সনাতন ধর্মের সুনির্বাচিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু শ্লোকঃ- দেখতে- সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর  ক্লিক করুন- 

যোগ, তপশ্চর্যা ও আত্মসমর্পণ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক

"শ্লোক:
যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু ৷
যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা ॥
(গীতা ৬/১৭)"
অনুবাদঃ- যিনি পরিমিত আহার ও বিহার করেন, পরিমিত প্রয়াস করেন, যাঁর নিদ্রা ও জাগরণ নিয়মিত, তিনিই যোগ অভ্যাসের দ্বারা সমস্ত জড়-জাগতিক দুঃখের নিবৃত্তি সাধন করতে পারেন।
শ্লোক:
মানস, দেহ, গেহ, যো কিছু মোর ।
অর্পিলুঁ তুয়া পদে, নন্দকিশোর ।।
(ভক্তিবিনোদ ঠাকুর, শরণাগতি)
অনুবাদঃ- আমার মন, দেহ, গৃহ, যা কিছু রয়েছে, সবই আমি তোমার চরণে অর্পণ করলাম, হে নন্দকিশোর !
"শ্লোক:
প্রাপ্য পুণ্যকৃতাং লোকানুষিত্বা শাশ্বতীঃ সমাঃ ৷
শুচীনাং শ্রীমতাং গেহে যোগভ্রষ্টোহভিজায়তে ॥
(গীতা ৬/৪১)"
অনুবাদঃ- যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি পুণ্যবানদের প্রাপ্য স্বর্গাদি লোকসমূহে বহুকাল বাস করে সদাচারী ব্রাহ্মণদের গৃহে অথবা শ্রীমান ধনী বণিকদের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন।
"শ্লোক:
যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্ গতেনান্তরাত্মনা ৷
শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ ॥
(গীতা ৬/৪৭)"
অনুবাদঃ- যিনি শ্রদ্ধা সহকারে মদ্ গত চিত্তে আমার ভজনা করেন, তিনিই সবচেয়ে অন্তরঙ্গভাবে আমার সঙ্গে যুক্ত এবং তিনিই সমস্ত যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সেটিই আমার অভিমত৷
শ্লোক:
আরাধিতো যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্।
নারাধিতো যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্।।
(নারদ-পঞ্চরাত্র)
অনুবাদঃ- যদি শ্রীহরির আরাধনা করা হয়, তা হলে কঠোর তপস্যার কি প্রয়োজন, কেন না তপস্যার লক্ষ্যবস্তু তো লাভ হয়েই গেছে। আর সমস্ত রকমের তপস্যা করেও যদি শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করা না যায়, তা হলে তপস্যার কোনও মূল্য নেই, কেন না শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া সকল তপস্যাই বৃথা শ্রম মাত্র।
শ্লোক:
অন্তর্বহির্যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্ ।
নান্তর্বহির্যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্ ।।
(নারদ-পঞ্চরাত্র)
অনুবাদঃ- শ্রীহরি যে সর্বব্যাপক, তিনি যে অন্তরে ও বাইরে সর্বত্রই আছেন, এই উপলব্ধি যার হয়েছে, তপস্যায় তার কি প্রয়োজন। আর শ্রীহরি যে সর্বব্যাপক, এই উপলব্ধিই যদি না হল, তা হলে সব তপস্যাই বৃথা ।
"শ্লোক:
ময্যাসক্তমনাঃ পার্থ যোগং যুঞ্জন্মদাশ্রয়ঃ ।
অসংশয়ং সমগ্রং মাং যথা জ্ঞাস্যসি তচ্ছৃণু ॥
(গীতা ৭/১)"
অনুবাদঃ- হে পার্থ ! আমাতে আসক্তচিত্ত হয়ে, আমাতে মনোনিবেশ করে যোগাভ্যাস করলে, কিভাবে সমস্ত সংশয় থেকে মুক্ত হয়ে আমাকে জানতে পারবে, তা শ্রবণ কর।
"শ্লোক:
যং ব্রহ্মাবরুণেন্দ্ররুদ্রমরুতঃ স্তুন্বন্তি দিব্যৈইঃ স্তবৈ-
র্বেদ্যৈইঃ সাঙ্গপদক্রমোপনিষদৈর্গায়ন্তি যং সামগাঃ
ধ্যানাবস্থিত-তদ্ গতেন মনসা পশ্যন্তি যং যোগিনো
যস্যান্তং ন বিদুঃ সুরগণা দেবায় তস্মৈ নমঃ ॥
(ভাগবত ১২/১৩/১)"
অনুবাদঃ- ব্রহ্মা, বরুণ, ইন্দ্র, রুদ্র, ও মরুৎগণ দিব্য স্তবদ্বারা যাঁকে স্তুতি করেন, সামবেদগায়কগণ অঙ্গ, পদক্রম ও উপনিষদসহ সমগ্র বেদদ্বারা যাঁর স্তুতিগান করেন, যোগিগণ ধ্যানাবস্থিত তদ্ গতচিত্তে যাঁকে দর্শন করেন, দেবতা ও অসুরগণ যাঁর শেষ জানেন না, সেই দেবতাকে নমস্কার ॥৯॥
শ্লোক:
পন্থাস্তু কোটিশতবৎসরসংপ্রগম্যো
বায়োরথাপি মনসো মুনিপুঙ্গবানাম্ ।
সোহপ্যস্তি যৎ প্রপদসীম্ন্যবিচিন্ত্যতত্ত্বে
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ।।
