পূর্ববর্তী বিবরণের পর-
________________________________________
একদলীয় আদর্শ না, একক আদর্শ : সংবিধান
হৃদয়- হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ বটে! সকলকে যেহেতু একটাই আইন বা বিধান অনুসরণ করতে হবে, তাহলে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য এমন একটাই আদর্শ সকলেই মনে মনে লালন করলে, সে অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তুললেই তো ভালো। এক্ষেত্রে প্রত্যেকের কি কি অধিকার, দায়িত্ব-কর্তব্য আছে তা যেমন ভালোভাবে জানা যাবে, অনুরূপভাবে তার দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা হচ্ছে কি-না সেটাও সে ভালোভাবে বুঝতে পারবে। তবে বিষয়টা যত সহজে বললে, বাস্তবে তা কার্যকর হওয়া নিশ্চয়ই ততটাই কঠিন হয়েছিল? আমাদের দেশে এমন আশ্চর্য কথা কেউ কখনও হয়তো স্বপ্নেও ভাবে না। তুমি বরং ভিন্ন কোন উপদেশ দাও যাতে আমাদের দেশের মানুষের কাজে আসে।
স্বপ্নিল- ধীরে বন্ধু ধীরে- যদি প্রথমেই অধৈর্য্য বা বিরক্তির সাথে ব্যাপারটা শোন তাহলে কিছুই বুঝতে পারবে না। যদি ইতিবাচক মানসিকতা না থাকে- তবে, মন ব্যতিক্রম কোন কিছুকে গ্রহণ করতে চাইবে না। আগে ধৈর্য্য ধরে শোন, তারপর বিচার-বিবেচনা করে যা খুশী মন্তব্য করো। আর তাছাড়া শুনলেই যে তোমাকে তা গ্রহণ করতে হবে বা মানতে হবে তা তো বলিনি।
হৃদয়- আচ্ছা ঠিক আছে বলো, দেখি আরও কতো আশ্চর্য্য কথা শোনাবে!
স্বপ্নিল- হ্যাঁ আগে পুরো ব্যবস্থাটা শোন। আমাদের দেশে নির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক দলই নেই। শুধুমাত্র এই সিদ্ধান্ত থেকে আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ভোগ করে থাকি, শুনবে সে কথা?
হৃদয়- হ্যাঁ অবশ্যই- শোনাও দেখি।
স্বপ্নিল- তাহলে কয়েকটা মাত্র উদাহরণ শোন-
________________________________________
প্রথমতঃ সবার প্রথমে যে কাজটা শুরু হয় তা হলো জনসেবার প্রতিযোগিতা- যার সুফল একেবারে হতদরিদ্র থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সবাই পেয়ে থাকে।
হৃদয়-একটু সহজ করে বলো।
স্বপ্নিল- হ্যাঁ শোন- যারা দেশ ও দশের সেবা করার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছা পোষণ করেন, তাঁরা তাঁদের সুনাম ও পরিচিতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজ করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকেন।
কেউ কেউ তাঁদের নামে বা তাঁদের পিতা-মাতার নামে বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে সেবা প্রদান করে থাকেন; যেখান থেকে সর্বসাধারণ প্রতিনিয়ত উপকার পাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলা দরকার, তা হলো– আমাদের দেশে মহাবিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন শিক্ষার্থীও অনুরূপ সুনাম ও পরিচিতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে তাঁদের নিজস্ব আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের গুণাবলী প্রদর্শনের জন্য সর্বদা সুযোগ খুঁজতে থাকে।
তাঁরা সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরণের সাহায্য–সহযোগিতা করার মাধ্যমে তাঁদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য, অর্থাৎ তাঁদের নেতা হওয়ার জন্য সর্বদা তৎপর থাকে। ফলে তাঁদের সহযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও প্রতিনিয়ত উপকৃত হয়।
