শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-১, ( ভগবদ- উপলব্ধির প্রথম স্তর )

    শ্লোক: ১৫:
    অন্তকালে তু পুরুষ আগতে গত সাধ্বসঃ
    ছিন্দ্যাদসঙ্গ শস্ত্রেণ স্পৃহাং দেহেঽনু যে চ তম্ ॥১৫ ৷৷

  • অনুবাদ : জীবনের অন্তিম সময়ে মৃত্যুভয়ে ভীত না হয়ে অনাসক্তিরূপ অস্ত্রের দ্বারা দেহ ও দেহ সম্পর্কিত সমস্ত বন্ধন ছেদন করা উচিত ।
  • তাৎপর্যঃ- স্কুল জড়বাদের মূর্খতা হচ্ছে যে মানুষ জড় জগতে স্থায়িভাবে অবস্থান করতে চায় , যদিও সকলেই জানে যে মূল্যবান মানবীয় শক্তির দ্বারা মানুষ যা কিছু সৃষ্টি করেছে সে সব তাদের একদিন ছেড়ে চলে যেতে হবে । বড় বড় রাজনীতিজ্ঞ , বৈজ্ঞানিক , দার্শনিক ইত্যাদি মূর্খেরা , যাদের আত্মা সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নেই , মনে করে যে জীবনের কয়েকটি বছরই সবকিছু এবং মৃত্যুর পর আর কিছু নেই । এই পৃথিবীর ক্ষুদ্র জ্ঞানসম্পন্ন তথাকথিত বিজ্ঞানীমণ্ডলী মানুষের জীবনীশক্তিকে হনন করছে এবং তার ভয়াবহ পরিণাম গভীরভাবে অনুভব করা যাচ্ছে । কিন্তু তা সত্ত্বেও মুর্খ জড়বাদীরা ভেবে দেখে না যে তাদের পরবর্তী জীবনে কি হবে । শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রাথমিক উপদেশ হচ্ছে । বর্তমান দেহের বিনাশের পরেও যে জীবের স্বরূপের বিনাশ হয় না সে সম্বন্ধে অবগত হওয়া । কেননা এই জড় শরীর তো কেবল আত্মার একটি বহিরাবরণ মাত্র । ঠিক যেমন পুরান বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করা হয় , ঠিক তেমনই জীবেরও দেহের পরিবর্তন হয় , এবং দেহের এই পরিবর্তনকে বলা হয় মৃত্যু । অতএব মৃত্যু হচ্ছে বর্তমান জীবনের শেষে দেহ পরিবর্তনের একটি পন্থা মাত্র । বুদ্ধিমান মানুষের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে সেজন্য প্রস্তুত হওয়া এবং পরবর্তী জীবনে যাতে এর থেকেও ভাল ধরনের শরীর পাওয়া যায় সেজন্য চেষ্টা করা । সর্বশ্রেষ্ঠ শরীর হচ্ছে চিন্ময় শরীর , যা ভগবদ্ধামে বা চিন্ময় লোকে ফিরে গেলে প্রাপ্ত হওয়া যায় । এই স্কন্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়ে সেই বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করা হবে । তবে শরীরের পরিবর্তনের বিষয়ে মানুষের কর্তব্য হচ্ছে পরবর্তী জীবনের জন্য নিজেকে এখন থেকেই প্রস্তুত করতে শুরু করা । মূর্খ মানুষেরা বর্তমান অনিত্য জীবনের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয় । তাই মূর্খ নেতারা মানুষের কাছে দেহ এবং দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত যা কিছু তার ভিত্তিতে আবেদন করে । দেহের সম্পর্ক কেবল এই দেহটির মধ্যেই সীমিত নয় , তা আত্মীয় - স্বজন , স্ত্রী - পুত্র , সমাজ , দেশ এবং অন্য অনেক কিছুতে আরোপিত হয় , যা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় । মৃত্যুর পর মানুষ বর্তমান শরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছুর কথা ভুলে যায় । তার কিছুটা অনুভব আমাদের হয় রাত্রে ঘুমবার সময় যখন আমরা ঘুমিয়ে পড়ি , তখন দেহ এবং দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছুর কথা আমরা ভুলে যাই , যদিও সেই বিস্মৃতি সাময়িক — কেবলমাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য । মৃত্যু কয়েক মাস ব্যাপী নিদ্রা ছাড়া আর কিছু নয় , যার মাধ্যমে কোন একটি শরীরের বন্ধন