শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-১, ( ভগবদ- উপলব্ধির প্রথম স্তর )

    শ্লোক: ১০:
    তদহং তেহভিধাস্যামি মহাপৌরুষিকো ভবান্ ।
    যস্য শ্রদ্দধতামাশু স্যান্মুকুন্দে মতিঃ সতী ॥১০ ৷৷

  • অনুবাদ : আমি সেই শ্রীমদ্ভাগবত আপনাকে শোনাব, কেননা আপনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত নিষ্ঠাপরায়ণ ভক্ত । যে ব্যক্তি পূর্ণ মনোযোগ এবং শ্রদ্ধা সহকারে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেন , তার শীঘ্রই মুক্তিদাতা ভগবান মুকুন্দে রতি উৎপন্ন হয় ।
  • তাৎপর্যঃ- শ্রীমদ্ভাগবত সর্বজনবিদিত বৈদিক জ্ঞান এবং এই জ্ঞান লাভ করতে হয় অবরোহ পন্থায় বা গুরু - শিষ্য পরম্পরার ধারায় ভৌতিক জ্ঞানের উন্নতির জন্য ব্যক্তিগত ক্ষমতা এবং গবেষণার প্রবণতার প্রয়োজন হয় , কিন্তু পারমার্থিক জ্ঞান লাভে পূর্ণ প্রগতি নির্ভর করে সদ্গুরুর কৃপার উপর । শ্রীগুরুদেব যখন শিষ্যের প্রতি সন্তুষ্ট হন , তখনই কেবল আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের বিদ্যার্থীর কাছে সেই জ্ঞান আপনা থেকেই প্রকাশিত হয় । কিন্তু তা বলে এই প্রক্রিয়াটিকে কোন রকম যাদু বা ভেল্কিবাজি বলে ভুল করা উচিত নয় । এমন নয় যে গুরুদেব একজন যাদুকরের মতো শিষ্যকে তড়িৎ প্রবাহে আবিষ্ট করার মতো সেই জ্ঞান ঢুকিয়ে দেন । সদ্গুরু বৈদিক জ্ঞানের ভিত্তিতে তার শিয্যের কাছে সবকিছু বিশ্লেষণ করেন । শিষ্য তার বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সেই জ্ঞান লাভ করেন না , তা তিনি লাভ করেন বিনম্র প্রশ্ন এবং সেবার মাধ্যমে । অর্থাৎ , গুরুদেব এবং শিষ্য উভয়কেই উপযুক্ত হতে হয় । এখানে গুরুদেব শ্রীল শুকদেব গোস্বামী তার মহান পিতা শ্রীল ব্যাসদেবের কাছ থেকে যা শিখেছিলেন তা যথাযথভাবে কীর্তন করতে প্রস্তুত ছিলেন , আর শিষ্য মহারাজ পরীক্ষিৎ ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এক মহান ভক্ত । ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত হচ্ছেন তিনি যিনি ঐকান্তিকভাবে বিশ্বাস করেন যে কৃষ্ণভক্ত হলে পারমার্থিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুর দ্বারা পূর্ণরূপে সজ্জিত হওয়া যায় । সেই শিক্ষা ভগবান স্বয়ং শ্রীমদ্ভবদ্গীতায় প্রদান করেছেন , যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে তিনিই ( শ্রীকৃষ্ণ ) হচ্ছেন সবকিছু , এবং সর্বতোভাবে তার শরণাগত হওয়ার ফলে সর্বতোভাবে পবিত্র হওয়া যায় । ভগবান শ্রীকৃষ্ণে অবিচল শ্রদ্ধা মানুষকে শ্রীমদ্ভাগবতের শিক্ষালাভের যোগ্যতা প্রদান করে এবং যিনি শুকদেব গোস্বামীর মতো পরম শুদ্ধ ভক্তের শ্রীমুখ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেন তিনি যে মহারাজ পরীক্ষিতের মতো অস্তিমকালে মুক্তিলাভ করবেন , সে সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নেই । পেশাদারী ভাগবত পাঠক এবং মিছা ভক্ত , যাদের শ্রদ্ধা একসপ্তাহ ব্যাপী শ্রবণের উপর আধারিত , তারা শুকদেব গোস্বামী এবং মহারাজ পরীক্ষিৎ থেকে ভিন্ন । শ্রীল ব্যাসদেব শুকদেব গোস্বামীকে জন্মাদ্যস্য শ্লোক থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ শ্রীমদ্ভাগবতের শিক্ষা দান করেছিলেন , এবং শ্রীল শুকদেব গোস্বামীও সেইভাবে তা মহারাজ পরীক্ষিতের কাছে বিশ্লেষণ করেছিলেন । শ্রীকৃষ্ণকে শ্রীমদ্ভাগবতে ( একাদশ স্কন্ধে ) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে তার ভক্তিময় স্বরূপে মহাপুরুষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন ভক্তিভাবে মণ্ডিত শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং । এই কলিযুগের অত্যন্ত অধঃপতিত জীবদের তার বিশেষ কৃপা দান করার জন্য তিনি এই পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন । ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই মহাপুরুষ স্বরূপের বন্দনা করার উপযুক্ত দু'টি শ্লোক রয়েছে—