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো – এসমস্ত ছাত্র–নেতারাও একটা সময় পরে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জননেতা নির্বাচিত হয়ে থাকে।
________________________________________
দ্বিতীয়তঃ কেন্দ্রীয়ভাবে কোন নির্দেশনা দেওয়ার অভাবে সারাদেশব্যাপী একযোগে হরতাল, অবরোধ, অচলাবস্থা থেকে দেশবাসী রক্ষা পাচ্ছে; সেই সাথে কোটি কোটি টাকার সম্পদহানি থেকেও দেশ রক্ষা পাচ্ছে।
পাশাপাশি নির্বিঘ্নে দেশের কলকারখানা, আমদানি–রপ্তানি, বিভিন্ন আর্থিক বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান চলছে; বিধায় বিদেশী বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের সুনাম উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ফলশ্রুতিতে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিধারা অব্যাহত রয়েছে।
________________________________________
তৃতীয়তঃ নির্দিষ্ট কোন দলের হয়ে মনোনয়ন পাওয়ার প্রয়োজন নেই বলে নির্বাচনের সময় অন্ততঃ মনোনয়ন পেতে কষ্ট হয় না। তাছাড়া এক্ষেত্রে এমনও শোনা যেত যে, কখনও কখনও দলীয় প্রধান নাকি তার আসে পাশের মানুষদের কথা অনুযায়ী যোগ্য, সর্বাধিক জনপ্রিয় লোকের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য বা বিতর্কিত মানুষদেরই মনোনয়ন দিয়ে- দলের মধ্যে তথা সাধারণ মানুষদের মধ্যে একটা বিভাজন সৃষ্টি করতে সহায়তা করতেন। ফলে সাধারণ মানুষ তাঁদের দলীয় সহানুভূতির টানে নিজের পছন্দ-অপছন্দ, আদর্শ, আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারতেন না; এধরনের পরিস্থিতিতে আমাদেরকে এখন আর পড়তে হয় না। ফলে আমরা আমাদের পছন্দমত যোগ্য ব্যক্তিদেরকে ভোটাধিকার ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারি।
এক্ষেত্রে অবশ্য আগের মতো দলীয় ছত্রছায়ায় নির্বাচনে জেতার সুযোগ নেই, এখন ব্যক্তিগত সুনাম ও পরিচিতি এবং যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই জনগণের প্রতিনিধি হতে হয়, পাশাপাশি উক্ত সুনাম টিকিয়ে রাখাটাও জরুরী হয়ে পড়ে, যদি পরের বছর আবারও জনপ্রতিনিধি হওয়ার ইচ্ছা থাকে।
________________________________________
চতুর্থতঃ অনেক সময় দেখা যেত, দলীয় প্রধানকে এককভাবে সমগ্র দেশের নেতা–কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ত। কখনওবা দলের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার জন্য দলের অসৎ বা বিতর্কিত নেতা–কর্মীদের অন্যায়–অপকর্মকে প্রশ্রয় দিতে হত।
আবার এমনও শোনা যেত, অনেক খারাপ ব্যক্তি বা ছোট ছোট গ্রুপ আছে যারা সারা দেশে চাঁদাবাজি, চুরি–ছিনতাই ইত্যাদি অপকর্ম করে বেড়ায়, কিন্তু নাম ব্যবহার করে যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের। এরা আসলে কোন দলেরই না; কিন্তু দলীয় প্রধানকেই সেই সমস্ত ব্যক্তিদের অন্যায় কাজের দায়ভার মাথায় নিতে হতো।
কিন্তু এখন, যখন আলাদা রাজনৈতিক দল নেই, তখন আর সেই ধরনের কোন প্রকার অন্যায় কাজকে মৌন সমর্থন দেওয়ার প্রয়োজনই নেই। যে কারণে অন্যায়কারী যে কোন অন্যায় করতেও ভয় পায়; তেমনি যেকোন অন্যায়–অপকর্ম সংঘটিত হলে, তার সুবিচার তথা শিক্ষামূলক শাস্তি সকলেই দেখতে পারে – এবং তা অতি দ্রুততার সাথে।
