শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ১ম স্কন্ধ, অধ্যায়-১, ( ঋষিদের প্রশ্ন )

    শ্লোক: ১
    ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়
    জন্মাদ্যস্য যতোহন্বয়াদিতরতশ্চার্থেষ্বভিজ্ঞঃ স্বরাট্
    তেনে ব্রহ্ম হৃদা য আদিকবয়ে মুহ্যন্তি যৎসূরয়ঃ ।
    তেজোবারিমৃদাং যথা বিনিময়ো যত্র ত্রিসর্গোহমৃষা
    ধাম্না স্বেন সদা নিরস্তকুহকং সত্যং পরং ধীমহি ॥১ ॥

    ওঁ - হে ভগবান ; নমঃ- আমি আমার প্রণতি নিবেদন করি ; ভগবতে- পরমেশ্বর ভগবানকে; বাসুদেবায় ( বসুদেবের পুত্র ) বাসুদেবকে অথবা আদি পুরুষ শ্রীকৃষ্ণকে ; জন্ম-আদি — সৃষ্টি , স্থিতি এবং প্রলয় ; অস্য – প্রকাশিত ব্রহ্মাণ্ড সমূহের ; যতঃ- যার থেকে ; অন্বয়াৎ — সরাসরিভাবে ; ইতরতঃ — ব্যতিরেকভাবে ; – এবং ; অর্থেযু – অর্থসমূহ : অভিজ্ঞঃ – সম্পূর্ণরূপে অবগত ; স্বরাট্ – সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন ; তেনে — প্রকাশ করেছিলেন ; ব্রহ্ম - বৈদিক জ্ঞান ; হৃদা হৃদয়ের বুদ্ধিবৃত্তি ; — যিনি ; আদিকবয়ে — ব্রহ্মাকে মুহ্যত্তি – মোহাচ্ছন্ন যৎ — যার সম্বন্ধে ; সূরয়ঃ — মহান্ ঋষিরা এবং দেবতারা ; তেজঃ — অগ্নি ; বারি - জল ; মৃদাং - মাটি ; যথা — যেভাবে ; বিনিময়ঃ – পরস্পর মিশ্রণ যত্র — যার ফলে ; ত্রিসর্গঃ — প্রকৃতির তিনটি গুণ : অমৃষা — সত্যবৎ ; ধাম্না — সমস্ত অপ্রাকৃত বৈশিষ্ট্য সহ ; স্বেন — স্বয়ং সম্পূর্ণরূপে ; সদা — সব সময় ; নিরস্ত — নিবৃত্ত কুহকম্ – কুহক ; সত্যম্ – সত্য ; পরম্ — পরম ; ধীমহি — আমি ধ্যান করি । ;
  • অনুবাদ : হে বসুদেব তনয় শ্রীকৃষ্ণ , হে সর্বব্যাপ্ত পরমেশ্বর ভগবান , আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি । আমি শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান করি , কেননা তিনি হচ্ছেন প্রকাশিত ব্রহ্মাণ্ড সমূহের সৃষ্টি , স্থিতি এবং প্রলয়ের পরম কারণ । তিনি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সব কিছু সম্বন্ধে অবগত , এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন , কেননা তার অতীত আর কোনও কারণ নেই । তিনিই আদি কবি ব্রহ্মার হৃদয়ে সর্বপ্রথম বৈদিক জ্ঞান প্রদান করেছিলেন । তার দ্বারা মহান্ ঋষিরা এবং স্বর্গের দেবতারাও মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন , ঠিক যেভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে আগুনে জল দর্শন হয় , অথবা জলে মাটি দর্শন হয় । তারই প্রভাবে জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের মাধ্যমে জড় জগৎ সাময়িকভাবে প্রকাশিত হয় , এবং তা অলীক হলেও সত্যবৎ প্রতিভাত হয় । তাই আমি সেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান করি , যিনি জড় জগতের মোহ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত তার ধামে নিত্যকাল বিরাজ করেন । আমি তার ধ্যান করি , কেননা তিনিই হচ্ছেন পরম সত্য ।
  • তাৎপর্যঃ- ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায় এই বন্দনার মাধ্যমে বসুদেব এবং দেবকীর পুত্র শ্রীকৃষ্ণকেই প্রণতি নিবেদন করা হচ্ছে । এই তত্ত্ব এই গ্রন্থে আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হবে । এখানে শ্রীল ব্যাসদেব ঘোষণা করছেন যে , শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন আদি পুরুষ— পরমেশ্বর ভগবান , এবং অন্য সব কিছুই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তাঁরই প্রকাশ । এই বিষয়ে শ্রীল জীব গোস্বামী তার কৃষ্ণসন্দর্ভ নামক গ্রন্থে আরও বিশদভাবে আলোচনা করেছেন । এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মা তাঁর রচিত ব্ৰহ্ম - সংহিতায় শ্রীকৃষ্ণ - তত্ত্ব বিশদভাবে আলোচনা করেছেন । সামবেদেও বলা হয়েছে । যে , শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন দেবকীর দিব্য পুত্র । তাই এই প্রার্থনায় , প্রথমেই প্রতিপন্ন করা হয়েছে যে , শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন আদি পুরুষ , সেই পরমেশ্বর ভগবানকে যদি কোন অপ্রাকৃত নামের দ্বারা সম্বোধন করতে হয় , তা হলে তা হচ্ছে কৃষ্ণ , অর্থাৎ সর্বাকর্ষক । ভগবদ্গীতায় বহু স্থানে তিনি নিজেকে পরমেশ্বর ভগবান বলে ঘোষণা করেছেন , এবং তা অর্জুন সত্য বলে সমর্থন করেছেন , এবং নারদ , ব্যাস প্রমুখ সমস্ত মহর্ষিরাও তা নিঃশঙ্কচিত্তে স্বীকার করেছেন । পদ্মপুরাণেও বলা হয়েছে যে , ভগবানের অনন্ত নামের মধ্যে কৃষ্ণ নামটিই হচ্ছে মুখ্য । বাসুদেব হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবানের অংশপ্রকাশ এবং বাসুদেব - সদৃশ ভগবানের অন্য সমস্ত রূপেরও উল্লেখ এই শ্লোকে করা হয়েছে । বাসুদেব নামটি বিশেষভাবে বসুদেব এবং দেবকীর দিব্য - সন্তানকেই বোঝায় । পরমহংসেরা , যারা সন্ন্যাস আশ্রমের পরম পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছেন , তারা নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান করেন ।

