সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক বিষয়ঃ অবশ্যই জানা উচিৎ

আমাদের জীবনে পূর্বজন্মের প্রাসংগিকতা:

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )
উপরে উল্লেখিত ঘটনাটির মতো একইরকম ঘটনার সংগে পরিচিতি বহু মানুষের রয়েছে। তবুও অনেকেই মৃত্যর পর জীবনের অস্তিত্বের কথা ভেবে ভীত হয়ে পড়েন, তাঁরা শীঘ্রই সবকিছু ভুলে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনের বাঁধাধরা কার্যকলাপে মগ্ন হয়ে পড়েন। বর্তমান যুগে মানুষ তাদের নিজস্ব কেরিয়ার, পরিকল্পনা নিয়ে এতই ব্যস্ত যে তাদের এর বাইরে ভাবনা-চিন্তা করার সময় বা ইচ্ছা, কোনটাই নেই। সবকিছুকেই তারা ব্যক্তিগত, ঐহিক লাভালাভের ভিত্তিতে বিচার করে থাকেঃ “বেশ, পূর্বজন্ম সত্যি। কিন্তু তা জেনে আমার লাভ কোথায়? এইসব নিরর্থক আলোচনার প্রয়োজন কি? আমার জীবনে পুনর্জন্মের কি উপযোগিতা আছে?” নিঃসন্দেহে, আমাদের জীবনে পুনর্জন্মের অত্যন্ত অর্থপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যখন আমরা জন্মান্তর তত্ত্ব উপলব্ধি করি, তাকে সত্যি বলে স্বীকার করি, তখন স্বভাবতঃই এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আমরা এই দেহ নই, আমরা চিন্ময় আত্মা। কিন্তু ঘুম থেকে সকালে জেগে ওঠার পর থেকে সারা দিনে-রাত্রে, শোবার সময় পর্যন্ত আমরা যা-কিছু করে থাকি- অফিসে যাওয়া, অর্থ রোজগার করা, খাওয়া, ঘুমানো, সন্তান উৎপাদন করা, আত্মরক্ষার বন্দোবস্ত করা, আমোদ-প্রমোদ করা- এ সবই আমরা করে থাকি দেহের জন্য, যেটি কেবল একটি পোশাক ছাড়া আর কিছুই নয়। আসল ট্রাজেডি আসে তখন, যখন দেহ-পোশাকটি জীর্ণ-হয়ে যায় আমাদের সঞ্চিত অর্থ, সম্পদ-সম্পত্তি, আত্মীয়স্বজন, পুত্র-পরিজন- এমনকি সকল কর্মাবর্তের কেন্দ্রবিন্দুস্বরূপ অতিপ্রিয় এই দেহটিকেও মৃত্যু নিষ্ঠুরভাবে ছিনিয়ে নেয়। আত্মাকে দেহ থেকে বের করে দেওয়া হয়, তারপর আত্মা পূর্ব দেহকৃ্ত কর্মফল অনুসারে অন্যত্র কোনো একটি শরীর গ্রহণ করে থাকে।

অবশ্য, দেহান্তরিত হবার সময়, একটি-দেহ ত্যাগ করার সময় আত্মা পুরোপুরি জড়-আবরণ বা শরীর-পোশাক হতে মুক্ত হয় না। স্থুল শরীরটি চলে গেলেও মন-বুদ্ধি-ও অহঙ্কার (মিথ্যা ‘আমি’-বোধ), এই তিনটি সূক্ষ্ম, অদৃশ্য জড় উপাদানে নির্মিত শরীরটি থাকে। যতদিন জড়বাসনা, ভোগপ্রবৃত্তি নির্মূল হয়ে শুদ্ধ ভক্তির উন্মেষ না হয়, ততদিন আত্মা জড়দেহ হতে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয় না।

