সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক বিষয়ঃ

নিজের ধর্ম সম্পর্কে আগে ভালোভাবে জানুন এবং অন্যকেও জানতে উৎসাহিত করুন।

Krishna vs Arjun @ Gita



Bhogoban Krishner Picture
  • For Ad Contact
    0183 45 45 989















  • Bhogoban Krishner Picture Bhogoban Krishner Picture
  • For Ad Contact
    0183 45 45 989
  • ধর্ম্ম কি বিজ্ঞান ছাড়া?
    পূর্ববর্তী বিবরণের পর

    -ডঃ শ্রীমন্ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী

    ধর্ম্মের ক্ষেত্রটি প্রধানতঃ গুণের রাজ্য। একজন ধার্মিক ও একজন অধার্মিক ব্যক্তির পার্থক্য গুণগত। এই গুণের রাজ্য বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ আওতার বাহিরে। দেহের রক্ত-কণিকার বিশ্লেষণে চো্র আর সাধুর পার্থক্য ধরা পড়ে না। কোন বৈজ্ঞানিক উপায়ে হিংসাপরায়ণ ব্যক্তিকে কৃপাপরায়ণ করা যায় না। সুতরাং ধর্ম্মরাজ্য সম্পর্কে বিজ্ঞানের কি বলিবার থাকিতে পারে? যে বিষয়গুলি অঙ্কের বিষয়ীভূত, তাহারও দুইটি দিক থাকিতে পারে- এক সংখ্যার (quantity) এবং অপরটি গুণের (quality)। যেমন সঙ্গীতে বা চিত্রকলায়। সঙ্গীতে সুরের খেলা; সুরের মধ্যে সেকেণ্ডে কত স্পন্দন (vibration per second) হইতেছে তার একটা সংখ্যা বা হিসাব করা চলে। চিত্রকলায় রংয়ের খেলা। বর্ণালীর মধ্যে একটা অঙ্কের হিসাব আছে। কিন্তু সংগীত যে মাধুর্য্য ভোগ করায় বা চিত্রের মধ্যে যে সূক্ষ্ম সৌন্দর্য্য-বোধের অনুভূতি জাগায়, অঙ্কের হিসাব সেখানে পৌঁছায় না। গুণগত মাধুর্য্য আস্বাদনে অঙ্কের হিসাব অবান্তর। মাতা পরম স্নেহে সন্তানের গণ্ডে চুম্বন করিয়া যে আনন্দ লাভ করে, তাহা মাতার-ঠোঁটের ও শিশুর গণ্ডের কোন্ কোন্ মাংসপেশীর কি কি স্পন্দন হইল, তার একটা পরিসংখ্যান করা যাইতে পারে। কিন্তু এই হিসাব দ্বারা চুম্বন-জনিত বাৎসল্য স্নেহের মাধুর্য্য ব্যাখ্যা করিতে গেলে একান্তই হাস্যাস্পদ ব্যাপার হইয়া পড়ে।

    আর ধর্ম্ম-রাজ্যের মধ্যে কোথাও ভীতি বা অজ্ঞতার কিছু স্থান হয়ত আছে, কিন্তু তাহা দ্বারা ধর্ম্মের মূল সংবাদ উড়াইয়া দেওয়া মূঢ়তার পরিচায়ক। ধার্মিকের জীবনে হিংসা থাকে না, থাকে সংযম, সত্য, ঔদার্য্য ও পরার্থপরতা। এ সকলের সঙ্গে অজ্ঞতা বা ভীতির কি যোগসূত্র আছে? কিছুই নাই। সুতারং অঙ্ক-সর্বস্ব বিজ্ঞানকে অঙ্কের সীমার মধ্যে থাকিয়া মন্তব্য প্রকাশ করাই সমীচীন মনে করি।

    ৫। ভোগবাদী বলেন, আত্মা বলিয়া কোন বস্তু নাই। তিনি দেহকে তুলনা করেন যন্ত্রের সঙ্গে- একটি ঘড়ি যেমন চলে, জীবনও তেমনি চলে। ঘড়ির আত্মা নাই, কতকগুলি কাঁটা, চাকার বিশেষ প্রকারের বিন্যাসের ফলে উহা চলে। সেইরূপ দেহেও কোন আত্মা নাই, শ্বাস-যন্ত্রের, বিশেষ এক বিন্যাসের ফলে দেহ গতিশীল।