       বাসুদেব , অথবা শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ । সব কিছু তাঁর থেকেই প্রকাশিত হয়েছে । কিভাবে যে সব কিছু তার থেকে প্রকাশিত হয় , তা এই গ্রন্থের পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে । শ্রীমদ্ভাগবতকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অমল পুরাণ বলে বর্ণনা করেছেন , কেননা এতে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলাবিলাসের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে । শ্রীমদ্ভাগবতের ইতিহাসও অত্যন্ত মহিমান্বিত । মহামুনি বেদব্যাস যখন পরিপক্করূপে দিব্য জ্ঞান লাভ করেছিলেন , তখন । তিনি এই গ্রন্থটি সংকলন করেন । তিনি তাঁর গুরুদেব দেবর্ষি নারদের উপদেশ অনুসারে এই গ্রন্থটি রচনা করেন । ব্যাসদেব চতুর্বেদ , বেদান্ত - সুত্র ( অথবা ব্রহ্মসূত্র ) , পুরাণ , মহাভারত ইত্যাদি সমস্ত বৈদিক শাস্ত্র সংকলন করেছিলেন । কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি । তাঁর গুরুদেব দেবর্ষি নারদ তাঁর সেই অসন্তুষ্টি দর্শন করে ডাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পরমেশ্বর ভগবান অপ্রাকৃত কার্যকলাপ বর্ণনা শ্রীকৃষ্ণের করতে । পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত কার্যকলাপ বিশেষভাবে এই গ্রন্থের দশন ঋদ্ধে বর্ণিত হয়েছে । কিন্তু সেই মূল বস্তুটিতে প্রবেশ করতে হলে ধীরে ধীরে উন্নত থেকে উন্নততর জ্ঞান লাভ করে অগ্রসর হতে হয় ।