________________________________________
পঞ্চমতঃ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা কু–প্রভাব থেকে সমগ্র দেশ তথা দেশের সকল মানুষ মুক্ত আছে বলে–
• চাকুরিতে নিয়োগ,
• পদোন্নতি, বদলি,
• দরপত্র অনুমোদন,
• সরকারি অনুদান বা বিভিন্ন সুযোগ–সুবিধা বন্টন প্রভৃতি
অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ নিয়ম ও পদ্ধতি অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়; যার সুফল সর্বসাধারণ সমানভাবে ভোগ করে থাকে।
তাছাড়া শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ কোন প্রকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তাঁদের উপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারেন।
ষষ্ঠতঃ ভূ-রাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশ অনেকটা মুক্ত বা নিরপেক্ষ থাকতে পারে। এমনও শোনা যায় "বহির্বিশ্বের অনেক দেশ আছে যারা তাঁদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য
অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যথেষ্ট প্রভাব খাটিয়ে থাকে। কোন্ দল ক্ষমতায় থাকলে তাঁদের সুবিধা বেশি, কোন্ দলকে বা কোন্ গ্রুপকে কখন মদদ দিতে হবে? তাঁদের হয়ে কাজ করবে এমন কোন গোষ্ঠী বানানো ইত্যাদি ইত্যাদি ", এগুলো এখন আর হয় না। কারণ এখন নির্দিষ্ট কোন
রাজনৈতিক দলই নেই বা তেমন কোন গ্রুপই নেই যাদেরকে মদদ দিয়ে দেশের মধ্যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা যায়।
এমন–ই বিভিন্ন ধরনের সুযোগ–সুবিধা আমরা ভোগ করে থাকি; তুমিও একটু ভেবে দেখো- অনেক কিছুই নিজে থেকে বুঝতে পারবে।
_________________________________________
হরতাল এখনও আছে, তবে যুক্তিসঙ্গত
হৃদয়– সত্যিই তো! একটি কঠিন সিদ্ধান্তের পিছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে! এটা কি সত্যিই সম্ভব?
আচ্ছা বন্ধু, হরতাল তো জনগণের প্রতিবাদের চূড়ান্ত রূপ, তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার। এটা কি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে?
স্বপ্নিল– না, সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়নি। এখনও ধর্মঘট, হরতাল, অবরোধ প্রভৃতি হয়ে থাকে; তবে তা সমস্যা অনুযায়ী ও এলাকাভিত্তিক এবং অবশ্যই অপেক্ষাকৃত কম ভয়ঙ্কর।
কারণ কোন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে, বা কোন একটা নির্দিষ্ট এলাকার জনগণের নির্দিষ্ট কোন অধিকার আদায়ের ব্যাপারে, হয়তো সংশ্লিষ্ট এলাকার জননেতা তাঁদেরকে ধর্মঘট, হরতাল, অবরোধ ইত্যাদির জন্য উৎসাহিত করে, ঐক্যবদ্ধ করেন।
আবার ন্যায্য দাবি থাকলে, জনসমর্থন থাকলে, তা পূরণ সাপেক্ষে সে সমস্যার সমাধানও করা হয়ে থাকে অতি দ্রুততার সাথে।
কিন্তু সারা দেশব্যাপী একযোগে হরতাল–অবরোধ বা অচলাবস্থা তৈরি হয় না।
হৃদয়– বুঝলাম, খুবই কঠিন ব্যাপার – তবে অসম্ভবও নয় এবং অযৌক্তিকও নয়।
________________________________________
জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন
হৃদয়– আচ্ছা বন্ধু, তাহলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন তথা মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয় নির্ধারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে তো খুবই সমস্যা হওয়ার কথা?