    উত্তরে আমরা বলি, ভোগবাদীর এই যুক্তির পক্ষে জড় বিজ্ঞানও ছিল। কিন্তু এখন আর নাই। বিজ্ঞানই আবিষ্কার করিয়াছে যে, কোনও যন্ত্রের সামর্থ্য নাই নিজেকে মেরামত করিবার বা নিজেকে পরিপুষ্ট করিবার। কিন্তু ঐ যোগ্যতা দেহের আছে। ঘড়ির কাঁচ ভাঙ্গিয়া গেলে বাঁধিয়া রাখিলে জোড়া লাগে না কিন্তু শরীরে ভাঙ্গা হাড় প্লাস্টার করিয়া রাখিলে জোড়া লাগে। কাপড় তৈয়ারের কারখানায় কোন যন্ত্রে তুলা দিলে সূতা পাওয়া যায়। সূতা দিলে কাপড় পাওয়া যায়। মেসিন নিজে কিছু চুরি করে না। কিন্তু দেহযন্ত্র কাঁচামাল গ্রহণ করিয়া নিজে পরিপুষ্ট হয়। আত্মার অবস্থান হেতুই ইহা হয়। শরীরতত্ত্বজ্ঞেরা বলেন, প্রতি সাত বৎসর দেহের সকল জীবাণু (কোষ) বদলাইয়া নূতন দেহ হয়। সবই বদলাইল, কিন্তু পঞ্চাশ বৎসর বয়সেও বাল্যের স্মৃতি কিরূপে অক্ষুণ্ণ থাকে, ইহা বিজ্ঞানের বিস্ময়। বস্তুতঃ আত্মার অস্তিত্বই ইহার কারণ। এই বস্তুকে বিজ্ঞান এখন অস্বীকার করিতে পারে না। তবে আত্মার অবস্থান করিতে স্থান লাগে না। আত্মার ওজন নাই, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নাই, এই জন্য লেবরেটরীতে তাহাকে লইয়া কিছু করা চলে না। অর্থাৎ অঙ্কের ফরমূলায় পড়ে না বলিয়া অঙ্ক-সর্ব্বস্ব বিজ্ঞান আত্মাকে সর্ব্বতোভাবে গ্রহণ করিতে পারে না।

    ৬। জীবনের উদ্দেশ্য বহুজনের কল্যাণ সাধন, ঈশ্বর নামক কোন কাল্পনিক বস্তুর লাভ করা নয়, ইহা ভোগবাদীর কথা। কল্যাণ সাধন কথাটা আমাদের কাছে অস্পষ্ট। কল্যাণ কি? দেহেন্দ্রিয়ের ভোগ্যবস্তুর মাত্রা বাড়ানই কি কল্যাণ? কল্যাণ অর্থ যাহাই হউক একথা নিশ্চয় যে, জীবনে কল্যাণ আসিলে শান্তি আসিবে। শিব আসিলেই আনন্দ আসিবে। মানব সমাজের দিকে তাকাইলে দেখা যায় দুঃখ ও অশান্তির মাত্রা দিনের পর দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। মানবের জীবনে শান্তি আনা ধর্ম্মের একটা বিশেষ কার্য্য। এই কার্য্য যদি বিজ্ঞান সমাধা করিতে পারিত, তাহা হইলে ধর্ম্ম ত আপনিই সরিয়া পড়িত। অশান্তির মাত্রা বাড়াইয়া দিয়া বিজ্ঞান ধর্ম্মের প্রয়োজন আরও বাড়াইয়া দিয়াছে। সুতরাং কার্য্যতঃ ধর্ম্মের প্রয়োজন বাড়াইয়া দিয়া মুখে তাহাকে অপ্রয়োজনীয় বলা ব্যর্থ বাগাড়ম্বর মাত্র।

    ভোগবাদী সুখ বলিতে দেহের সুখই বোঝে। কিন্তু দেহ ছাড়া আত্মা বলিয়া আর একটি বস্তু আছে- আমরা বলি দেহের ভোগ-সম্ভার বিপুলভাবে বাড়িয়াছে, আত্মার সুখ মর্মান্তিকভাবে উপেক্ষিত হইতেছে। ইহাতেই সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হইয়াছে। এই জন্যই এত অশান্তি। এই ভারসাম্য স্থির করিতে হইলে আত্মতত্ত্ব, আত্মার প্রয়োজন ও আত্মার আস্বাদন সম্বন্ধে বিশেষ অবহিত হওয়া প্রয়োজন।

