভূমি আছে। সেই লক্ষ্য জানিয়া, দৃষ্টি সেইদিকে স্থির রাখিয়া চলিতে হইবে। জীবনে অনেক প্রয়োজন অপরিহার্য্য হইয়া দেখা দেয়, তাহাতে যেন লক্ষ্যহারা না হই।
       জীবনের লক্ষ্য স্থির হওয়া একান্ত প্রয়োজন। তাহা হইলে, দুঃখ লাঘব হইয়া যাইবে। গীতা কৃপা করিয়া প্রকাশ করিয়াছেন, সেই লক্ষ্য কি-

যং লব্ধা চাপরলাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ
যস্মিন্ স্তিত্বা ন দুঃখেন গুরণাপি বিচাল্যতে।। ৬/২২

যাঁহাকে পাইলে জগতের অন্য কিছু লাভ শ্রেষ্ঠ বলিয়া মনে হয় না।, যাঁহাকে পাইলে গুরুতর দুঃখ আসিয়াও বিন্দুমাত্র বিচলিত করিতে পারে না, সেই শ্রীভগবান লাভই জীবনের লক্ষ্য। সেই আমাদের সাধ্য-বস্তু। তাঁহার দিকে লক্ষ্য স্থির রাখিয়া আমাদের চলিতে হইবে জীবনপথে।
লক্ষ্য স্থির থাকে না।
পরবর্তী অংশ পার্শ্ববর্তী কলামে ক্লিক করুনঃ-
পার্শ্ববর্তী বিবরণের পরবর্তী অংশ
       লক্ষ্য স্থির থাকে না। অহঙ্কার প্রবল হইয়া সব গোলমাল করিয়া দেয়। রজস্তমোগুণ বর্ধিত হইলে মানুষ অহঙ্কারী, ক্রোধী ও দুর্বিনীত হইয়া পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অন্যায় কর্ম্ম হইতে বিরত হওয়ার চেষ্টা করিয়াও মানুষ পারে না ভাল হইতে বা ভাল থাকিতে। অর্জ্জুন যে প্রশ্ন করিয়াছেন ভগবানকে, সে প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনেও উদয় হয়। অনিচ্ছাসত্বেও কে যেন বলপূর্ব্বক আমাদের পাপকার্যে নিয়োজিত করে-
       অথ কেন প্রযুক্তোহয়ং পাপং চরতি পুরুষঃ।
অনিচ্ছন্নপি বার্ষ্ণেয় বলাদিব নিয়োজিতঃ।। ৩/৩৬
       শ্রীভগবান্ বলিলেন, ইহার হেতু কাম ও ক্রোধ। রজোগুণ হইতিই ইহাদের উৎপত্তি, ইহা দুষ্পুরণীয় এবং সংসারে ঘোর শত্রুস্বরূপ। মূলে আছে অহঙ্কার (অহঙ্কার বিমূঢ়াত্মা কর্ত্তাহমিতি মন্যতে ৩/২৭) এই দেহ কেন্দ্র করিয়া যে অহঙ্কার, সেই দেহের উপর কি অধিকার আছে আমাদের? ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া, গাছের একটি পাতাও নড়ে না। অহঙ্কার সাজে না আমাদের। বর্ণের আদিতে ‘অ’ এবং অন্তে ‘হ’ বিশ্বের আদিতে ও অন্তে যিনি আছেন ও থাকেন, তাঁহারই শুধু হওয়া সাজে ‘অহং’ আর কাহারও নয়। ‘আমি’, ‘আমার’- ইহা হইতেই আমাদের যত গোলমাল, যত অশান্তি। সব ‘আমিত্ব’, তাঁহাকে সমর্পণ করিয়া তাঁহার শরণাগত হইলেই, কল্যাণ। ‘আমি’ গেলে, ঘুচিবে জঞ্জাল। সংসারে অহঙ্কার আনে, পদে পদে আঘাত, দুঃখ। চরম আঘাত পাইয়া মনে হয়- ঠাকুর, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।
       অহঙ্কারশূন্য হইয়া যাহা কিছু তোমার, তাহা ঈশ্বরে সমর্পণ কর-