স্বপ্নিল– তুমি ঠিকই বলেছ, জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করাটা একটি কঠিন কাজ। একটু ধৈর্য ধরো, একে একে সকল প্রক্রিয়াই বলছি।
তবে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রধান দায়িত্ব যাদের উপর, তাঁদের কথা তোমার আগে শোনা দরকার।
হৃদয়– আচ্ছা ঠিক আছে, তাঁদের কথাই না হয় আগে শোনাও।
স্বপ্নিল– হ্যাঁ শোন, আমাদের ওখানে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করার জন্য আছে একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ, সর্বপ্রকার প্রভাবমুক্ত এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন।
তবে এক্ষেত্রে একটা কথা বলা দরকার– উক্ত নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে ১ জন এবং মধ্য ও নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে ৬ জন, সর্বমোট ৭ জন কর্মকর্তা তথা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক অস্থায়ীভাবে জাতিসংঘ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন।
তবে এসংখ্যা এবং তাঁদের নিয়োগের সময়কাল নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এখনও আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন, হয়তো কিছুটা রদবদল হতে পারে।
হৃদয়– বলো কী! তবে এটা কি খুব জরুরী? তাছাড়া ওনারা কত দিনের জন্য দায়িত্ব পালন করে থাকেন?
স্বপ্নিল– হ্যাঁ, আমাদের বিজ্ঞজনেরা মনে করেন স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার স্বার্থে এবং সকলের নিকট গ্রহণযোগ্যতা–বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য এমনটি করা জরুরি। আর তাছাড়া এতো অস্থায়ীভাবে; অর্থাৎ চূড়ান্ত জাতীয় নির্বাচনের ৯ মাস পূর্বে তাঁরা নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং নির্বাচন–পরবর্তী ৩ মাস পরেই তাঁদের কার্যের মেয়াদ সমাপ্ত হয়।
হৃদয়- ও তাই! আমার মনে হচ্ছিলো আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের লোক এসে নাক গলাবে এটা তো ঠিক না। তবে এখন মনে হচ্ছে এর ফলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কারো মনে কোন প্রকার সন্দেহ বা সংশয় থাকবে না। আচ্ছা তো এরপর কোনটা শোনা জরুরী একটু বলবে?
________________________________________
আসনভিত্তিক নির্বাচন ও ৭ জন প্রার্থীর সীমা
স্বপ্নিল– এবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়াই বলছি।
আমাদের ওখানে সমগ্র দেশটাকে নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচনী এলাকায় ভাগ করা আছে।
পূর্বেই বলেছি, আমাদের ওখানে প্রতিটা নির্বাচনী এলাকায় চূড়ান্ত জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
হৃদয়– আচ্ছা বন্ধু, ৭ জনের অধিক প্রার্থী যদি চূড়ান্ত জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা পোষণ করে, তাহলে তোমরা এর সমাধান কীভাবে করো?
স্বপ্নিল– দেখ বন্ধু, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, বেশিরভাগ আসনে জনগণের মধ্যে আগে থেকেই একটা সাড়া পড়ে যায় যে, কে হতে যাচ্ছে বিজয়ী জনপ্রতিনিধি।
একক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় সর্বোচ্চ ৫ জনের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছাই পোষণ করেন না।
তবে যদি কোথাও ৭ জনের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক হন, সেক্ষেত্রে চূড়ান্ত নির্বাচনের ১৫ দিন পূর্বে একটি প্রাক্–নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
উক্ত প্রাক্–নির্বাচনের RMM Vote–এর মাধ্যমে শীর্ষ থেকে ৭ জন প্রার্থীকে চূড়ান্ত জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনীত করা হয়।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এরিয়ার ভোটারদেরকে নির্দিষ্ট Purpose Vote Code উল্লেখ করে, স্ব–স্ব Area Code–এ RMM Vote তথা SMS গুলো পাঠাতে বলা হয়।
সেখানে প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করেই নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত জাতীয় নির্বাচনে মনোনীত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করেন।
একাজটা সংশ্লিষ্ট মেইন সার্ভারেরই ফলাফল। তাছাড়া এটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বিধায় খুবই স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া বলতে পারো, কারণ এখানে কারও কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করার সুযোগই নেই।
ব্যাপারটা আগেও দেখেছ, আবারও দেখো।
________________________________________
প্রতীক বরাদ্দের নিয়ম
হৃদয়– বাঃ বেশ আশ্চর্যই মনে হচ্ছে! আচ্ছা বন্ধু, তুমি যে RMM Vote এর কথা বললে, সেটা তো পূর্বেই বুঝেছি। কিন্তু প্রাক্–নির্বাচনের ব্যাপারটা যদি একটু বলো, আর তাছাড়া তোমাদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতীক বরাদ্দ হয় কীভাবে? এক্ষেত্রে তো বেশ ঝামেলা বা গোলমাল হওয়ার কথা, তাই না?