    ৭। ধর্ম্মশাস্ত্রে দুঃখের মহিমা কীর্তিত হইয়াছে, ত্যাগের মহিমা বর্ণিত আছে, ইহা ধনীদের বা ব্রাহ্মণদের অপকৌশল, ইহা ভোগবাদী বলেন। ইহার উত্তরে বলি, দুঃখ দুই প্রকার- কর্ম্মফলকৃত ও স্বেচ্ছায় গৃহীত। যে দুঃখ দুষ্কর্ম্মের জন্য হইয়াছে, তাহা কুত্রাপি প্রশংসনীয় নহে। যাহা মহৎ ব্যক্তি স্বেচ্ছায় বরণ করিয়াছে, তাহা অবশ্যই মহিমান্বিত। জেলের কষ্ট দুঃখদায়ক। যে চুরি করিয়া জেলে গিয়াছে তার দুঃখ হীন, নিকৃষ্ট, ঘৃণার্হ। কিন্তু যে ব্যক্তি দেশের স্বাধীনতার জন্য জেলে আছে, তাঁর দুঃখ মহত্বের, গৌরবের ও অন্য দশজনের অনুকরনের যোগ্য। আর্য্যশাস্ত্রে কোথাও দুষ্কার্য্য-জনিত দুঃখের গৌরব ঘোষিত নাই, তাহাও আছে, যদি ঐ দুঃখ বিষাদ আনিয়া একটি পরমতম বস্তুর সঙ্গে সান্নিধ্য ঘটায়। যেমন অর্জ্জুনের দুঃখ বিষাদ-যোগ হইয়া শরণাগতি আনিল। যাহাই ঈশ্বর সান্নিধ্য আনে, তাহাই গৌরবের। কোন দুঃখ যদি ঈশ্বর-সান্নিধ্য লাভের সহায়ক হয়, তবে তাহা কাম্য। তাই কুন্তীদেবী বলিয়াছেন –
    বিপদং সন্তু তাঃ শশ্বত্তত্র তত্র জগৎগুরো। ভবতো দর্শনং যৎ স্যাদপুনর্ভবদর্শনম্।। (ভাঃ ১/৮/২৫)
    অর্থাৎ, যে সম্পদ জীবকে ঈশ্বর হইতে দূরে সরায়, তাহার নিন্দা আছে এবং যে বিপদ তাঁহার নিকটবর্তিতা লাভে সহায়ক হয়, তাহার গৌরব আছে।

    শাস্ত্রে ত্যাগের মহিমা কীর্তিত আছে। প্রবল ভোগবাদ বাধা সৃষ্টি করে, ইহাতে সংশয় নাই। শাস্ত্রে ত্যাগের অর্থ- প্রধানতঃ সংসার ত্যাগ নহে। গীতায় সংসার ত্যাগের কোন গৌরবের কথা নাই বলিলেও চলে। গীতায় ত্যাগের অর্থ- ফলকামনা ত্যাগ ও অহঙ্কার ত্যাগ। গীতায় বৈরাগ্যের অর্থ পরমবস্তুর প্রতি অনুরাগ। সেই অনুরাগের ফলে ক্ষুদ্র বস্তুর প্রতি আকর্ষণ যদি তুচ্ছ হইয়া যায়, তবে তাহাই প্রকৃত বৈরাগ্য। পতঞ্জলি বৈরাগ্যের লক্ষণ বলিয়াছেন- ভোগস্পৃহাবর্জন। ভোগবর্জন বলেন নাই। বাহিরে ভোগ ত্যাগ করিয়া অন্তরে স্পৃহা থাকিলে, গীতা তাহাকে মিথ্যাচার কহিয়াছেন।