যৎ করোষি যৎ অশ্নাসি যজ্জুহোসি দদাসি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুস্ব মদর্পণম্।। ৯/২৭
       অর্পণেও অহঙ্কার যেন প্রবেশ না করে, সেজন্য সদা সাবধান থাকিতে হইবে। বিশ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করিয়া সুরম্য মন্দির করিয়াছেন রাজা। সেই মন্দির ত্যাগ করিয়া সাধুশ্রেষ্ঠ নরোত্তম ঠাকুর ভক্তগণ সঙ্গে মন্দির ছাড়িয়া রাস্তার ধারে নাম-সংকীর্ত্তন করিতেছেন। রাজা সুধাইলেন, মন্দির ছাড়িয়া কেন রাস্তায় কীর্ত্তন করিতেছেন? নরোত্তম বলিলেন- ‘সে মন্দিরে দেব নাই’। তখন রাজা কহে রোষে-

‘দেব নাই! হে সন্ন্যাসী, নাস্তিকের মত কথা কহ।
রত্নসিংহাসন’পরে দীপিতেছে রতনবিগ্রহ-
শূন্য তাহা?
‘শূন্য নয়, রাজদম্ভে পূর্ণ’, সাধু কহে,
‘আপনায় স্থাপিয়াছ, জগতের দেবতারে নহে।’
‘দীন দান’- রবীন্দ্রনাথ।

      সৎকাজও মন্দ হইয়া যায়, যদি সেখানে অহঙ্কার জাগে। তাই শ্রীভগবান্, গীতার শেষ অধ্যায়ে শুনাইলেন চরম কথা-
সর্ব্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্ব্বপাপেভ্যঃ মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।। ১৮/৬৬
সব ধর্ম্ম ছাড়িয়াও যদি কেবল আমার শরণ লও, সেজন্য যদি তোমায় পাপ স্পর্শ করে, আমি তোমাকে সকল পাপ হইতে মুক্ত করিব। সর্ব্বতোভাবে তাঁহার হইতে হইবে, তখন আর কোনও কর্ত্তব্য থাকিবে না। তখন, সবই ভগবানের কাজ, তুমি কেবল নিমিত্ত মাত্র (নিমিত্তমাত্র ভব সব্যসাচিন্)। সর্ব্বতোভাবে তাঁহার শরণাগতি, ইহাই শ্রেষ্ঠ পন্থা। এই শরণাগতি আসিলেই পরম কল্যাণ। পায়ের জুতা সেবা করিতে পারে তখনই, যখন সে চরণে স্থান পায়। যতক্ষণ অহঙ্কার আছে, ততক্ষণ এই শরণাগতি, জুতার মত অভিমানশূন্যতা, আসে না। শরণাগতি আসিলে, তখন আমার কিছু নয়, সবই তাঁহার- ‘তোমারি গরবে গরবিনী হাম্, রূপসী তোমার রূপে’। এই বোধে, স্মরণে, উপাসনায়, তাঁহার উপর ঐকান্তিক নির্ভরতায় নামিয়া আসে তাঁহার অপার করুণার ধারা। তখন তিনিই সাধকের, ভক্তের সকল ভার গ্রহণ করেন। ‘যোগক্ষেমং বহাম্যহম্,’ নিজেই সকল ভার গ্রহণ করেন, এই তাঁহার বাণী।

      ভক্ত অর্জ্জুন মিশ্র তাহার জীবন্ত প্রমাণ। মিশ্র ছিলেন পরম পণ্ডিত, ভক্ত ও দরিদ্র। সে যুহে ছাপা পুস্তক ছিল না। হস্ত লিখিত পুঁথিতে ‘বহাম্যহম্’ দেখিয়া সংশয় হয়, ভাবেন ভগবান্ নিজে বহন করেন না, কারও মাধ্যমে দান করেন। তাই ‘বহাম্যহম্’ শব্দটি কাটিয়া সেখানে ‘দদাম্যহম্’ লিখিয়া রাখেন।