সূচিত হয় এবং সেই শরীরটি আমরা লাভ করি আমাদের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে প্রকৃতির দানরূপে । তাই এই শরীরের অবস্থানকালে আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন করা প্রয়োজন । এই শিক্ষা জীবনের যে কোন স্তরে লাভ করতে শুরু করা যায় , এমনকি মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত পূর্বেও তা শুরু করা যায় । তবে সাধারণ পন্থা হচ্ছে জীবনের প্রাথমিক স্তরে ব্রহ্মচর্য আশ্রম থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে গৃহস্থ , বানপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করার মাধ্যমে তা লাভ করা । এই শিক্ষা যে সমাজে দেওয়া হয় , তাকে বলা হয় বর্ণাশ্রম ধর্ম বা সনাতন ধর্ম , যা হচ্ছে মানবজীবনকে সম্পূর্ণরূপে সফল করার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা । এই পন্থায় পঞ্চাশ বছর বয়স হলে সবরকম পারিবারিক , সামাজিক বা রাজনৈতিক বন্ধন পরিত্যাগ করতে হয় ; আরও ভাল হয় যদি তা তারও আগে করা যায় । বানপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস আশ্রমের শিক্ষা দেওয়া হয় পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির জন্য । মূর্খ জড়বাদীরা জনসাধারণের নেতা সেজে পারিবারিক বিষয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ বিচ্ছেদ না করে তাদের প্রতি আসক্ত থাকে . এবং এইভাবে তারা প্রকৃতির নিয়মের শিকার হয় ও তাদের কর্ম অনুসারে স্থূল জড় শরীর প্রাপ্ত হয় । এই প্রকার মূর্খ নেতারা তাদের জীবনের শেষে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কিছু শ্রদ্ধা পেতে পারে , কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সকলের হাত পা দৃঢ়ভাবে সেবায় রূপান্তরিত তা না হলে জীবের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে প্রকৃতির যে নিয়ম , তার থেকে রেহাই পাবে । তাই সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হচ্ছে । স্বেচ্ছায় পারিবারিক , সামাজিক , রাজনৈতিক প্রভৃতি সমস্ত আসক্তি ভগবানের প্রেমময়ী করা । এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে সমস্ত পারিবারিক আসক্তির বাসনা পরিত্যাগ করা উচিত । উন্নততর বাসনা লাভের প্রচেষ্টা করা কর্তব্য , এই প্রকার কুৎসিত বাসনাগুলি পরিত্যাগ করা সম্ভব হবে না । বাসনা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত । জীব নিত্য এবং তাই তার বাসনাও নিত্য । তাই মানুষ ইচ্ছা করা ছেড়ে দিতে পারে না , তবে ইচ্ছার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করা যায় । তাই ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার বাসনা বিকশিত করা অবশ্য কর্তব্য এবং তার ফলে জড় লাভ , জড় প্রতিষ্ঠা , জড় যশ ইত্যাদির বাসনাগুলি ভগবস্তুক্তি বিকাশের মাত্রা অনুসারে হ্রাস পেতে থাকবে । জীবের কর্তব্য হচ্ছে সেবা করা , এবং সেই সেবার প্রবণতাকে কেন্দ্র করে তার সমস্ত বাসনা । রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে পথের নগণ্য ভিক্ষুক পর্যন্ত সকলেই কারও না কারও সেবা করছে । এই সেবাবৃত্তির পূর্ণতা তখনই প্রাপ্ত হওয়া যায় , যখন সেই সেবার বাসনা জড় বস্তু থেকে আত্মায় , অথবা শয়তান থেকে পরমেশ্বর ভগবানে স্থানান্তরিত করা হয় ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।