       চিন্তাশীল মানুষের পক্ষে সৃষ্টির উৎস সম্বন্ধে জানতে চাওয়াটা স্বাভাবিক । রাত্রিবেলায় অগণিত তারকাখচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে সেখানে কি জীব রয়েছে ? এই ধরনের প্রশ্নগুলি মানুষের পক্ষে করা স্বাভাবিক , কেননা , মানুষের চেতনা পশুদের চেতনা থেকে অনেক উন্নত । এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর সরাসরিভাবে শ্রীমদ্ভাগবতের রচয়িতা দান করেছেন । তিনি বলেছেন যে , শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সমস্ত সৃষ্টির আদি উৎস । তিনি কেবল এই ব্রহ্মাণ্ডেরই স্রষ্টা নন , তিনি তার ধ্বংসকর্তাও । পরমেশ্বর ভগবানের ইচ্ছার প্রভাবে এক বিশেষ সময়ে এই জড়া প্রকৃতির প্রকাশ হয় । কিছুকালের জন্য তার স্থিতি হয় , এবং তারপর তাঁর ইচ্ছার প্রভাবে তার বিনাশ হয় । তাই , এই জগতের সমস্ত কার্যকলাপের পেছনে রয়েছে পরমেশ্বর ভগবানের ইচ্ছা । নাস্তিকেরা অবশ্য বিশ্বাস করে না যে , একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন , কিন্তু সেটি তাদের অজ্ঞতারই পরিচায়ক । যেমন , আধুনিক বৈজ্ঞানিকেরা কৃত্রিম উপগ্রহ সৃষ্টি করেছে , এবং এই উপগ্রহগুলি বৈজ্ঞানিকদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে মহাশূন্যে কিছুকালের জন্য ভাসছে । তেমনই , অসংখ্য গ্রহ - নক্ষত্র - সমন্বিত ব্রহ্মাণ্ডগুলি পরমেশ্বর ভগবানের বুদ্ধিমত্তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ।

       বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে , পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত পুরুষদের মধ্যে সর্বোত্তম । প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মা থেকে শুরু করে একটি ক্ষুদ্র পিপীলিকা পর্যন্ত সকলেই হচ্ছে এক - একটি চেতন সত্তা । অন্য সমস্ত জীবের মতো তারও ব্যক্তিত্ব রয়েছে । কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান , অথবা পরম চৈতন্য হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন , এবং তিনি অচিন্ত্য শক্তিসম্পন্ন । একটি মানুষের মস্তিষ্ক যদি একটি কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করতে পারে , তা হলে সহজেই অনুমান করা যায় যে , মানুষের থেকে উন্নত বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যিনি , তিনি তার থেকে অনেক আশ্চর্যজনক এবং অনেক উন্নত বস্তু সৃষ্টি করতে পারেন । সুস্থ মনোবৃত্তিসম্পন্ন মানুষ সহজেই এই যুক্তিটি মেনে নেবেন , কিন্তু অনেক একগুঁয়ে নাস্তিক রয়েছে , যারা তা স্বীকার করতে চায় না । শ্রীল ব্যাসদেব কিন্তু সেই পরম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন পুরুষকে পরমেশ্বররূপে স্বীকার করেছেন । তিনি সেই পরম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন পুরুষকে পরমেশ্বর বলে সম্বোধন করে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করেছেন । সেই পরমেশ্বর হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ , যা ব্যাসদেব প্রণীত ভগবদ্গীতা এবং অন্যান্য শাস্ত্র গ্রন্থে , বিশেষ করে শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে । ভগবদ্গীতায় ভগবান বলেছেন যে , তাঁর থেকে মহৎ বা পরমতত্ত্ব আর কিছু নেই । তাই শ্রীল ব্যাসদের সেই পরমতত্ত্ব শ্রীকৃষ্ণকে তৎক্ষণাৎ আরাধনা করেছেন , যাঁর অপ্রাকৃত কার্যকলাপ শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে বর্ণিত হয়েছে ।

       বিকৃত মনোভাবাপন্ন অসৎ মানুষেরা সরাসরিভাবে দশম স্কন্ধে প্রবেশ করতে চায় , বিশেষ করে দশম স্কন্ধের সেই পাঁচটি অধ্যায়ে যেখানে পরমেশ্বর ভগবানের রাসলীলার বর্ণনা করা হয়েছে । শ্রীমদ্ভাগবতের এই অংশটি হচ্ছে সব চাইতে গোপনীয় । যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃতত্ব সম্বন্ধে পূর্ণরূপে অবগত হচ্ছেন , ততক্ষণ পরমেশ্বর ভগবানের রাসলীলা নামক পরম শ্রদ্ধেয় লীলাবিলাসের তত্ত্ব এবং ব্রজগোপিকাদের সঙ্গে তার প্রেমের তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা কখনই সম্ভব নয় । এটি হচ্ছে ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাবিলাসের সর্বোচ্চ বিষয় এবং যে সমস্ত মুক্ত পুরুষ ধীরে ধীরে পরমহংস স্তরে উন্নীত হয়েছেন , তাঁরাই কেবল এই রাসলীলার অপ্রাকৃত মাধুর্য আস্বাদন করতে পারেন । শ্রীল ব্যাসদেব তাই পাঠককে ধীরে ধীরে পারমার্থিক তত্ত্বজ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করে উন্নত থেকে উন্নততর স্তরে অধিষ্ঠিত হয়ে অবশেষে ভগবানের এই লীলাবিলাসের মাধুর্য আস্বাদন করার সুযোগ দান করেছেন । তাই তিনি ' ধীমহি ' কথাটির মাধ্যমে গায়ত্রী মন্ত্রের আবাহন করেছেন । এই গায়ত্রী মন্ত্র পারমার্থিক প্রগতিসম্পন্ন মানুষদের জন্য । কেউ যখন যথাযথভাবে গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারেন , তখন তিনি ব্রহ্মভূত স্তরে অধিষ্ঠিত হন । তাই গায়ত্রী মন্ত্রে সিদ্ধিলাভ করতে হলে ব্রাহ্মণোচিত গুণাবলী অর্জন করতে হয় অথবা যথার্থভাবে সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত হতে হয় , এবং তখনই কেবল পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত নাম , রূপ , গুণ ইত্যাদির অপ্রাকৃত মহিমা হৃদয়ঙ্গম করা যায় ।

       শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত শক্তিসম্ভৃত তার স্বরূপের বর্ণনা এবং তার এই অন্তরঙ্গা শক্তি , আমাদের গোচরীভূত এই জড় জগতকে প্রকাশিত করেছেন যে বহিরঙ্গা শক্তি , তা থেকে ভিন্ন । শ্রীল ব্যাসদেব এই শ্লোকে এই দুইয়ের পার্থক্য স্পষ্টভাবে নিরূপণ করেছেন । শ্রীল ব্যাসদেব এখানে বলেছেন যে , ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তির প্রকাশ নিত্য , কিন্তু জড় জগতের প্রকাশকারী তাঁর বহিরঙ্গা শক্তি মরুভূমির বুকে মরীচিকার মতো ক্ষণস্থায়ী এবং অলীক । মরুভূমির বুকে যে মরীচিকা দেখা যায় , তাতে প্রকৃতপক্ষে জল নেই । সেখানে কেবল জলের আভাস রয়েছে । প্রকৃত জল অন্য কোথাও রয়েছে । এই জড় সৃষ্টিকে বাস্তব বলে মনে হয় , কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি হচ্ছে অপ্রাকৃত জগতের প্রতিবিম্ব মাত্র । পরম সত্য রয়েছে অপ্রাকৃত জগতে , এই জড় জগতে তার প্রকাশ নেই । এই জড় জগতে সব কিছুই হচ্ছে আপেক্ষিক সত্য । অর্থাৎ এখানে সত্য অন্য কোন কিছুর ওপর নির্ভর করে রয়েছে । এই জড় সৃষ্টির প্রকাশ হয় প্রকৃতির তিনটি গুণের সমন্বয়ের ফলে , এবং এই ক্ষণস্থায়ী সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে বদ্ধ জীবের মোহাচ্ছন্ন চিত্তে বাস্তবের কুহক সৃষ্টি করা , এবং তার ফলে ব্রহ্মা , ইন্দ্র , চন্দ্র আদি দেবতারাও পর্যন্ত মুহ্যমান হয়ে পড়েন । প্রকৃতপক্ষে , এই জড় জগতে বাস্তব বলে কিছু নেই । এই জড় জগতকে বাস্তব বলে মনে হতে পারে , কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাস্তব বস্তু হচ্ছে চিন্ময় জগৎ , যেখানে পরমেশ্বর ভগবান তার পার্ষদ সহ নিত্য বিরাজ করেন ।