      একদিন গরীব ব্রাহ্মণের ঘরে কিছুই খাদ্যবস্তু নাই। ব্রাহ্মণী বলিলেন, ভিক্ষা না করিলে গোবিন্দের ভোগ হইবে না, আমাদের না খাইয়া কাটাইতে হইবে। অর্জ্জুন মিশ্র তাই ভিক্ষায় বাহির হইয়াছেন। কিছু পরে একটি কৃষ্ণবরণ ও অপরটি গৌরবরণ, দুইটি ছেলে অনেক জিনিষপত্র মাথায় লইয়া উপস্থিত। তাহারা বলিল, আমরা রাজার বাড়ী হইতে আসিয়াছি, অর্জ্জুন মিশ্র এই সব পাঠাইয়াছেন, আরও অনেক জিনিষ আছে আমরা শীঘ্র আনিতেছি। জিনিষপত্রে ঘর ভরিয়া গেল। হঠাৎ মিশ্রের পত্নী লক্ষ্য করিলেন, ছেলে দুইটির পিঠ কাটিয়া রক্ত পড়িতেছে। জিজ্ঞাসা করিলেন, কি করিয়া কাটিল। তাহারা বলিল, আমরা ভার বইতে পারি না, তাই অর্জ্জুন মিশ্র প্রহার করিয়াছেন। পত্নী অবাক্ হইলেন, তার স্বামী তো অত্যন্ত শান্ত প্রকৃ্তির মানুষ, তবে কি রাজবাড়ীতে এতসব জিনিষ পাইয়া মাথা খারাপ হইয়া গেল। ছেলে দুইটিকে একটু অপেক্ষা করিতে বলিলেন কিন্তু তাহারা দাঁড়াইল না, অনেক কাজ আছে বলিয়া চলিয়া গেল। স্ত্রী বহু প্রকারের খাবার তৈয়ারী করিয়া প্রাণভরে শ্রীগোবিন্দের ভোগ দিয়া স্বামীর জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। ভাবিতেছেন, এত বেলা হইল, এখনও স্বামী ফিরিয়া আসিতেছেন না, তিনি তো বাইরে কোথায়ও খান না।

      এদিকে, অর্জ্জুন মিশ্র ভিক্ষায় বাহির হইয়া অনেক ঘুরিলেন কিন্তু কিছুই মিলিল না। ক্লান্ত হইয়া এক বৃক্ষতলে বসিয়াছেন, একটু পরে ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। ঘুম ভাঙ্গিলে দেখিলেন, দুপুর প্রায় গড়াইয়া গিয়াছে। ভিক্ষা কিছু না পাইয়া একটু বিষন্ন মনে ঘরে ফিরিলেন। স্ত্রী অনুযোগ করিয়া বলিলেন, এত দেরী কেন করিলে? কখন সব রান্না করিয়া, গোবিন্দের ভোগ দিয়া, বসিয়া আছি। অর্জ্জুন মিশ্র জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘরে কিছু ছিল না, কি দিয়া ভোগ হইল? স্ত্রী বলিলেন, কেন, তুমি রাজবাড়ী হইতে কত জিনিষ পাঠাইয়াছ, দেখ ঘর ভর্ত্তি হইয়া গিয়াছে। দুইটি খুব সুন্দর ছেলে, একটি কালো, একটি ফরসা, সব জিনিষ বহন করিয়া আনিয়াছে। কত না হইয়াছে তাহাদের! তারপর দেখি, তাহাদের পিঠ কাটিয়া রক্ত পড়িতেছে। তাহারা বলিল- আমরা ভার বহন করিতে পারিনা, এইজন্য অর্জ্জুন মিশ্র মারিয়াছেন। অর্জ্জুন মিশ্র তখন বলিলেন, আমি রাজবাড়ী মোটেই যাই নাই এবং কিছু ভিক্ষাও আজ পাই নাই। এ নিশ্চয় কৃষ্ণ-বলরাম, নিজেরা সব জিনিষ বহন করিয়া আনিয়াছেন, তুমি দেখিয়াও চিনিতে পার নাই। আর পিঠ কাটিয়া যে রক্ত পড়িতেছে দেখিয়াছ, তাহার কারণ, আমি গীতার ‘বহাম্যহম্’ কাটিয়া ‘দদাম্যহম্’ লিছিয়াছি। গীতা তো তাঁহার হৃদয় (গীতা মে হৃদয়ং পার্থ), সেখানে আঘাত লাগিয়াছে। কী অসীম করুণা তাঁহার! ভাবিয়া স্বামী-স্ত্রী আকুল হইলেন কাঁদিয়া। মিশ্র তখনই যাইয়া গ্রন্থের ‘দদাম্যহম্’ কাটিয়া তিনবার লিখিলেন ‘বহাম্যহম্’। নিজে ভক্তের যোগক্ষেম যে বহন করেন তিনি, আমি অর্জ্জুন মিশ্র তাহার সাক্ষী!