    ধ্যেয়ং সদা পরিভবঘ্নমভীষ্টদোহং
    তীর্থাস্পদং শিববিরিঞ্চিনুতং শরণ্যম্ ৷
    ভৃত্যার্তিহং প্রণতপাল ভবাদ্ধিপোতং
    বন্দে মহাপুরুষ তে চরণারবিন্দম্ ॥
    ত্যক্তা সুদুস্ত্যজ সুরেপ্সিত রাজ্যলক্ষ্মীং
    ধর্মিষ্ঠ আর্যবচসা যদগাদরণ্যম্ ৷
    মায়ামৃগং দয়িতয়েপ্সিতমন্বধাবদ্
    বন্দে মহাপুরুষ তে চরণারবিন্দম্ ॥

    ( ভাঃ ১১ / ৫ / ৩৩-৩৪ )
    অর্থাৎ , পুরুষ মানে ভোক্তা , আর মহাপুরুষ মানে পরম ভোক্তা বা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ । যিনি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সমীপবর্তী হওয়ার যোগ্য , তাকে বলা হয় মহাপৌরুষিক । কেউ যখন মনোযোগ সহকারে উপযুক্ত বক্তার কাছ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেন , তখন তিনি অবশ্যই মুক্তিদানে সক্ষম ভগবানের ঐকান্তিক ভক্তে পরিণত হন । শ্রীমদ্ভাগবত শোনার ব্যাপারে মহারাজ পরীক্ষিতের মতো ঐকান্তিক শ্রোতা আর কেউ নেই , এবং শ্রীল শুকদেব গোস্বামীর মতো শ্রীমদ্ভাগবতের সুযোগ্য বক্তা আর কেউ নেই । তাই কেউ যদি আদর্শ বক্তা শ্রীল শুকদেব গোস্বামী অথবা আদর্শ শ্রোতা মহারাজ পরীক্ষিতের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন , তাহলে তিনি অবশ্যই তাদের মতো মুক্তি লাভ করবেন । মহারাজ পরীক্ষিৎ মোক্ষ লাভ করেছিলেন কেবল শ্রবণের দ্বারা , আর শুকদেব গোস্বামী মোক্ষ লাভ করেছিলেন কেবল কীর্তনের দ্বারা । শ্রবণ এবং কীর্তন নবধা ভক্তির দুটি প্রধান অঙ্গ , এবং এই ভক্ত্যঙ্গগুলি যদি আংশিকভাবে বা সামগ্রিকভাবে নিষ্ঠা সহকারে অনুশীলন করা হয় , তাহলে পরমপদ প্রাপ্ত হওয়া যায় । তাই জন্মাদ্যস্য শ্লোক থেকে শুরু করে দ্বাদশ স্কন্ধের অস্তিম শ্লোক পর্যন্ত শ্রীমদ্ভাগবত শ্রীল শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিতকে শুনিয়েছিলেন তার ভববন্ধন মোচনের জন্য । পদ্ম - পুরাণে উল্লেখ আছে যে গৌতম মুনি মহারাজ অম্বরীষকে নিয়মিতভাবে শুকদেব গোস্বামী কর্তৃক কীর্তিত শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করার উপদেশ দিয়েছিলেন , এবং এখানেও প্রতিপন্ন হয়েছে যে মহারাজ অম্বরীষ শুকদেব গোস্বামী কর্তৃক কীর্তিত শ্রীমদ্ভাগবত প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রবণ করেছিলেন । যিনি শ্রীমদ্ভাগবত পাঠে যথার্থই আগ্রহী , তিনি বিচ্ছিন্নভাবে এখান থেকে কিছু অংশ বা ওখান থেকে কিছু অংশ — এইভাবে না পড়ে মহারাজ অম্বরীষ বা মহারাজ পরীক্ষিতের পদাঙ্ক অনুসরণ করে শ্রীল শুকদেব গোস্বামীর সুযোগ্য প্রতিনিধির কাছ থেকে তা যথাযথভাবে শ্রবণ করবেন ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।