(ব্রহ্মসংহিতা ৫/৩৪)
অনুবাদঃ- সেই প্রাকৃত চিন্তাতীত তত্ত্বে গমনেচ্ছু প্রাণায়ামগত যোগীদিগের বায়ু-নিয়ামনপথ অথবা অতন্নিরসনকারী নির্ভেদ-ব্রহ্মানুসন্ধানকারী মুনিশ্রেষ্ঠদিগের জ্ঞানচর্চারূপ পন্থা শত-কোটি বৎসর চলেও যাঁর চরণারবিন্দের অগ্রসীমা মাত্র প্রাপ্ত হয়, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজন করি।
শ্লোক:
গ্রাম্যকথা না শুনিবে, গ্রাম্যবার্তা না কহিবে ।
ভাল না খাইবে আর ভাল না পরিবে ।।
(চৈঃ চঃ অন্ত্য ৬/২৩৬)
অনুবাদঃ- জড়-জাগতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে না এবং সেই সমস্ত বিষয়ে শ্রবণ করবে না। ভাল খাবার খাবে না এবং ভাল কাপড় পরবে না। (রঘুনাথ দাস গোস্বামীর প্রতি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উপদেশ)
"শ্লোক:
বিষয়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ ।
রসবর্জং রসোহপ্যস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে ॥
(গীতা ২/৫৯)"
অনুবাদঃ- দেহবিশিষ্ট জীব ইন্দ্রিয় সুখ ভোগ থেকে নিবৃত হতে পারে, কিন্তু তবুও ইন্দ্রিয় সুখ ভোগের আসক্তি থেকে যায়। কিন্তু উচ্চতর স্বাধ আস্বাদন করার ফলে তিনি সেই বিষয়তৃষ্ণা থেকে চিরতরে নিবৃত্ত হন।
"শ্লোক:
কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্ ।
ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমুঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে ॥
(গীতা ৩/৬)"
অনুবাদঃ- যে ব্যক্তি পঞ্চ-কর্মেন্দ্রিয় সংযত করেও মনে মনে শব্দ, রস আদি ইন্দ্রিয়গুলি স্মরণ করে, সেই মুঢ় অবশ্যই নিজেকে বিভ্রান্ত করে এবং তাকে মিথ্যাচারী ভণ্ড বলা হয়ে থাকে ।
শ্লোক:
অনাসক্তস্য বিষয়ান্ যথার্হমুপযুঞ্জতঃ।
নির্বদ্ধঃ কৃষ্ণসম্বন্ধে যুক্তং বৈরাগ্যমুচ্যতে ।।
প্রাপঞ্চিকতয়া বুদ্ধ্যা হরিসম্বন্ধিবস্তুনঃ ।
মুমুক্ষুভিঃ পরিত্যাগো বৈরাগ্যং ফল্গু কথ্যতে ।।
(ভঃ রঃ সিঃ ১/২/২৫৫-৬)
অনুবাদঃ- কেউ যখন বিষয়ে অনাসক্ত হয়েও কৃষ্ণসেবার জন্য সব কিছু গ্রহণ করেন, তিনিই প্রকৃত বৈরাগ্যে স্থিত হয়েছেন। অপরপক্ষে, যিনি সমস্ত বস্তুর সঙ্গেই যে কৃষ্ণের সম্পর্ক রয়েছে, তা না জেনে সব কিছুই ত্যাগ করেন, তিনি পূর্ণ বৈরাগ্য লাভ করতে পারেননি।
শ্লোক:
আনুকূল্যস্য সঙ্কল্পঃ প্রাতিকূল্যস্য বর্জনম্ ।
রক্ষিষ্যতীতি বিশ্বাসো গোপ্তৃত্বে বরণং তথা ।
আত্মনিক্ষেপকার্পণ্যে ষড়বিধা শরণাগতিঃ ।।
(হরিভক্তি-বিলাস ১১/৪১৭)
অনুবাদঃ- শরণাগতির ছয় প্রকার লক্ষণ- কৃষ্ণভক্তির অনুকূল যা গ্রহণ করা, কৃষ্ণভক্তির প্রতিকূল বিষয় বর্জন করা, কৃষ্ণ সব সময়ই রক্ষা করবেন এই বিশ্বাস, শ্রীকৃষ্ণকে প্রভুরূপে গ্রহণ করা, সর্বতোভাবে শরণাগত হওয়া এবং দৈন্য ।
"শ্লোক:
অনাশ্রিতঃ কর্মফলং কার্যং কর্ম করোতি যঃ ৷
স সন্ন্যাসী চ যোগী চ নিরগ্নির্ন চাক্রিয়ঃ ॥
(গীতা ৬/১)"
অনুবাদঃ- পরমেশ্বর ভগবান বললেন- যিনি অগ্নিহোত্রাদি কর্ম ত্যাগ করেছেন এবং দৈহিক চেষ্টাশূন্য তিনি সন্ন্যাসী বা যোগী নন৷ যিনি কর্মফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে তাঁর কর্তব্য কর্ম করেন তিনিই যথার্থ সন্ন্যাসী বা যোগী।
"শ্লোক:
সর্বাধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥
(গীতা ১৮/৬৬)"
অনুবাদঃ- সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। তুমি শোক করো না।
শ্লোক:
হরিসেবায় যাহা হয় অনুকূল ।
বিষয় বলিয়া তাহার ত্যাগে হয় ভুল ।।
(ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী)
অনুবাদঃ- হরিসেবার অনুকূল বস্তুকে যিনি জড় বিষয় জ্ঞানে পরিত্যাগ করেন, তিনি মহাভুল করছেন ।
(সূত্রঃ- বৈষ্ণব শ্লোকাবলী) এরপর দেখুন= শ্রীমদ্ভাগবতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক

সাইট-টি আপনার ভাল নাও লাগতে পারে, তবুও লাইক দিয়ে উৎসাহিত করুনঃ

শেয়ার করে প্রচারে অবদান রাখতে পারেন