      গীতার সার-কথা ইহাই। এই কথা আমরা শুনিয়াও শুনি না, বুঝিয়াও বুঝি না। অহঙ্কার অনেক প্রকারের, তাহা দূর করিবার চেষ্টা করি না। শাস্ত্রের কথা, শাস্ত্রের ভাষা আমাদের মন স্পর্শ করে না। আমাদের অবস্থা, যেমন নদীর স্রোতে পড়িয়াছে এক বিরাট হাতি, প্রবল স্রোতে প্রাণ ওষ্ঠাগত, কিছুতেই উঠিতে পারিতেছে না! সেই নদীর স্রোতে ছোট ছোট মাছ আনন্দে সাঁতার কাটিয়া চলিতেছে। মাছ হাতিকে বলিতেছে, কেন এত কষ্ট পাইতেছ, এস না আমাদের মত। মাছের ভাষা হাতি বুঝিতে পারে না, তার পথে চলিতে পারে না। ভক্তের ভাষা অভক্তেরা বুঝে না। বিষয়ীরা কর্ণপাতও করে না। তাহাদের কাছে জীবনটা মনে হয় সংগ্রামময়, দুঃখভরা। কিন্তু যিনি পুরুষোত্তমকে ভালবাসিয়াছেন, মঙ্গলকামী সুহৃদ বলিয়া জানিয়াছেন, তাঁহার জীবনে কোন দুঃখ নাই, বিপদ আপদ যাহাই আসুক, তাঁহাকে উদ্বেগ দিতে পারে না, তাঁহার শান্তি নষ্ট করিতে পারে না। এই দুঃখ ভরা সংসারেই ঋষিরা অনুভব করিয়াছেন আনন্দভরা মধুময়তা। ‘মধু বাতা ঋতয়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ’ – অফুরন্ত মধু, অনাবিল আনন্দ; কারণ মধুব্রহ্মের সঙ্গে, আনন্দময় ভগবানের সঙ্গে, তাঁহারা ছিলেন নিত্যযুক্ত। শ্রীভগবানকে আপন জন, প্রিয় ও সর্ব্বভূতের সুহৃদ বলিয়া যিনি জানেন, তিনিই শান্তিলাভ করেন- গীতায় ইহাই ভগবানের বাণী-
“সুহৃদং সর্ব্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি”
জয় জগদ্বন্ধু!