এই সব বাসনা, কর্মফল, সূক্ষ্ম শরীরের সাহায্যে এক স্থুল দেহ হতে অন্য স্থুলদেহে বাহিত হয়। আত্মা তার সূক্ষ্ম শরীরে কি কি বহন করে নিয়ে যায়? (১) পূণ্য কর্মফল, (২) পাপ কর্মফল, (৩) ত্রিগুণের প্রভাব, (৪) জড় বাসনা, (৫) ভক্তিমূলক সুকৃ্তি। এগুলির মধ্যে প্রথম দুটির ফলে ভাল ও খারাপ ফল ভোগ করতে হয়, তৃ্তীয়টি অর্থাৎ বিভিন্ন মাত্রার ত্রিগুণের প্রভাবে বিশেষ ধরণের শরীর ও স্বভাব লাভ হয়, চতুর্থটি- অর্থাৎ জড়বাসনা জড়শরীর লাভকে সুনিশ্চিত করে (জড়জগৎরূপ কারাগারের মেয়াদ বৃদ্ধি করে) এবং পঞ্চম অর্থাৎ ভক্তিমূলক সুকৃতি বা সেবা-কর্ম আত্মাকে সমস্ত কর্মফল, গুণ-প্রভাব, জড়বন্ধন থেকে মুক্ত করে ভগবদ্ধামে নীত করে, যেখানে তিনি সরাসরি ভগবানের সংগে নিত্য লীলাবিলাসে অংশগ্রহণ করতে পারেন, যা দিব্যমধুর, পরমানন্দদায়ক!

আপনি কি কসাইখানায় একটির পর একটি ছাগলের শিরশ্ছেদ হতে দেখেছেন? ছাগলের বুদ্ধির কথা একটু ভাবুন। একটি কসাইখানায় যদি দুটি ছাগল দেখেন, তাহলে দেখবেন যে একটি ছাগলকে যখন মুন্ডু কেটে তাঁর চর্ম ছাড়িয়ে কেটে কেটে বিক্রি করা হচ্ছে, অন্য ছাগলটি তখন সামনে ফেলে দেওয়া কিছু কচি ঘাস পরম নিশ্চিন্ত মনে আধ বোজা চোখে চিবোচ্ছে! আপনি যদি তাকে গিয়ে বলেন, ‘ওহে, দেখছ না এরপরই তোমার পালা আসছে? তোমারও এখনই মুন্ডু কাটা হবে! ঘাসের লোভে এখানে পড়ে থেকো না, এখনি পালাও!’ সে আপনার কথায় আদপেই কর্ণপাত করবে না। সে তার অর্ধনিমীলিত চোখে সুখের আবেশে কেবল মাথাটি নাড়বে, চিবোতে থাকবে কচি ঘাস। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ... ... ... ওকস্মাৎ তাকে ধরে নিয়ে যওয়া হয়, এক ধারাল খড়গ মাথার উপর নামে বিদ্যুৎগতিতে, আলাদা হয়ে যায় ধড় থেকে মুণ্ডটি মুহুর্তেই, ভেঙে যায় সুখ-তৃপ্তির মধুর দিবাস্বপ্ন!

জড় দেহঃ আত্মার পরিবর্তনশীল পোশাক:

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )
জড়দেহটি সর্বদা পরিবর্তনশীল। কোষগুলি সদা-সর্বদা রূপান্তরিত হয়ে চলেছে। সাত বছর অন্তর দেহের সমস্ত কোষগুলিই যায় বদলে। আপনি সাত বছর বা চৌদ্দ বছর পূর্বে যে দেহটি ব্যবহার করতেন, এখন আপনার সেই দেহটি নেই। ঠিক যেমন আপনার কয়েক বছর আগের পোশাকটি এখন আর পূর্বের মতো নেই। একটি নধর কোমল শিশুদেহ এভাবে ৮০ বছরে এক জরা-জীর্ণ দেহে রূপান্তরিত হয়।