স্বপ্নিল– হ্যাঁ, বলছি শোন।
প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রে যাতে কোনরূপ বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, সেজন্য খুব সুন্দর ব্যবস্থা আছে। এ–সংক্রান্ত দায়িত্ব দেওয়া আছে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রেসক্লাব সভাপতির উপর, তাঁর সহযোগিতায় এবং নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে।
• প্রথমতঃ প্রাক্–নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময়ে যে ক্রমিক নং পড়ে, সেটিই – অর্থাৎ ক্রমিক নং–ই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রতীক।
• দ্বিতীয়তঃ ব্যালট ভোট–এর জন্য প্রতিটি নির্বাচনী আসনের জন্য বেশ কিছু সুন্দর–সুন্দর প্রতীক নির্দিষ্ট করা হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা যদি সেখান থেকে আপস করে নিজেদের প্রতীক ঠিক করতে ব্যর্থ হন, সেক্ষেত্রে পরপর দুইটা লটারী হয়–
১. প্রথমটা – প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যার সমান ক্রমিক নম্বরযুক্ত টোকেন দিয়ে। এর মাধ্যমে লটারীতে অংশগ্রহণের ক্রমিক ঠিক করা হয়।
২. দ্বিতীয়টা – প্রতীকগুলোর ছবিযুক্ত টোকেন দিয়ে।
অর্থাৎ, উক্ত টোকেনগুলো নির্দিষ্ট বাক্সে রাখা হয়, এবং সেখান থেকে নম্বরক্রম অনুযায়ী প্রার্থীদেরকে একইসাথে দুইটা টোকেন উঠাতে বলা হয়।
যার মধ্য থেকে প্রত্যেকে একটি প্রতীক পছন্দ করে, অপরটি ভাজ করে আবার বাক্সে রেখে দেয়।
এভাবে নম্বরক্রম অনুযায়ী প্রত্যেক প্রার্থী তার প্রতীক পেয়ে থাকে।
মজার ব্যাপার হলো – সমগ্র প্রক্রিয়াটি একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাঝে, উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়ে থাকে।
হৃদয়– বাঃ, খুব সুন্দর ব্যবস্থা তো! আমার মনে হয়, এভাবে প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হলে কেউ অসন্তুষ্ট বা কোনরূপ মনোমালিন্য হওয়ার কথা নয়। আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।
আচ্ছা বন্ধু তোমাদের ভোট প্রদানের ক্ষেত্রেও কি বিশেষ কোন ব্যবস্থা আছে নাকি?