    গীতা সর্ব্বত্যাগীকেও যজ্ঞ ও তপস্যা ত্যাগ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। যজ্ঞবোধহীন কর্ম্মই বন্ধন আনে। যজ্ঞকর্ম্মই মুক্তির সোপান। “যজ্ঞার্থাৎ কর্ম্মনোহন্যত্র লোকোহয়ং কর্ম্মবন্ধনঃ”। যে যে কর্ম্মে নিযুক্ত আছেন, তাহাই যদি সুষ্ঠুভাবে কৃ্ত হয়, তবে সিদ্ধিলাভ হয়। সুষ্ঠুভাবে করা অর্থই হইল, তপস্যারত হইয়া যজ্ঞ-বুদ্ধিতে কর্ম্মানুষ্ঠান। অহঙ্কার ও কামনা ত্যাগ করিয়া জীবসেবার্থ কর্ম্ম করাই যজ্ঞ। ব্রহ্মচর্য্য শারীর তপ, সত্য বাঙ্ময়তপ ও মনের শুদ্ধতা মানস তপ। সুতরাং গীতাদি শাস্ত্রে ত্যাগের মহিমা-কীর্তন ধনীদের স্বার্থ বজায় রাখার অপকৌশল নহে।

    ক্ষত্রিয় আমার আপনার তৈয়ারী কিছু নহে – ক্ষত্রিয় ঈশ্বর বা প্রকৃতির সৃষ্টি। আপনার রক্ত কণিকার মধ্যেও বাস করে কতকগুলি ক্ষত্রিয়। আপনার দেহের বিষ্ফোটকে অস্ত্রোপচার করিয়া চিকিৎসক যখন কতকগুলি পূঁজ ফেলিয়া দেন, তখন আপনি হয়ত ভাবিবার সময় পান না যে উহারা আপনার রক্তপ্রবাহনিবাসী ক্ষত্রিয় শহীদগণের মৃতদেহগুলি মাত্র। উহারা প্রাণ দিয়াছে বলিয়া আপনার প্রাণ বাঁচিয়াছে।

    ৮। ভোগবাদী বলেন, কোন দার্শনিক মতবাদই চরম সত্য নহে। সকলই আপেক্ষিক সত্য, দেশ ও কালের অধীন। মানুষের আবেষ্টনী তাহার চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত করে। সুতরাং সকল দার্শনিক সিদ্ধান্তই কোনও কালে কোনও আবেষ্টনির মধ্যে সত্য। সার্ব্বজনীনতা, সার্ব্বকালীনতা কোন সত্যের থাকিতে পারে না।

    এই যুক্তি যদি সত্য হয়, ভোগবাদীর দর্শনও চরম সত্য নহে। তাহা কেবল তাহার বিশিষ্ট দেশ-কাল-পাত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যাহা সার্ব্বজনীন নহে, তাহা অন্যের উপর চাপাইবার চেষ্টাও ভোগবাদীর পক্ষে অকর্তব্য। যে ত্রুটি অন্যে দেখান হয়, তাহা যে নিজেরও আছে, ইহা ভুলিয়া যাওয়া উচিত হয় না।

    বিজ্ঞান চরম সত্যের দাবি রাখে না, সত্যই। তাহার সকল সত্যই পরীক্ষাধীন (hypothetical)। কোন সত্যই পরম (absolute) নহে। এইরূপ সত্য লইয়া বিজ্ঞান পথ চলিতে পারে বটে, কিন্তু ধর্ম্ম পারে না। আলোর মধ্যে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আলোকণা (light particle) নাও থাকিতে পারে। হয়তো সকলই তরঙ্গতুল্য (wave)। এই বিষয় লইয়া দিনের পর দিন গবেষণা চলিতে পারে। কিন্তু ধর্ম্মের রাজ্যের মধ্যে শাশ্বত সত্য অপরিহার্য্য। পরমাণু সত্য না হইলেও পদার্থ বিদ্যা চলিতে পারে। কিন্তু ঈশ্বর না থাকিলে পূজা প্রার্থনা চলিতে পারে না। Help me O God, if there be any- ভগবান্ যদি থাকো, তবে রক্ষা কর- এইরূপ প্রার্থনা ব্যর্থ। প্রার্থনা যাঁর কাছে, তিনি নিশ্চয়ই আছেন ও শুনিতেছেন, এই অনুভব ছাড়া প্রার্থনা চলিতে পারে না। ঈশ্বর যে আছেনই, ইহা সাধক জানেন আধ্যাত্মিক অপরোক্ষ অনুভূতি দ্বারা। এই অনুভূতি বিজ্ঞানের এলাকার বহু দূরে। সুতরাং এ বিষয়ে নীরবতা অবলম্বনই ভোগবাদীর কর্ত্তব্য। ‘য পশ্যতি স পশ্যতি’- যে ঈশ্বরকে জানিয়াছে, সে ঠিকই জানে, সমগ্র জীবন দিয়া জানে যে, তিনি আছেনই। অন্যের গলাবাজিতে তাহা টলিতে পারে না।