শ্রীমদ্ভগবদগীতা ১ম অধ্যায়:- অর্জুনবিষাদযোগ- এর সার সংক্ষেপ:-

লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
          ৪৬টি শ্লোকবিশিষ্ট গীতার প্রথম অধ্যায়টি ‘অর্জুনবিষাদযোগ’ নামে পরিচিত। এ অধ্যায়ে অর্জুনের বিষাদ-ই মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। অধ্যায়টি শুরু হয়েছে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের উক্তি দিয়ে এবং শেষ হয়েছে তার মন্ত্রী সঞ্জয়ের উক্তি দিয়ে। এ অধ্যায়ে তৃতীয় পান্ডব মহাবীর অর্জুনের উক্তির মাধ্যমে ব্যক্ত তার বিষাদই মূল সুর। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, গীতার সকল কথাই ধৃতরাষ্ট্রের সমীপে বিবৃত করা হয় সঞ্জয় কর্তৃক হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে। ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন জন্মান্ধ। তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তার পুত্রগণ এবং পান্ডব পুত্রগণের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের বর্ণনা তার মন্ত্রী সঞ্জয়ের নিকট জানতে চেয়েছিলেন। ধর্মপ্রাণ সঞ্জয় ব্যাসদেবের কৃপায় দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছিলেন বিধায় তিনি প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধক্ষেত্রের সকল ঘটনা দর্শন এবং কথা শ্রবণ করতে পেরেছিলেন এবং তা ধৃতরাষ্ট্রকে অবহিত করেছিলেন। অন্ধ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের নিকট জানতে চাইলেন যে, ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে তার যুদ্ধাভিলাষী পুত্রগণ এবং পান্ডু পুত্রগণ সমবেত হয়ে কী করেছিলেন। তদুত্তরে সঞ্জয় রাজাকে জানালেন যে, তার পুত্র দুর্যোধন পান্ডবপক্ষের সৈন্যসজ্জা অবলোকন করে গুরু দ্রোণাচার্যের নিকট গিয়ে বর্ণনা করতে লাগলেন পান্ডবপক্ষে কোন্ কোন্ মহারথী যুদ্ধ করতে এসেছেন এবং তারই (দ্রোণাচার্যের) প্রিয় শিষ্য দৃষ্টদুম্ন কিভাবে পান্ডবপক্ষের সৈন্যসজ্জা পরিচালনা করছেন। অতপর তিনি তার নিজের পক্ষের মহাবীর ও মহারথীগণের সম্বন্ধেও দ্রোণাচার্যকে অবহিত করে এ মর্মে মন্তব্য করলেন যে, পান্ডবদের সৈন্য সসীম কিন্ত তাদের সৈন্য অপরিমিত। দুর্যোধনের নিকট থেকে সব অবহিত হবার পর কুরুবংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্মদেব দুর্যোধনের হর্ষ উৎপাদনের জন্য সিংহের গর্জনের ন্যায় উচ্চনাদে শঙ্খধ্বনি করলেন। সেই সাথে কৌরব পক্ষের অন্যরাও তাদের নিজ নিজ শঙ্খ, পরবর্তী অংশ পার্শ্ববর্তী কলামে, এখানে ক্লিক করুনঃ-
পার্শ্ববর্তী বিবরণের পরবর্তী অংশ