স্বপ্নিল- হ্যাঁ তা বলতে পারো। প্রায় অসম্ভব ব্যাপারটাতো এখানেই।
হৃদয়- সত্যিই তাই! যদি একটু খুলে বলো।
স্বপ্নিল- শোন, আমি তো আগেই বলেছি – আমরা পরিপূর্ণ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। আমরা বিজ্ঞানের সদ্ব্যবহার, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করে থাকি সর্বত্র, আর সেটি গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও। আর এরই ফলস্বরূপ আমরা একবার নয়, দুইবার নয়, অগণিত বার ভোট প্রদান করে থাকি।
যখনই কোন নতুন আইন, জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, সংবিধান সংশোধন – এরূপ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা ভোট প্রদান করে থাকি। তবে শুধুমাত্র জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুইটা পদ্ধতিতে ভোট প্রদান করে থাকি – অর্থাৎ ব্যালট ভোট এবং RMM Vote; আর অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে শুধুমাত্র RMM Vote–এর মাধ্যমে মতামত প্রদান করে থাকি।
পরপর দুটি উদাহরণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা তুলনা করা হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখবে, কোন একটা জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ২০০ জন জনপ্রতিনিধির ভোটের বিপরীতে ১০ কোটি সাধারণ জনগণের ভোটকে বিবেচনা করা হয়েছে।
প্রথম ক্ষেত্রে –
• ধরা যাক, ২০০ জন এমপি–ই “Yes Vote” দিয়েছে, কেউ “No Vote” দেয়নি
• এবং– ১০ কোটি সাধারণ জনগণ “No Vote” দিয়েছে,
• কিন্তু মাত্র ১০০০ জন সাধারণ জনগণ “Yes Vote” দিয়েছে,
এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি এসেছে ACCEPTED, কারণ এমপিদের ভোটের ওজন সমান হলেও মাত্র ১০০০ জন সাধারণ জনগণের "Yes Vote" দেওয়ায় সূত্র অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ACCEPTED হয়েছে।
আবার দ্বিতীয় ক্ষেত্রে –
• ধরা যাক, কোন এমপি “No Vote” দেয়নি,
• কিন্তু সাধারণ জনগণের কেউ “Yes Vote”ও দেয়নি –
এই অবস্থায় সিদ্ধান্তটি এসেছে REVOTE – অর্থাৎ পুনরায় ভোট নিতে হবে; কারণ জনগণের স্পষ্ট সমর্থন সেখানে দেখা যায়নি।
তুমি যদি খসড়া হিসাবটা দেখো, বুঝতে পারবে কীভাবে সংসদ সদস্যদের ভোট এবং কোটি কোটি RMM ভোটারের ভোট একত্রে বিশ্লেষণ করা হয়, এবং একটি সিদ্ধান্ত “ACCEPTED / REJECTED / REVOTE” হবে কিনা, সেটা নির্ধারণ করা হয়।
[হৃদয় মনে মনে ভাবে – সত্যিই তো! আমাদের দেশেও যদি এমনটা হতো, তাহলে যেকোন আইন পাস করতে বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমাদের মতো সাধারণ জনগণের মতামতেরও গুরুত্ব থাকতো। অর্থাৎ সব সময়ের জন্য জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকতো। ]
হৃদয়- বাঃ খুব ভাল ব্যবস্থা, এবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়টা আরও একটু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলতো।
________________________________________
চূড়ান্ত নির্বাচনে ব্যালট + RMM Vote
হৃদয়- হ্যাঁ শোন- আমি পূর্বেও বলেছি আবারও বলছি মন দিয়ে শোন- যদি কোন নির্বাচনী আসনে চূড়ান্ত জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সাত জনের অধিক আগ্রহী প্রার্থী থাকে, তবে নির্বাচন কমিশন সর্বপ্রথমে প্রাক্ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের মধ্য হতে RMM Vote এর সাহায্যে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত সাত জন প্রার্থীকে বাছাই করে থাকে। এভাবেই আমরা প্রতিটি নির্বাচনী আসনের জন্য সর্বোচ্চ সাত জন আগ্রহী প্রার্থীকে চূড়ান্ত জাতীয় নির্বাচনে একে অন্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখি। যাহোক, যথাসময়ে চূড়ান্ত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবং এর মাধ্যমে প্রতিটি আলাদা আলাদা নির্বাচনী এলাকা (Area Code:-A001, D001, D002 ইত্যাদি) থেকে এক একজন বিজয়ী জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকেন।
