শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ১ম স্কন্দ, অধ্যায়-১, ( ঋষিদের প্রশ্ন )

    শ্লোক: ৪
    নৈমিষেহনিমিষক্ষেত্রে ঋষয়ঃ শৌনকাদয়ঃ ।
    সত্রং স্বর্গায়লোকায় সহস্ৰসমমাসত ॥৪ ॥

    নৈমিষে — নৈমিষারণ্য নামক অরণ্যে ; অনিমিষ - ক্ষেত্র — যার চক্ষের পলক পড়ে না , সেই পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণুর বিশেষ প্রিয় স্থান ; ঋষয়ঃ - ঋষিরা ; শৌনক-আদয়ঃ — শৌনক আদি ; সত্ৰম্ — যজ্ঞ ; স্বর্গায়- পরমেশ্বর ভগবান যিনি স্বর্গে বন্দিত হন ; লোকায়- যাঁরা পরমেশ্বর ভগবানের ভক্ত , এবং যারা নিরন্তর পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে যুক্ত; সহস্ৰ – এক হাজার ; সমম্- বছর ; আসত – অনুষ্ঠান করেছিলেন ।
  • অনুবাদ : এক সময় শৌনক আদি ঋষিরা পরমেশ্বর ভগবান এবং তাঁর ভক্তদের প্রীতি সাধনের জন্য বিষ্ণু-তীর্থ নৈমিষারণ্যে সহস্র বর্ষ ব্যাপী এক যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন ।
  • তাৎপর্যঃ- পূর্ববর্তী তিনটি শ্লোক হচ্ছে শ্রীমদ্ভাগবতের ভূমিকাস্বরূপ । এখন এই মহান্ শাস্ত্রগ্রস্থের মূল বিষয়টি উপস্থাপন করা হচ্ছে । শ্রীল শুকদেব গোস্বামী প্রথম শ্রীমদ্ভাগবত শোনান , তারপর দ্বিতীয়বার তার পুনরাবৃত্তি হয় নৈমিষারণ্যে । বায়বীয় তন্ত্রে উল্লেখ রয়েছে যে এই ব্রহ্মাণ্ডের কারিগর ব্রহ্মা একটি বিশাল চাকার কথা চিন্তা করেছিলেন , যা এই ব্রহ্মাণ্ডকে পরিবেষ্টন করে থাকবে । সেই বিশাল চক্রের কেন্দ্রটি নৈমিযারণ্য নামক একটি বিশেষ স্থানে রয়েছে । তেমনই , বরাহ পুরাণেও নৈমিযারণ্য উল্লেখ রয়েছে , সেখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে এই স্থানে যজ্ঞ - অনুষ্ঠান করার ফলে আসুরিক মনোভাবাপন্ন মানুষদের শক্তি নষ্ট হয়ে যায় । ব্রাহ্মণেরা এই ধরনের যজ্ঞ - অনুষ্ঠানের জন্য নৈমিযারণ্যকে পছন্দ করেন ।

       ভগবান শ্রীবিষ্ণুর ভক্তরা তার প্রীতি সাধনের জন্য নানা রকম যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন । ভগবানের ভক্ত নিরন্তর ভগবানের সেবা করতে চান , কিন্তু যারা অত্যন্ত অধঃপতিত , তারা জড়জাগতিক সুখ - ভোগের প্রতি আসক্ত । ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে যে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর প্রীতিসাধন ব্যতীত জড়জাগতিক স্তরে যে কাজই করা হোক না কেন , তার ফলে অনুষ্ঠানকারীর বন্ধনই কেবল বৃদ্ধি পায় । তাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে , সমস্ত কর্মই যেন ভগবান শ্রীবিষ্ণু এবং তাঁর ভক্তদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই সাধিত হয় । তার ফলে সকলের শাস্তি এবং সমৃদ্ধি লাভ হয় ।

       মহান ঋষিরা সর্বদাই জনসাধারণের মঙ্গল সাধনের জন্য উৎকণ্ঠিত থাকেন , এবং শৌনক আদি ঋষিরা এই নৈমিষারণ্যে সমবেত হয়েছিলেন এক মহান এবং দীর্ঘকালব্যাপী যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার জন্য । আত্মবিস্মৃত মানুষেরা শান্তি এবং সমৃদ্ধি লাভের যথার্থ পন্থা সম্বন্ধে অবগত নয় কিন্তু ঋষিরা সেই পন্থাটি সম্বন্ধে অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে অবগত , এবং তাই সমস্ত মানুষের মঙ্গল সাধনের জন্য তারা সর্বদাই সেই সমস্ত কর্ম করতে উৎকণ্ঠিত থাকেন , যার ফলে জগতে শান্তি স্থাপিত হয় । তারা সমস্ত জীবের যথার্থ সুহৃদ , এবং তাঁদের ব্যক্তিগত অনেক অসুবিধা হলেও তাঁরা সর্বদাই পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় এবং জনসাধারণের মঙ্গল সাধনে যুক্ত থাকেন । শ্রীবিষ্ণু হচ্ছেন একটি বিশাল বৃক্ষের মতো , এবং অন্য সকলে স্বর্গের দেবতা , মানুষ , সিদ্ধ , চারণ , বিদ্যাধর এবং অন্য সমস্ত জীবেরা হচ্ছে সেই বৃক্ষটির শাখা - প্রশাখা এবং পত্র - স্বরূপ । এই বৃক্ষটির মূলে জল সিঞ্চন করা হলে বৃক্ষটির বিভিন্ন অঙ্গ - প্রত্যঙ্গগুলির আপনা থেকেই পুষ্টিসাধন হয় । কিন্তু যে - সমস্ত শাখা - প্রশাখা এবং পত্র - মুল গাছটি থেকে বিচ্যুত , তারাই কেবল অতৃপ্ত থাকে । যে সমস্ত শাখা - প্রশাখা এবং পত্র - মূল বৃক্ষটি থেকে বিচ্যুত , তাদের যতই জল সিঞ্চন করা হোক না কেন , তবুও তারা ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায় । তেমনই মনুষ্য - সমাজ যখন বিচ্যুত শাখা - প্রশাখা এবং পত্রের মতো পরমেশ্বর ভগবান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে , তখন তাদের আর কোনভাবেই পুষ্টিসাধন করা যায় না , এবং যারা সেই চেষ্টা করে তারা কেবল তাদের শক্তিরই অপচয় করে ।

       আধুনিক জড়বাদী সমাজ পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে তার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছে । আর তাই সেই সমাজে নাস্তিক নেতাদের সমস্ত পরিকল্পনা প্রতি পদক্ষেপে ব্যর্থ হচ্ছে , তবুও তাদের জ্ঞান হচ্ছে না ।

       এই যুগে অজ্ঞানের অন্ধকার থেকে জেগে ওঠার পন্থা হচ্ছে সংঘবদ্ধভাবে পরমেশ্বর ভগবানের দিবা নাম কীর্তন করা । সেই পন্থা এবং তার উপায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রদান করে গেছেন , এবং বুদ্ধিমান মানুষদের কর্তবা হচ্ছে যথার্থ শান্তি এবং সমৃদ্ধি লাভ করার জন্য তাঁর সেই শিক্ষা গ্রহণ করা । শ্রীমদ্ভাগবতও সেই উদ্দেশ্যেই প্রকাশিত হয়েছে , এবং তা আরও বিশদভাবে পরবর্তী অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করা হবে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।