       কোন জটিল কলকব্জার নির্মাতা যে মুখ্য ইঞ্জিনিয়ার , তিনি কখনও সরাসরিভাবে সেটি তৈরির ব্যাপারে অংশগ্রহণ করেন না , তবুও তিনি তার প্রতিটি অংশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানেন , কেননা সব কিছু তারই পরিচালনায় সম্পাদিত হয়েছে । তিনি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সেটি তৈরির ব্যাপারে সব কিছু জানেন । তেমনই পরমেশ্বর ভগবান , যিনি হচ্ছেন এই জড় জগতের পরম সৃষ্টিকর্তা , সে সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অবগত , যদিও এখানকার কার্যকলাপ সম্পাদিত হয় স্বর্গের দেব - দেবীদের মাধ্যমে । এই জড় জগতে ব্রহ্মা থেকে শুরু করে একটি পিপীলিকা পর্যন্ত কেউই স্বাধীন নয় । ভগবানের প্রভাব সর্বত্রই দেখতে পাওয়া যায় । সমস্ত জড় বস্তু এবং চিৎ - স্ফুলিঙ্গ তাঁর থেকেই প্রকাশিত হয় । জড় এবং চেতন , এই দুটি শক্তির সমন্বয়ের ফলেই এই জড় জগতে সব কিছুর সৃষ্টি হয়েছে , এবং দুটি শক্তিই , পরম সত্য পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ থেকে উদ্ভূত হয়েছে । কোন রসায়নবিদ রসায়নাগারে হাইড্রোজেনের সঙ্গে অক্সিজেনের মিলন ঘটিয়ে জল তৈরি করতে পারেন । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রসায়নবিদ রসায়নাগারে যে কর্ম করছে , তা পরমেশ্বর ভগবানের নির্দেশনায় সম্পাদিত হচ্ছে এবং যে সমস্ত উপাদান নিয়ে তারা কাজ করছে , সে সবই সরবরাহ করছেন পরমেশ্বর ভগবান । ভগবান প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সব কিছু সম্বন্ধেই অবগত , এবং অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় সম্বন্ধেও তিনি অভিজ্ঞ এবং তিনি হচ্ছেন সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন । ভগবানকে একটি স্বর্ণখনির সঙ্গে তুলনা করা যায় , আর এই জড় জগতের সৃষ্ট সব কিছুকে আংটি , হার ইত্যাদি স্বর্ণনির্মিত বিভিন্ন বস্তুর সঙ্গে তুলনা করা যায় । আংটি , হার ইত্যাদি বস্তুগুলিও গুণগতভাবে স্বর্ণখনির সমস্ত স্বর্ণের সঙ্গে এক , কিন্তু আয়তনগতভাবে স্বর্ণখনিগুলি স্বর্ণ থেকে ভিন্ন । তেমনই পরমতত্ত্ব ও যুগপৎ ভিন্ন এবং অভিন্ন । কোন কিছুই পরম সত্যের সমপর্যায়ভুক্ত নয় , কিন্তু তবুও কোন কিছুই পরমতত্ত্ব থেকে স্বতন্ত্র নয় ।

       এই জড় জগতের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা থেকে শুরু করে একটি নগণ্য পিপীলিকা পর্যন্ত সমস্ত বন্ধ জীবেরাই কিছু না কিছু সৃষ্টি করছে , কিন্তু তারা কেউই পরমেশ্বর ভগবানের থেকে স্বতন্ত্র নয় । জড়বাদীরা ভ্রান্তিবশত মনে করে যে , তারাই হচ্ছে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা । একে বলা হয় মায়া অথবা মোহাচ্ছন্ন অবস্থা । জ্ঞানের অভাবের ফলেই জড়বাদীরা তাদের অপূর্ণ ইন্দ্রিয়ের সংকীর্ণ গণ্ডির বাইরে আর কিছু দেখতে পায় না , এবং তাই তারা মনে করে যে , উন্নত বুদ্ধিমত্তা ব্যতীত আপনা থেকেই জড় জগতের প্রকাশ হয়েছে । এই শ্লোকে শ্রীল ব্যাসদেব তাদের সেই নির্বোধ মতবাদকে খণ্ডন করেছেনঃ “ যেহেতু সেই পূর্ণ বস্তু অথবা পরম সত্য হচ্ছেন সব কিছুর উৎস , তাই কোন কিছুই সেই পরম সত্য থেকে স্বতন্ত্র হতে পারে না । " দেহে যা কিছু ঘটে দেহী তৎক্ষণাৎ তা বুঝতে পারে । তেমনই এই সৃষ্টি হচ্ছে সেই পূর্ণ বস্তুর দেহ । তাই এই সৃষ্টিতে যা কিছু হচ্ছে সে সম্বন্ধে পূর্ণ পুরুষোত্তম প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অবগত ।