    ৯। আমাদের জীবন-নীতি (ethics) সর্ব্বমানবীয় নহে- ভোগবাদীর এই কথাও ঠিক নহে। রীতি ও নীতি দুইটি স্বতন্ত্র ব্যাপার। রীতি দেশ-কাল-পাত্র অনুগত থাকিয়া সর্ব্বদা পরিবর্তিত হইতেছে। কিন্তু নীতে তাহা নহে। মহামূল্যবান জীবনের ধ্রুব নীতিগুলির মূল্য সর্ব্বদেশে, সর্ব্বকালে সমান। সত্যরক্ষা, কল্যাণ-কামনা, আনন্দানুসন্ধান, অচৌর্য্য, অহিংসা, পবিত্রতা প্রভৃতি জীবনের মূলনীতিগুলি চিরকালই মানব জীবনের ভিত্তিস্বরূপ। এই নীতিগুলি বিশ্বজনীন (cosmic), বিশ্বের মূল অখণ্ড কনস্টিটিউসনের মধ্যে ইহাদের বিদ্যমানতা। বিশ্বের অন্যান্য যাবতীয় খণ্ডনীতি ঐ নীতির অধীন থাকিলে, তবে কল্যাণ আসে। ইহার বিরুদ্ধে চলিলে, চরম বিনষ্টি ঘটে।

    ঐ সকল পরম নীতিগুলি যে স্থানে পূর্ণতা প্রাপ্ত হইয়াছে, তাহাই ঈশ্বরীয় ভুমি। যিনি সত্যস্বরূপ, কল্যাণ-স্বরূপ ও আনন্দঘন, যেখানে হিংসাদি অপগুণ নাই- কেবল প্রেম, ঔদার্য্য ও বিশ্বজনীনতা যাঁহাতে মূর্ত- তিনিই ঈশ্বর। শাশ্বতী নীতিগুলিকে স্বীকার করিলেই তাহার সুদৃঢ় ভিত্তিভূমি, সকল সৌন্দর্য্য-মাধুর্য্যের আধার-ভূমিকে স্বীকার করিতে হয়। এইরূপ একজন ঈশ্বর থাকাই সম্ভব, এই পর্য্যন্ত বলিবে বুদ্ধি-প্রধান বিজ্ঞান। তিনি যে আছেনই, তাঁহাকে দর্শন করিয়াছি- একথা বলিবে সাধক ঋষি। বিজ্ঞানী ঋষি আইনস্টাইন বলিয়াছেন- ঈশ্বর নিশ্চয় আছেন।

    ১০। জড়বাদী বলেন, স্বাধীনতা বলিয়া কিছু নাই, সবই পূর্ব্বনিয়ন্ত্রিত। এইরূপ কথা বিজ্ঞানীর নিকট হইতেও পূর্ব্বে শোনা যাইত। এখন আর বলে না। উন্নত-বিজ্ঞান পরমাণুর মধ্যস্থিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইলেকট্রনের মধ্যে চেতনার অবস্থিতি অনুমান করিতেছে। ইলেকট্রনের গতি ও স্থিতি কিছুতেই নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা যায় না এবং একটা স্বাধীন প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়।

