শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্দ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ১২
    অদীনলীলাহসিতেক্ষণোল্লসদ্–
    ভ্রূভঙ্গসংসূচিত ভূর্যনুগ্রহম্ ।
    ঈক্ষেত চিন্তাময়মেনমীশ্বরং
    যাবন্মনো ধারণয়াবতিষ্ঠতে ॥১২॥

  • অনুবাদ : ভগবানের উদার লীলা এবং হাস্যযুক্ত কটাক্ষপাতে যে চমৎকার ভ্রূভঙ্গী দীপ্তিমান হয়, তাতে তাঁর অত্যন্ত অনুগ্রহ পূর্ণরূপে সূচিত হয়। তাই যতক্ষণ ধ্যানের দ্বারা মনকে নিবদ্ধ করা যায়, ততক্ষণই ভগবানের এই দিব্য রূপের উপর মনকে স্থির করা উচিত ।
  • তাৎপর্যঃ- শ্রীমদ্ভগবদগীতায় ( ১২/৫ ) বলা হয়েছে যে নির্বিশেষবাদীরা নিরাকারের ধ্যান করার ফলে বিভিন্ন প্রকার ক্লেশ ভোগ করে । কিন্তু ভগবদ্ভক্ত ভগবানের অন্তরঙ্গ সেবা করার মাধ্যমে অনায়াসে উত্তীর্ণ হন । নিরাকারের ধ্যান তাই নির্বিশেষবাদীদের পক্ষে দুঃখ - দুর্দশার উৎসস্বরূপ । এখানে ভগবদ্ভক্তের নির্বিশেষ দার্শনিকদের তুলনায় একটি সুবিধা রয়েছে । নির্বিশেষবাদীরা পরমেশ্বর ভগবানের সবিশেষ রূপ সম্বন্ধে সন্দিহান , তাই তারা সর্বদাই অবাস্তব বস্তুর ধ্যান করার চেষ্টা করে । সেই জন্য শ্রীমদ্ভাগবতে ভগবানের বাস্তবিক স্বরূপের ধ্যানে মনকে একাগ্র করার জন্য প্রামাণিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।

       এখানে যে ধ্যানের পন্থা অনুমোদন করা হয়েছে তা ভক্তি যোগের পন্থা, বা জড় জগতের বদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হওয়ার পন্থা। কেউ যখন জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হন , অর্থাৎ পূর্বের বর্ণনা অনুসারে নিবৃত্ত হন বা সমস্ত জড়জাগতিক প্রয়োজন থেকে মুক্ত হন , তখন তিনি ভক্তিযোগের পন্থা সম্পাদন করার যোগ্যতা অর্জন করেন। তাই ভক্তিযোগে জ্ঞান - যোগও নিহিত রয়েছে, অথবা শুদ্ধ ভক্তির পন্থা যুগপৎ জ্ঞানযোগের উদ্দেশ্যও সাধন করে শুদ্ধ ভক্তির ক্রমবিকাশের ফলে বন্ধন থেকে স্বাভাবিকভাবেই মুক্তি লাভ হয়ে থাকে। ভক্তিযোগের এই প্রভাবকে বলা হয় অনর্থ - নিবৃত্তি । ভক্তিযোগের প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিমভাবে অর্জিত বস্তুসমূহ ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। পারমার্থিক প্রগতির প্রাথমিক স্তর অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান অনর্থ - নিবৃত্তির দ্বারা তার প্রভাব প্রদর্শন করবে । সবচাইতে গভীর অনর্থ , যা বদ্ধ জীবকে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে তা হচ্ছে যৌন বাসনা , এবং এই যৌন বাসনার চরম প্রকাশ হচ্ছে নর - নারীর মিলন । নর - নারীর মিলনের ফলে যৌন বাসনা পুনরায় বর্ধিত হয় গৃহ , সন্তান - সন্ততি , বন্ধু - বান্ধব , আত্মীয় স্বজন এবং ধন - সম্পদের সঞ্চয়ের মাধ্যমে । এগুলি লাভ হলে বদ্ধ জীব এগুলির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং তখন মিথ্যা