       শ্রুতি মন্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে যে , পূর্ণ বস্তু অথবা ব্রহ্ম হচ্ছে সব কিছুরই পরম উৎস । সব কিছু তার থেকেই প্রকাশিত হয় , এবং সব কিছুই তার দ্বারা প্রতিপালিত হয় , এবং অবশেষে সব কিছুই তাঁর মধ্যে প্রবিষ্ট হয় । এটিই হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম । স্মৃতি মন্ত্রেও এই তত্ত্ব প্রতিপন্ন হয়েছে । সেখানে বলা হয়েছে যে , ব্রহ্মার আয়ুষ্কালের শুরু থেকে যা কিছু প্রকাশিত হয়েছে এবং যার মধ্যে অবশেষে সব কিছু প্রবিষ্ট হবে , সে সবেরই উৎস হচ্ছেন পরম সত্য বা ব্রহ্ম । জড় বৈজ্ঞানিকেরা স্থির করেছেন যে , সূর্য হচ্ছে গ্রহমণ্ডলীর উৎস , কিন্তু সূর্যের উৎস যে কি তা বিশ্লেষণ করতে তারা অক্ষম । এখানে সব কিছুর পরম উৎস বিশ্লেষণ করা হয়েছে । বৈদিক শাস্ত্রের বর্ণনা অনুসারে , ব্রহ্মা , যাকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে , তিনি পরম স্রষ্টা নন । এই শ্লোকে বলা হয়েছে যে , পরমেশ্বর ভগবান ব্রহ্মাকে বৈদিক জ্ঞান দান করেছিলেন । এই সম্বন্ধে কেউ তর্ক করতে পারে যে , যেহেতু ব্রহ্মা হচ্ছেন প্রথম সৃষ্ট জীব , তাই অন্য কেউই তাঁকে জ্ঞান দান করতে পারে না , কেন না সে সময় আর অন্য কোনও জীব ছিল না । কিন্তু এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে গৌণ স্রষ্টা ব্রহ্মাকে পরমেশ্বর ভগবান জ্ঞান দান করেছিলেন যাতে ব্রহ্মা তাঁর সৃষ্টিকার্য সম্পাদন করতে পারেন । তাই সমস্ত সৃষ্টির পিছনে রয়েছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরম বুদ্ধিমত্তা । ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে তিনিই সৃষ্টিশক্তি , প্রকৃতিকে পরিচালনা করেন , যা হচ্ছে পূর্ণ জড় সৃষ্টির মূল আধার । তাই শ্রীল ব্যাসদেব ব্রহ্মার বন্দনা না করে পরমেশ্বর ভগবানের বন্দনা করেছেন , যিনি সৃষ্টিকার্যে ব্রহ্মাকে পরিচালিত করেন । এই শ্লোকে ' অভিজ্ঞ ' এবং ' স্বরাট ' শব্দ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এই শব্দ দুটি অন্য সমস্ত জীব থেকে পরমেশ্বর ভগবানের পার্থক্য নিরূপণ করে । অন্য কোনও জীবই ' অভিজ্ঞ ' অথবা ' স্বরাট ' নয় । অর্থাৎ কেউই সম্পূর্ণরূপে সব কিছু সম্বন্ধে জ্ঞাত নয় অথবা সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন নয় । ব্রহ্মাকেও সৃষ্টিকার্য সম্পাদন করার জন্য পরমেশ্বর ভগবানের ধ্যান করতে হয়েছিল । তা হলে আইনস্টাইনের মত বৈজ্ঞানিকদের কি কথা ! এ ধরনের বৈজ্ঞানিকদের মস্তিষ্ক অবশ্যই কোন মানুষ সৃষ্টি করেনি । কোন বৈজ্ঞানিক এই ধরনের মস্তিষ্ক তৈরি করতে পারে না , সুতরাং যে সমস্ত গণ্ডমূর্খ নাস্তিক ভগবানের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে , তাদের কি কথা ? যে সমস্ত মায়াবাদী ( নির্বিশেষবাদী ) পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে , তারাও অভিজ্ঞ অথবা স্বরাট নয় । এই ধরনের নির্বিশেষবাদীরাও ভগবানের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় জ্ঞান অর্জন করবার জন্য বহু তপস্যা করে , কিন্তু অবশেষে তারা তাদের যে সমস্ত ধনী শিষ্য তাদের টাকা সরবরাহ করে এবং মন্দির বানিয়ে দেয় তাদের হুকুমের গোলামে পরিণত হয় । রাবণ , হিরণ্যকশিপু প্রমুখ নাস্তিকদের ভগবানের কর্তৃত্ব অস্বীকার করার জন্য কঠোর তপস্যা করতে হয়েছিল । কিন্তু অবশেষে ভগবান যখন নিষ্ঠুর মৃত্যুরূপে তাদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন , তখন তারা সম্পূর্ণভাবে অসহায় হয়ে পড়েছিল । আধুনিক যুগের যে সমস্ত নাস্তিকেরা ভগবানের অস্তিত্ব অস্বীকার করে তাদেরও সেই একই অবস্থা হবে । এই ধরনের নাস্তিকদেরও ঠিক তেমনভাবেই দণ্ডভোগ করতে হবে , কেন না ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি করে । মানুষ যখনই পরমেশ্বর ভগবানের ভগবত্তা অস্বীকার করে তখন প্রকৃতি এবং প্রকৃতির নিয়ম তাদের দণ্ডদান করে । সে কথা ভগবদ্গীতায় অতি প্রসিদ্ধ শ্লোক যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানিঃ শ্লোকটিতে বর্ণনা করা হয়েছে । অর্থাৎ " যখন ধর্মের গ্লানি হয় এবং অধর্মের বিস্তার হয় , হে অর্জুন , তখন আমি অবতরণ করি । " ( ভগবদ্গীতা ৪/৭ )

