ধর্ম অর্থ কী , সনাতন ধর্ম বলতে কী বোঝায় ?
ধর্ম অর্থ কী?
“ধর্ম” শব্দটি সংস্কৃত “ধৃ” (ধারণ করা / ধরে রাখা) ধাতু থেকে এসেছে।
এর মূল অর্থ হলো:
যা মানুষ, সমাজ বা বিশ্বকে সঠিকভাবে ধারণ ও পরিচালনা করে।
ধর্ম শুধু “উপাসনা” বা “রিলিজিয়ন” নয়।
সহজ উদাহরণে ধর্ম
যেমন:
বস্তু | ধর্ম |
| আগুন | জ্বালানো |
| জল | প্রবাহিত হওয়া |
| সূর্য | আলো দেওয়া |
| বৃক্ষ | ফল-ছায়া দেওয়া |
অর্থাৎ:
কোনো কিছুর স্বাভাবিক গুণ বা কর্তব্যই তার ধর্ম।
ঠিক তেমনি:
| মানুষের ধর্ম হলো | মানবতা, সত্য, করুণা, ন্যায় এবং সেবা। (মূলতঃ ঈশ্বরের সেবা বা ঈশ্বর উপাসনাই মুখ্য।) |
সেজন্যই যখনই মানুষ তার নিজের প্রকৃত মানবিক গুণ হারিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করে, তখন বলা হয়:
“মানুষ ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মানুষের মাঝে অধর্ম বৃদ্ধি পাচ্ছে। ” এভাবেই যখন অধিকাংশ মানুষের মাঝে অত্যাধিক অধর্ম বৃদ্ধি পায় তখনই ভগবান যুগে যুগে অবতীর্ণ হন। পুনরায় ধর্ম সংস্থাপনের জন্য ।(গীতা-৪র্থ)
হিন্দু দর্শনে ধর্ম
হিন্দু দর্শনে ধর্মের অর্থ অনেক গভীর।
এখানে ধর্ম মানে:
• নিজের কর্তব্য পালন,
• নৈতিক জীবন,
• সত্যের পথে থাকা,
• অন্যায় না করা,
• জীবের কল্যাণ করা।
ভগবদ্গীতায় ধর্মকে জীবনের কর্তব্য ও ন্যায়ের পথ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গীতায় ধর্ম
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধ করতে বললেন।
কেন?
কারণ সেখানে যুদ্ধ মানে হিংসা নয়; বরং:
অন্যায়ের বিরুদ্ধে কর্তব্য পালন।
গীতায় ধর্ম মানে:
* নিজের কর্তব্য
* ন্যায়ের পথ
* সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো
এজন্য শ্রীকৃষ্ণ বললেন:
“স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ”
অর্থাৎ
নিজের ধর্ম বা কর্তব্য পালনের জন্য যদি মৃত্যুও হয় তবে সেটাই শ্রেয়।
______________________________
মহাভারতে ধর্ম
মহাভারতে বলা হয়েছে:
“ধারণাৎ ধর্ম ইত্যাহুঃ”
অর্থ:
যা ধারণ করে রাখে, তাই ধর্ম।
অর্থাৎ ধর্ম সেই শক্তি—
যা সমাজকে ভেঙে পড়তে দেয় না।
______________________________
এবার আসা যাক “সনাতন” শব্দের অর্থ জানতে-
“সনাতন” শব্দের অর্থ:
• শাশ্বত
• নিত্য
• চিরস্থায়ী
• চিরন্তন,
• অনাদি,
• অনন্ত,
• যার শুরু বা শেষ নেই।
______________________________
সনাতন ধর্ম মানে কী?
“সনাতন ধর্ম” মানে:
চিরন্তন সত্যের পথ।
অথবা:
এমন জীবনদর্শন যা সব যুগে প্রযোজ্য।
কেন এটিকে সনাতন বলা হয়?
কারণ এর মূল সত্যগুলোকে চিরন্তন মনে করা হয়।
যেমন:
* সত্য গুরুত্বপূর্ণ
* কর্মের ফল আছে
* অন্যায়ের ফল ভোগ করতে হয়
* আত্মা অমর
* প্রকৃতি ও জীবন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত
এই ধারণাগুলোকে কালজয়ী বা সনাতন বলা হয়েছে।
অর্থাৎ = যা অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে তা-ই সনাতন । এই ধর্মের দর্শনও যেহেতু স্থান, কাল, পাত্র, উচু, নিচু ভেদাভেদ রহিত এবং সকল মানুষ তথা সকল জীবের জন্য- তাই এটি সার্বজনীন।
সনাতন ধর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
১. কোনো একক প্রতিষ্ঠাতা বা প্রবর্তক নেই
এটি হাজার বছরের চিন্তা, সাধনা ও দর্শনের ধারাবাহিকতা।
২. প্রশ্ন করার স্বাধীনতা আছে
উপনিষদে গুরু-শিষ্য প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করেন।
অন্ধ বিশ্বাস নয়—
অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ।
৩. ঈশ্বরকে নানা ভাবে দেখা যায়
সনাতন ধর্মে:
* কেউ কৃষ্ণভক্ত,
* কেউ শিবভক্ত,
* কেউ শক্তির উপাসক,
* কেউ নিরাকার ব্রহ্ম মানেন,
* কেউ ধ্যান ও যোগের পথ অনুসরণ করেন।
তবুও সব পথকে সত্যের অনুসন্ধান হিসেবে দেখা হয়।
“একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি”
ঋগ্বেদের বিখ্যাত বাক্য:
“একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি”
অর্থ:
সত্য এক, জ্ঞানীরা তাকে বিভিন্ন নামে বলেন।
এটি সনাতন ধর্মের অন্যতম মূল দর্শন।
সনাতন ধর্ম কি কেবল মূর্তিপূজা?
না।
এখানে আছে:
* যোগ
* ধ্যান
* বেদান্ত
* সাংখ্য
* তন্ত্র
* ভক্তি
* কর্মযোগ
* জ্ঞানযোগ
*** মূর্তি হলো অনেকের জন্য ধ্যান ও ভক্তির একটি মাধ্যম।
সনাতন ধর্মের মূল লক্ষ্য
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য:
* আত্মজ্ঞান ও মোক্ষ তথা মুক্তি।
অর্থাৎ:
* নিজের প্রকৃত সত্তাকে জানা, (আমি কে ? কি আমার পরিচয় ? )
* দুঃখ ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হওয়া।
* ভগবানের ধামে ফিরে গিয়ে তার নিত্য সেবার সঙ্গী হওয়া।
খুব সহজভাবে সংক্ষেপে
ধর্ম =
যা জীবন, সমাজ ও মহাবিশ্বকে সঠিকভাবে ধারণ করে রাখে।
সনাতন ধর্ম =
চিরন্তন সত্য, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম ও জীবনদর্শন।
এটি শুধু “একটি ধর্ম” নয়; বরং:
* দর্শন,
* আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান,
* নৈতিক জীবনব্যবস্থা,
* এবং সত্যের অনুসন্ধানের পথ।
এরপর দেখনু-
মূলত হিন্দু কে ? কেন সনাতনীদের হিন্দু বলা হয় ?
Comments