কিন্তু অস্থায়ী জড়দেহ-রূপ পোশাকটির এতসব রূপান্তর ঘটলেও দেহাভ্যন্তরস্থ আত্মা সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকে – আত্মার কোনো পরিবর্তন বা বিকার হয় না (অবিকারী, ভ.গী-২/২৫)। আত্মার এমনকি জন্ম বা মৃত্যুও নেই, কেননা আত্মা শাশ্বত। সেজন্য শরীর পরিবর্তিত হলেও আত্মা থাকে অপরিবর্তিত।
অবশিষ্ট অংশ পার্শ্ববর্তী কলামে, এখানে ক্লিক করুন
পার্শ্ববর্তী বিবরণের পরবর্তী অংশ

অমাবশ্যার চাঁদ থাকে অদৃশ্য; তারপর “প্রথমা”, “দ্বিতীয়” তারপর “তৃ্তীয়া”- এইভাবে তিথির সংগে চন্দ্রকলা বাড়তে থাকে, অবশেষে “চতুর্দশী”-র পর আসে পূর্ণিমা। তারপর চন্দ্রকলা হ্রাস পেতে থাকে। ১৪ দিন পর আসে অমাবস্যা- চাঁদকে আর দেখাই যায় না। এইভাবে হ্রাস-বৃদ্ধির এই চক্র ক্রমাগত চলতেই থাকে। কিন্তু স্বয়ং চাঁদের কি কোনো পরিবর্তন হয়? আদপেই নয়। আমাদের আপেক্ষিক অবস্থানের জন্য আমাদের কাছে চন্দ্রকলার হ্রাস-বৃদ্ধি প্রতীয়মান হয়, আমরা একে দ্বিতীয়া, তৃতীয়া বলে থাকি। আমাদের অবস্থানের ভিত্তিতে আমরা এমন মনে করে থাকি- চাঁদের কোনো পরিবর্তন হয় না। ঠিক তেমনি, আমরা পরিবর্তনশীল দেহের সংগে নিজেদের আত্মপরিচয় মিশ্রিত, একীভূত করে ফেলি, অর্থাৎ শরীরের সংগে নিজেদের সম্পৃক্ত করে ফেলি। আমরা অবিরাম বিভিন্ন ধরণের শরীরের অভিজ্ঞতা পেতে থাকি- শিশুদেহ, কৈশোর, বার্ধক্য, মৃত্যু, কখনো উদ্ভিদ দেহ, কখনো পশু-দেহ। আমরা জড়-অস্তিত্বের এইসব নানা অবস্থার সংগে নিজেদেরকে এক করে ফেলি, কিন্তু প্রকৃ্তপক্ষে আমরা স্বরূপতঃ অপরিবর্তনীয় শাশ্বত আত্মা, ঐ সব অবস্থার সংগে আমাদের কোনো শাশ্বত সম্পর্ক নেই। বাহ্যিক স্থূল দেহটি আসলে এই জড়জগতে চলবার উপযোগী আত্মার একটি কোটের মতো। ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন।”

জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )
জড়া প্রকৃতি ত্রিগুণাত্মিকা- তিনটি গুণে গঠিত; এগুলি হচ্ছে (১) সত্ত্ব গুণ (২) রজো গুণ এবং (৩) তমো গুণ।

‘গুণ’ শব্দের অপর একটি অর্থ হচ্ছে ‘রজ্জু’ বা দড়ি। তিন ‘তন্তু’ (সূত্র) পাকিয়ে দড়ি তৈরী করা হয়। প্রথমে তন্তু পাকিয়ে তিনটি সূত্র করা হয়। তারপর এগুলি পাকিয়ে একটি মোটা সূত্র হয়। এইরকম তিনটি করে সূত্র পাকিয়ে অপেক্ষাকৃত মোটা সূত্র বানানো হয় এবং এইরকম আরো তিনটি সূত্র অসংখ্যবার পাকিয়ে খুব শক্ত দড়ি তৈরী করা হয়। এইভাবে তিনটি গুণ পারস্পারিক মিশ্রণে প্রথমে নয় রকমের হয়, ঐগুলির পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়া থেকে ৯ x ৯ = ৮১ টি মিশ্রণ হয়; এইভাবে তিনটি গুণের মিথস্ক্রিয়ায় অসংখ্য ‘রঞ্জক’ বা মিশ্রণ উৎপন্ন হয়, ঠিক যেমন লাল, হলুদ ও সবুজ- এই তিনটি রঙের বিভিন্ন মাত্রার মিশ্রণে বহুরকমের রঞ্জক সৃষ্টি করা যায়।