সেই সাথে কৌরব পক্ষের অন্যরাও তাদের নিজ নিজ শঙ্খ, ভেরী, পনব, আনক, শিঙ্গা ধ্বনি করলে সবকিছু মিলে এক তুমুল শব্দের সৃষ্টি হলো। অপরপক্ষে শ্বেত অশ্বযুক্ত দিব্য রথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনও তাদের নিজ নিজ শঙ্খধ্বনি করলে এ তুমুল শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণের হৃদয় বিদারিত করতে লাগলো। এ সময় ধনুর্ধর অর্জুন ধনুক ও শর হস্তে ধারণ করে কৌরবপক্ষের যোদ্ধাগণকে দেখার মানসে তার রথের সারথি শ্রীকৃষ্ণকে উভয় সেনাদলের মাঝখানে রথখানি স্থাপন করতে অনুরোধ করলেন। রথখানি যথাস্থানে স্থাপিত হলে অর্জুন লক্ষ্য করলেন তার সম্মুখে ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ গুরুজনের সাথে মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, শশুর, মিত্র ও শুভাকাংখীগণ উপস্থিত রয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বিপক্ষে আচার্য,আত্মীয়-স্বজনদের অবলোকন করে অর্জুন বিষাদগ্রস্থ হলেন। বিষাদিত অর্জুনের সর্বশরীর কম্পিত ও রোমাঞ্চিত হতে লাগলো এবং তার হস্ত থেকে গান্ডিব যেন খসে পড়ছে। যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক ও করুণ পরিণতির কথা ভেবে অস্থির অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বললেন যে, তিনি এ যুদ্ধ করবেন না, কারণ তিনি এতে কোন মঙ্গল দেখছেন না। যু্দ্ধের চরম অমঙ্গলের কারণ হিসেবে এ মর্মে যুক্তি উপস্থাপন করলেন যে, যুদ্ধে গুরুজনকে হত্যা করে রাজ্যসুখ ভোগ করলে মহাপাপ তাদের আচ্ছন্ন করবে। তাছাড়া আত্মীয় স্বজনকে বধ করে রাজ্য লাভে কোন সুখ ও শান্তি নেই কারণ পুত্র, পৌত্র, ভ্রাতা, আত্মীয় বধ করলে কুলক্ষয় হয়, কুলক্ষয়ে কুলধর্ম বিনষ্ট হয় এবং তাহলে সমগ্র বংশ অধর্মে নিপাতিত হয়। কুল অধর্মে অভিভুত হলে কুলস্ত্রীগণ ব্যভিচারী হয়, তা থেকে বর্ণ সঙ্কর উৎপাদিত হলে কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেকুলে পিন্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পাওয়ায় পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়। এসব কথা উচ্চারণ করে অর্জুন অত্যন্ত বিষন্ন মনে শ্রীকৃষ্ণ সমীপে মন্তব্য করলেন যে, তাকে নিরস্ত্র অবস্থায় শস্ত্রধারী ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ যুদ্ধে বধ করলেও তার অধিকতর মঙ্গল হবে। এভাবে অর্জুন রণক্ষেত্রে ধনুর্বান ত্যাগ করতঃ শোকভারাক্রান্ত চিত্তে রথোপরি উপবেশন করলেন। যুদ্ধের করুণ ভয়াবহ পরিণতির ভাবনা অর্জুনের ভেতর যে বিহবলতা, বিষন্নতা ও হৃদয়-দৌর্বল্য সৃষ্টি করেছিল তাই প্রকটিত হয়ে উঠেছে প্রথম অধ্যায় ‘অর্জুন বিষাদযোগে’। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।

শ্রীমদ্ভগবদগীতা          

        ০১.অর্জুনবিষাদযোগ.  ০২.সাংখ্যযোগ ..  ০৩.কর্মযোগ..  ০৪.জ্ঞানযোগ..  ০৫.কর্মসন্যাসযোগ.  ০৬.ধ্যানযোগ...
   ০৭.জ্ঞান-বিজ্ঞানযোগ..  ০৮.অক্ষরব্রহ্মযোগ..  ০৯.রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ.  ১০.বিভূতিযোগ..  ১১.বিশ্বরূপদর্শনযোগ.  ১২.ভক্তিযোগ...       ১৩.ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগ.  ১৪.গুণত্রয়বিভাগযোগ..  ১৫.পুরুষোত্তমযোগ..  ১৬.দৈবাসুরসম্পদবিভাগযোগ.  ১৭.শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ.  ১৮.মোক্ষযোগ..

সাইট-টি আপনার ভাল নাও লাগতে পারে, তবুও লাইক দিয়ে উৎসাহিত করুনঃ

শেয়ার করে প্রচারে অবদান রাখতে পারেন