অহঙ্কার বা ' আমি ' এবং ' আমার ' ধারণা অত্যন্ত গভীরভাবে প্রকট হয় তখন যৌন বাসনা বিভিন্ন প্রকার রাজনৈতিক , সামাজিক , পরার্থবাদ , লোকহিতৈষণা এবং অন্যান্য নানা প্রকার কার্যকলাপে প্রসারিত হয় , যা সমুদ্রে তরঙ্গের উপরের ফেনার মতো ক্ষণিকের জন্য অত্যন্ত প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়ে পর মুহূর্তে আকাশের মেঘের মতো মিলিয়ে যায় । বদ্ধজীব এই প্রকার বস্তুসমূহের দ্বারা তথা যৌন বাসনা প্রসূত বস্তুসমূহের দ্বারা বদ্ধ হয়ে পড়ে , এবং তাই ভক্তিযোগের প্রভাবে ধীরে ধীরে যৌন বাসনা , যার সূক্ষ্ম প্রকাশ হচ্ছে লাভ , পূজা এবং প্রতিষ্ঠা , তা ধীরে ধীরে লোপ পায় । সমস্ত বদ্ধ জীবেরাই বিভিন্ন প্রকার যৌন - বাসনার দ্বারা উন্মাদগ্রস্ত , এবং কে কতটা যৌন বাসনাভিত্তিক জড় আসক্তি থেকে মুক্ত হয়েছে সে বিষয়ে সব সময় লক্ষ্য রাখা উচিত । প্রতি গ্রাস অন্ন ভোজনের ফলে যেমন ক্ষুধার নিবৃত্তি অনুভব করা যায় , ঠিক তেমনই পারমার্থিক উন্নতির মাত্রা নির্ধারণ করা যায় যৌন - বাসনার নিবৃত্তির মাত্রা অনুসারে । ভক্তিযোগের অনুশীলনের ফলে বিভিন্ন প্রকার যৌন - বাসনার নিবৃত্তি হয় , কেননা ভক্তিযোগের অনুশীলন করলে ভগবানের কৃপায় জ্ঞান এবং বৈরাগ্যের উদয় হয় । এমনকি জাগতিক বিচারে ভক্ত উচ্চ জ্ঞানসম্পন্ন না হলেও তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে এই সমস্ত সদ গুণাবলীর উদয় হয়ে থাকে । জ্ঞানের অর্থ হচ্ছে বস্তু সম্বন্ধে যথাযথভাবে জানা এবং যদি বিচারপূর্বক জানা যায় যে , কোন কোন বস্তু সম্পূর্ণরূপে অনাবশ্যক , তখন জ্ঞানবান ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই সেই সমস্ত অবাঞ্ছিত বস্তু ত্যাগ করে থাকেন । যখন বদ্ধ জীব জ্ঞানের অনুশীলনের দ্বারা বুঝতে পারেন যে , জড়জাগতিক সমস্ত আবশ্যকতাগুলি অবাঞ্ছিত , তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই সেগুলির প্রতি অনাসক্ত হন । জ্ঞানের এই স্তরকে বলা হয় বৈরাগ্য , বা অবাঞ্ছিত বস্তুর প্রতি অনাসক্তি । পূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি যে , পরমার্থবাদীকে স্বাবলম্বী হতে হয় এবং তার জীবনের অভাব পূরণ করার জন্য ধনমদান্ধ ব্যক্তিদের কাছে ভিক্ষা করা উচিত নয় । শ্রীল শুকদেব গোস্বামী জীবনের একান্ত আবশ্যকতাগুলি , যথা আহার , নিদ্রা , আশ্রয় আদি সমস্যার বিকল্প সম্বন্ধে নির্দেশ দিয়েছেন , কিন্তু মৈথুন সম্বন্ধে তিনি কোন বিকল্প প্রদর্শন করেননি । যাদের হৃদয়ে কাম - বাসনা বর্তমান , তাদের সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করা উচিত নয় । কেননা সেই স্তরে উন্নীত না হলে সন্ন্যাস আশ্রমের প্রশ্নই ওঠে না । অতএব ক্রমান্বয়ে সদ্গুরুর নির্দেশ অনুসারে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করে এবং শ্রীমদ্ভাগবতের শিক্ষা ও সিদ্ধান্ত অনুসরণ করার মাধ্যমে সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করার পূর্বে অন্তত স্থূল যৌন বাসনাকে সংযত করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে ।

       এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে , পবিত্র হওয়ার অর্থ হচ্ছে যৌন বাসনা থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হওয়া এবং তা সম্ভব হয় এখানে বর্ণিত পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম থেকে শুরু করে সমগ্র শ্রীঅঙ্গের ধ্যান করার মাধ্যমে যৌন বাসনা থেকে কতখানি মুক্ত হওয়া সম্ভব হয়েছে , তা বিচার না করে কৃত্রিমভাবে উপরে ওঠার , অর্থাৎ ভগবানের দিব্যরূপের ঊর্ধ্বাঙ্গসমূহের ধ্যান করার চেষ্টা করা উচিত নয় । ভগবানের হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডল হচ্ছে শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধ । বহু অকালপক্ক লোক সরাসরি দশম স্কন্ধ থেকে শুরু করতে চায় , বিশেষ করে ভগবানের রাসলীলা বর্ণনাকারী পাচটি অধ্যায় থেকে । এটি অত্যন্ত গর্হিত । শ্রীমদ্ভাগবতের এই ধরনের অধ্যয়ন বা শ্রবণ করার অপপ্রয়াসের ফলে বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা শ্রীমদ্ভাগবতের নামে কামক্রীড়ায় লিপ্ত হয়ে তাদের সর্বনাশ সাধন করে থাকে। এই সমস্ত তথাকথিত ভক্তদের কার্যকলাপের ফলে শ্রীমদ্ভাগবতের অমর্যাদা হয়েছে । জনসাধারণের কাছে শ্রীমদ্ভাগবতের তত্ত্ব বর্ণনা করতে চেষ্টা করার পূর্বে সর্বপ্রকার যৌন বাসনা থেকে মুক্ত হওয়া উচিত । শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে , পবিত্র হওয়ার অর্থ হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে যৌন বিষয়ে নির্লিপ্ত হওয়া । তিনি বলেছেন ,
    যথা যথা ধীশ্চ শুধ্যতি
    বিষয়–লাম্পট্যং ত্যজতি
    তথা তথা ধারয়েদিতি
    চিত্ত - শুদ্ধি – তারতম্যেনৈব
    ধ্যান - তারতম্যমোক্তম্ ।

    অর্থাৎ , বুদ্ধিবৃত্তির বিশুদ্ধিকরণের মাধ্যমে যে পরিমাণে যৌন - বাসনার উন্মত্ততা থেকে মুক্ত হওয়া যায় , সেই অনুসারে ধ্যানের প্রগতির তারতম্য হয় । অর্থাৎ , ভগবানের অপ্রাকৃত দেহের বিভিন্ন অঙ্গের ধ্যান হৃদয়ে পবিত্রীকরণের মাত্রা অনুসারে হওয়া উচিত । মূল বক্তব্য হচ্ছে যে , যারা এখনও যৌন - বাসনার প্রতি অনুরক্ত হওয়ার ফলে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ , তাদের ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের ঊর্ধ্বে ধ্যান করা উচিত নয় । তাই তাদের পাঠ যেন শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম এবং দ্বিতীয় স্কন্ধেই সীমিত থাকে । মানুষের কর্তব্য ভাগবতের প্রথম ন’টি স্কন্ধের বিষয়বস্তু হৃদয়ঙ্গম করে পূর্ণরূপে শুদ্ধ হওয়া, তারপর শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে প্রবেশ করা যেতে পারে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.