    স্বাধীন ইচ্ছা আছে কিনা, ইহা লইয়া পাশ্চাত্ত্য জগতে গবেষণার অন্ত নাই। স্বাধীন ইচ্ছা আছে, এই পক্ষেও বহু যুক্তি আছে। ইহার বিপক্ষেও বহু যুক্তির অবতারণা হইয়াছে। আর্য্য ঋষি এই প্রশ্ন অন্য দৃষ্টিতে দেখিয়াছেন। স্বাধীন ইচ্ছা আছে কি নাই, প্রশ্ন ইহা নহে। প্রশ্ন হইল, উহা কে কতটুকু অর্জন করিয়াছে। যে ব্যক্তি জড় বস্তুর সঙ্গে নিজেকে এক মনে করিয়াছে, তাহার স্বাধীনতা ঠিকই নাই। আর যিনি পূর্ণ চৈতন্যের সহিত একত্বের অনুভব করিয়াছেন বা তাঁহার সহিত ঘনিষ্টতা করিয়াছেন, তাঁহার স্বাধীনতাই নিরঙ্কুশ, অখণ্ড ও পরিপূর্ণ। এই দুই প্রান্তের মধ্যে যে যতখানি ব্রহ্মের নিকটবর্তী হইয়াছে, যে যতটুকু উন্নত হইয়াছে, তার ততটুকু স্বাধীনতা। স্বাধীন ইচ্ছার অর্থ হইল মুক্তি। মুক্তির জন্যই ত জীবনের সাধনা। দেহের বন্ধন, সংস্কারের বন্ধন, মায়া-মোহ ও বাসনা কামনাদির বন্ধন প্রভৃতি শত সহস্র বন্ধনে আবদ্ধ সংসারী জীব। বন্ধন হইল দুঃখের জনক। মুক্তিই আনন্দ। সংসারে কেহ একান্তভাবে বদ্ধ, কেহ পূর্ণ মুক্ত। বদ্ধাবস্থা হইতে মুক্তাবস্থায় যাইবার জন্যই সকল সাধনা। সেই সাধনায় যে যতখানি সিদ্ধ, সে ততখানি মুক্ত। পূর্ণ স্বাধীন, স্বরাট, স্বেচ্ছাময় ব্রহ্মবস্তুর যে যত নিকট, সে তত মুক্ত। বদ্ধভাব হইতে মুক্তভাবে পৌঁছান, ইহাই প্রকৃ্ত জীবন যাত্রা। অর্জ্জুন ছিলেন বিষাদবদ্ধ- গীতা শ্রবণে তিনি হইলেন মুক্ত। তাই বিষাদ যোগ হইতে মোক্ষ যোগ পর্য্যন্ত গীতার যাত্রা। ইহা আমাদেরই জীবন যাত্রার কাহিনী।

    বিষাদিত, মোহগ্রস্ত, আত্মসংবিৎ-স্মৃতিভ্রষ্ট, অশান্ত, সন্দেহদোলায় দোদুল্যমান জীব গীতার উপদেশ শুনিয়া, জীবন দিয়া গ্রহণ করিয়া, বলিতে পারে- মোহ গিয়াছে। স্মৃতি ফিরিয়াছে, স্থিরতা ও শান্তি পাইয়াছি। গতসন্দেহ হইয়াছি- এখন চলিব হে পূর্ণ স্বাধীন পুরুষোত্তম! তোমারই সঙ্কেতে, তোমারই ছায়ার মত। বদ্ধ জীবই সদা দুঃখগ্রস্ত, মুক্ত জীবই ব্রহ্মভূত। কি লৌকিক কি আধ্যাত্মিক, জগতের সকল চেষ্টার মূলে দুঃখী জীবের আত্যন্তিক দুঃখ-নিবৃত্তির প্রেরণা। কেবল তাহাই ব্রহ্মভূত অবস্থা, পরাশান্তির ও পরমানন্দের সোপান। দুঃখ নিবৃত্তি কেবল নয়, আনন্দ লাভই জীবের মৌলিক বাসনা। এই প্রেরণাই ধর্ম্মের জনক। এই প্রেরণাই সর্ব্বকার্য্যের জনক। সুতরাং প্রকৃ্ত অর্থপূর্ণ জীবনের সকল কার্য্যই ধর্ম্ম-মূলক। জীবন থাকিবে ধর্ম্ম থাকিবে না, একথা বলা যা, আর রামায়ণ থাকিবে রাম থাকিবে না, একথা বলাও তা। ধর্ম্ম ও শাশ্বত নীতির বোধ যতই মানুষের জাগিবে, ততই প্রকৃষ্ট কল্যাণ নিকটবর্তী হইবে। ধর্ম্ম-স্বরূপ যোগেশ্বরের সঙ্গে যুক্ত থাকিলেই, শাশ্বতী নীতিজ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত হইবে ইহাই গীতার চরম উপদেশ।

    এর পর দেখুনঃ শ্রীমদ্ভগবদগীতার সারমর্ম তথা গীতার সার-কথা কি?

    প্রাসঙ্গিক বিষয়ঃ

    সাইট-টি আপনার ভাল নাও লাগতে পারে, তবুও লাইক দিয়ে উৎসাহিত করুনঃ

    শেয়ার করে প্রচারে অবদান রাখতে পারেন

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.