       পরমেশ্বর ভগবান যে সম্যকভাবে পূর্ণ সেকথা সমস্ত শ্রুতি মন্ত্রে প্রতিপন্ন হয়েছে । শ্রুতি মন্ত্রে বর্ণিত হয়েছে যে সর্বতোভাবে পূর্ণ পরমেশ্বর ভগ জড়া প্রকৃতির প্রতি ঈক্ষণ করেন এবং তার ফলে জড় জগতের প্রাণের সঞ্চার হয়ে সৃষ্টি শুরু হয় । জীব হচ্ছে ভগবানের বিভিন্ন অংশ , এবং তিনি তাঁর দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে চেতনের স্ফুলিঙ্গ স্বরূপ জীবদের প্রকৃতির গর্ভে সঞ্চারিত করেন , এবং তার ফলে তাঁর সৃষ্টিশক্তি কার্যকরী হয়ে অপূর্ব সুন্দর সমস্ত সৃষ্টি প্রকাশ করে । একজন নাস্তিক তর্ক করতে পারে যে ভগবান একজন ঘড়ি - নির্মাতার চেয়ে অভিজ্ঞ নন , কিন্তু ভগবান তাঁর সৃষ্টি থেকে । অনেক অনেক শ্রেষ্ঠ , কেন না তিনি স্ত্রী এবং পুরুষ রূপী দুটি যন্ত্র সৃষ্টি করেছেন এবং এই যন্ত্র দুটির মাধ্যমে সেরকম অসংখ্য যন্ত্র সৃষ্টি করতে পারেন । কোন মানুষ যদি এমন কোন যন্ত্র সৃষ্টি করতে পারে যা তার সাহায্য বা অভিনিবেশ ছাড়াই সেরকম যন্ত্র তৈরি করতে পারে , তা হলে সে ভগবানের বুদ্ধিমত্তার ধারে কাছে যেতে পারে । কিন্তু সেটি সম্ভব নয় , কেন না মানুষের তৈরি কোন যন্ত্রই স্বতন্ত্রভাবে কার্যকরী হতে পারে না । তাই কেউই ভগবানের মত সৃষ্টি করতে পারে না । ভগবানের আর একটি নাম হচ্ছে অসমোর্ধ্ব , অর্থাৎ তাঁর সমান অথবা তার থেকে মহৎ আর কেউ নেই । পরম সত্য হচ্ছেন তিনিই , যার সমকক্ষ অথবা যার থেকে মহৎ কেউই হতে পারে না । সে কথা শ্রুতি মন্ত্রে বর্ণিত হয়েছে । সেখানে বলা হয়েছে যে এই জড় ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির পূর্বে কেবল ভগবানই ছিলেন , যিনি হচ্ছেন সকলেরই প্রভু । ভগবান ব্রহ্মাকে বৈদিক জ্ঞান দান করেছিলেন । সেই ভগবানের সমস্ত নির্দেশ সর্বতোভাবে পালন করা উচিত । কেউ যদি জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চায় তা হলে তাকে অবশ্যই ভগবানের শরণাগত হতে হবে । সে কথা ভগবদ্গীতাতেও প্রতিপন্ন হয়েছে ।

       যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে আত্মসমর্পণ করছে , ততক্ষণ তাকে মোহাচ্ছন্ন থাকতেই হবে । কোন বুদ্ধিমান মানুষ যখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে আত্মনিবেদন করেন এবং সম্পূর্ণভাবে অবগত হন যে শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সর্বকারণের পরম কারণ , যে কথা ভগবদ্গীতায় প্রতিপন্ন হয়েছে , তখন সেই অতি উন্নত বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষ মহাত্মায় পর্যবসিত হন । তবে এই ধরনের মহাত্মা অত্যস্ত দুর্লভ । মহাত্মারাই কেবল পরমেশ্বর ভগবানকে সমস্ত সৃষ্টির পরম কারণ রূপে জানতে পারেন । তিনিই পরম অথবা চরম সত্য , কেন না আর সমস্ত সত্যই তাঁর উপরে নির্ভর করে বিরাজ করে । তিনি সর্বজ্ঞ । তিনি কখনই মোহের দ্বারা আচ্ছন্ন হন না ।