এই ‘গুণ’ বা দড়ির দ্বারা জড়া শক্তি জীবাত্মাকে জড় জগতে আবদ্ধ করে রাখে। চেতনায় জড় গুণের প্রভাব যত বর্ধিত হয়, জড়বন্ধন ততই তীব্র হয়, জড় আসক্তি ততই প্রবল হতে থাকে। আমাদের নিজেদের চেষ্টায় আমরা এই গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারি না।

জীবাত্মার এই জড় বন্ধনে আবদ্ধ থাকাকে শাস্ত্রে ‘প-বর্গ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, আর বন্ধনমুক্তিকে বলা হয় ‘অপবর্গ’। ব্যকরণের বর্ণমালা পাঁচটি বর্গে বিভক্ত; এর মধ্যে পঞ্চম বর্গটি হচ্ছে প; এই বর্গে পাঁচটি বর্ণ রয়েছেঃ প, ফ, ব, ভ, ম। জড়বন্ধনকালীন দুর্দশাকে পাঁচটি অক্ষরের প্রতীকে ব্যক্ত করা হয়েছে; তা এইরকমঃ

প = পরিশ্রমঃ এই জড় জগতে প্রত্যেক জীব সত্তাকে ‘বেঁচে’ থাকার জন্য অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। একে বলা হয় ‘জীবন সংগ্রাম’, অস্তিত্ব রক্ষার কঠোর লড়াই।

ফ = ফেনাঃ যখন একটি ঘোড়াকে কঠোর পরিশ্রম করানো হয়, যেমন একটি ভারী মালবোঝাই গাড়ী টানানো- তখন তার মুখের দু’পাশ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে আসে। ঠিক তেমনি আমাদেরকেও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়; সরাসরি দেখা না গেলেও ঐ একইভাবে যেন মুখে ফেনা বেরিয়ে আসে- অর্থাৎ শেষ শক্তি ব্যয় করে পরিশ্রম করে যেতে হয়। প্রত্যেকেই ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রাত-দিন জ্ঞান না করে পরিশ্রম করে চলে।

ব = ব্যর্থতাঃ আমাদের কঠোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই জগতে আমাদের সকল আশা ব্যর্থ হয়, সকল প্রয়াস বিফল হয়।

ভ = ভয়ঃ জড় জাগতিক জীবনে আমরা সর্বদাই নানা ভয়, উৎকণ্ঠা, শঙ্কার দাবানলে দগ্ধীভূত হতে থাকি।

ম = মৃত্যুঃ আমাদের সমস্ত আশা, মমত্বলালিত সুখস্বপ্নের অন্তিম সমাধি রচনা করে অপ্রতিরোধ্য, অনিবার্য মৃত্যু। জন্মের পর জন্ম – অন্তহীন কাল ধরে জড় অস্তিত্বের দুর্দশাভোগ থেকে, এই ‘প-বর্গ’ থেকে বেরিয়ে আসার নিশ্চিত উপায় হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলন। অন্য কথায়, কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করলে আমরা ‘অপবর্গ’ লাভ করি, যার অর্থ হচ্ছে এই প-বর্গ হতে অব্যাহতি, অর্থাৎ আমরা এমন স্তরে উন্নীত হই, সেখানে এই জড় অস্তিত্ব-জাত কঠোর সংগ্রাম, ব্যর্থতা, ভয় বা মৃত্যু – কোনটিরই অস্তিত্ব নেই।


এর পর দেখুনঃ সত্ত্ব, রজো ও তমোগুণে প্রভাবিত মানুষের লক্ষণঃ

সাইট-টি আপনার ভাল নাও লাগতে পারে, তবুও লাইক দিয়ে উৎসাহিত করুনঃ

শেয়ার করে প্রচারে অবদান রাখতে পারেন