উদাহরণটা আরও একবার ভালো করে লক্ষ্য করো- একজন প্রার্থীকে "RMM Vote" এবং "ব্যালট ভোট" এই দুইটা পদ্ধতিতে ভোট প্রদানের মাধ্যমে আমরা অধিকতর নির্ভুলভাবে নির্বাচন করে থাকি । এবং প্রতিটি আসনে সর্বোচ্চ সাত জন প্রার্থীকে পরস্পরের মধ্যে "ব্যালট ভোট" এর ৬০% ও "RMM Vote" এর ৪০% এই ১০০% ভোট এর মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়।
তাছাড়া তুমি চাইলে এই লিংকে ক্লিক করে যেকোন সময় যেকোন যায়গা থেকে দেখে নিতে পারো বা নিজের মতো করে পরিবর্তন করে বিষয়টি যাচাই করতে পারো । এখানে বিজয়ী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট কিভাবে হিসাব করা হয়েছে সেটিও একটু ভালো করে দেখ। পাশাপাশি অন্যান্য প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট, সর্বোনিম্ন ভোট, মোট ভোট ইত্যাদি তথ্য ও কিন্তু নির্বাচন কমিশনের লাইভ প্রজেক্টরে প্রদর্শীত হচ্ছে ।
________________________________________
ভোট এবং ভোটারের সুরক্ষা
এক্ষেত্রে একটা কথা বলা জরুরী আর তা হলো যেসকল নির্বাচনী ভোটকেন্দ্রগুলো আবেদনের প্রেক্ষিতে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় – সেইসব কেন্দ্রে ভোট প্রদানসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আধুনিক সিকিউরিটি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়।
এই ক্যামেরাগুলো এমন যে,
• মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে
• প্রধান নির্বাচন কমিশনের দপ্তর থেকে
সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করা যায়।
এবং এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচনী চিত্র সরাসরি দেখা যায় –
• নির্বাচন কমিশন,
• তদারকি–দল,
• পর্যবেক্ষক,
এমনকি সাধারণ মানুষ টিভি বা নির্দিষ্ট মাধ্যমে লাইভ দেখতে পারে।
এতে কারচুপি বা অনিয়মের সুযোগ যেমন কমে যায়, তেমনি ভোটারদের ভরসা অনেক গুণে বেড়ে যায়।
এছাড়া আর একটা কথা তোমায় আমি বলে রাখি, এটা সকল জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রযোজ্য; আর তা হলো- সকল নির্বাচনী কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার এবং সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে তাঁর নিজ নিজ Facebook A/c Live রাখতে হয়- ভোট গ্রহণ শুরু থেকে কমপক্ষে ৩০ মিনিট, মাঝে ৩০ মিনিট এবং ভোট গ্রহণ শেষের থেকে ভোট গণনা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত। উদ্দেশ্যটা খুবই পরিষ্কার, যেন কখনও কারো মনে নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটের ফল নিয়ে কোন সন্দেহ সৃষ্টি না হয়। কারণ লাইভ থাকার দরুন এই নির্দিষ্ট সময়ের ভিডিও কোন প্রকার এডিটিং ছাড়াই সার্ভারে আপলোড হয়ে যায়, ফলে যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো বা তদন্ত করার জন্যও এই ভিডিও রেকর্ডিং প্রমাণ হিসাবে কাজ করে- ফলে সবাই খুব সচেতন ভাবে সবার দায়িত্ব পালন করতে সচেষ্ট থাকে।
হৃদয়- বাঃ, সত্যিই দারুণ ব্যাপার। ভোট মানেই শুধু টেনশন, সংঘাত, অনিয়ম – এমন ধারণা যদি বদলে গিয়ে “দায়িত্বশীল উৎসব”–এ পরিণত হয়, তাহলে তো মানুষ নিজেরাই গণতন্ত্রকে রক্ষা করবে।
স্বপ্নিল– হ্যাঁ বন্ধু, আমরা সে চেষ্টাই করছি।
হৃদয়- কিন্তু একটা কথা বলতো- তোমাদের দেশে কোন রাজনৈতিক দলই নেই তাহলে সরকার গঠন করে কারা? তাছাড়া প্রধান মন্ত্রী, মন্ত্রী নির্বাচনের জন্য তোমরা কী করো? নিশ্চয়ই খুব জটিল কোন ব্যবস্থা হবে তাইনা ?



Comments