       কোন কোন মায়াবাদী পণ্ডিত তর্ক করে যে শ্রীল ব্যাসদেব শ্রীমদ্ভাগবত রচনা করেননি , এবং তাদের কেউ কেউ বলে যে শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে বোপদের নামক জনৈক ব্যক্তির রচিত একটি আধুনিক গ্রন্থ । এই ধরনের মতামতগুলি সম্পূর্ণরূপে যুক্তিহীন । শ্রীধর স্বামী দেখিয়ে গেছেন যে বহু প্রাচীন পুরাণে শ্রীমদ্ভাগবতের উল্লেখ রয়েছে । সবচাইতে প্রাচীন পুরাণ মৎস্য পুরাণে শ্রীমদ্ভাগবতের উল্লেখ রয়েছে । এই পুরাণে উল্লেখ করা হয়েছে যে শ্রীমদ্ভাগবতের শুরু হয়েছে গায়ত্রী মন্ত্র দিয়ে এবং তাতে বহু পারমার্থিক নির্দেশের বর্ণনা রয়েছে । তাতে বৃত্রাসুরের ইতিহাস রয়েছে । পূর্ণিমার দিনে এই গ্রন্থটি কাউকে দান করলে জীবনের পরম পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়ে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া যায় । অন্যান্য পুরাণেও শ্রীমদ্ভাগবতের উল্লেখ রয়েছে , যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই গ্রন্থটি ১২ টি স্কন্ধে সমাপ্ত হয়েছে , এবং তাতে ১৮,০০০ শ্লোক রয়েছে । পদ্ম পুরাণেও গৌতম মুনি এবং মহারাজ অম্বরীষের আলোচনায় শ্রীমদ্ভাগবতের উল্লেখ রয়েছে । সেখানে গৌতম মুনি মহারাজ অম্বরীষকে উপদেশ দিয়েছেন যে তিনি যদি জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চান তা হলে তিনি যেন নিয়মিতভাবে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করেন । এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে শ্রীমদ্ভাগবতের প্রামাণিকতা সম্বন্ধে কোন সন্দেহেরই অবকাশ নেই । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অবতরণের পরেও , গত ৫০০ বছর ধরে শ্রীল জীব গোস্বামী , শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর , শ্রীপাদ বল্লভাচার্য প্রমুখ বহু বিদগ্ধ পণ্ডিত শ্রীমদ্ভাগবতের বিস্তৃত ভাষ্য রচনা করেছেন । যারা ঐকান্তিকভাবে জ্ঞানের অন্বেষী তারা যেন আরও গভীরভাবে দিব্য জ্ঞান আস্বাদন করার জন্য সেই সমস্ত ভাষ্য পাঠ করার চেষ্টা করেন ।

       শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর জড় কামোন্মত্ততা - রহিত আদি রসের আলোচনা করেছেন । সমস্ত জড় সৃষ্টিই কামভাবের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরিচালিত হচ্ছে । আধুনিক যুগে কামই হচ্ছে সমস্ত কার্যকলাপের মূল অনুপ্রেরণা । যেদিকেই তাকানো যায় দেখা যায় যৌন আবেদনের হাতছানি । সুতরাং এই যৌন আবেদন অবাস্তব নয় । তবে তার যথার্থ প্রকাশ হচ্ছে চিৎ জগতে — ভগবদ্ধামে । এই জড় জগতের যৌন জীবন হচ্ছে প্রকৃত প্রেমের বিকৃত প্রতিফলন । বাস্তব বস্তু হচ্ছে পরম সত্য , এবং তাই পরম সত্য কখনই নির্বিশেষ হতে পারে না । নির্বিশেষ বা নিরাকার কোন কিছুর পক্ষে বিশুদ্ধ প্রেম আস্বাদন করা সম্ভব হতে পারে না । মায়াবাদী দার্শনিকেরা যেহেতু পরম সত্যে নির্বিশেষত্ব আরোপ করেছে তাই তারা অতি ঘৃণ্য যৌন জীবনের প্রতি পরোক্ষভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে । যে মানুষের অপ্রাকৃত ভগবৎ - প্রেম সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই , তারা ভগবৎ - প্রেমের বিকৃত প্রতিফলন কাম বা যৌন আবেদনকেই জীবনের পরম উদ্দেশ্য বলে গ্রহণ করে । এই জড় জগতের বিকৃত যৌন জীবনের সঙ্গে অপ্রাকৃত জগতের বিশুদ্ধ প্রেমের আকাশ - পাতাল তফাৎ রয়েছে ।

       এই শ্রীমদ্ভাগবত ধীরে ধীরে নিরপেক্ষ পাঠককে পারমার্থিক জীবনের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করে । এই গ্রন্থ মানুষকে জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা প্রভাবিত কার্যকলাপ – সকাম কর্ম , জল্পনা - কল্পনা প্রসূত জ্ঞান এবং আনুষ্ঠানিক উপাসনার স্তর অতিক্রম করতে সাহায্য করে ।

    পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।