শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ৪
    সত্যাং ক্ষিতৌ কিংকশিপোঃ প্ৰয়াসৈ
    র্বাহৌ স্বসিদ্ধে হ্যুপবৰ্হণৈঃ কিম্ ৷
    সত্যঞ্জলৌ কিং পুরুধান্নপাত্র্যা
    দিগ্বক্ললাদৌ সতি কিং দুকূলৈঃ ॥৪ ॥

  • অনুবাদ : ভূমিরূপ শয্যা থাকতে শয়নের জন্য খাট এবং পালঙ্কের কি প্রয়োজন ? বাহু থাকতে উপাধানের কি প্রয়োজন ? আর যখন অঞ্জলি বর্তমান , তখন বহুমূল্য পাত্রেরই বা কি প্রয়োজন ? দিক্ ও বৃক্ষ বল্কলাদি থাকতে বস্ত্রের কি প্রয়োজন ?
  • তাৎপর্যঃ- দেহরক্ষার জন্য জীবনের আবশ্যকতাগুলি অনর্থক বৃদ্ধি করা উচিত নয় । এই প্রকার মায়িক সুখের অন্বেষণে মানবশক্তি অর্থহীনভাবে নষ্ট হয় । যদি মেঝেতে শয়ন করা যায় , তা হলে সুন্দর পালঙ্কের অথবা নরম গদির অন্বেষণ করে কি লাভ ? মানুষ যদি উপাধান ব্যবহার না করে প্রকৃতির দেওয়া তার নরম বাহুর আশ্রয়ে বিশ্রাম করতে পারে , তা হলে উপাধানের অন্বেষণ করার কোন প্রয়োজন নেই । আমরা যদি পশুদের জীবন পর্যালোচনা করি , তা হলে আমরা দেখতে পাই যে , বড় বাড়ি , আসবাবপত্র , এবং অন্যান্য গৃহস্থালী সামগ্রী তৈরি করার বুদ্ধি তাদের নেই , কিন্তু তবুও খোলা আকাশের নীচে শয়ন করে তারা সুস্থ জীবন যাপন করে । তারা জানে না কিভাবে রান্না করতে হয় , তথাপি তারা অনায়াসে মানুষদের থেকে অধিক সুস্থ জীবন যাপন করে । তার অর্থ এই নয় যে , মানব সভ্যতা পশু জীবনে ফিরে যাবে অথবা কোন রকম সংস্কৃতি , শিক্ষা এবং নীতিবোধবিহীন হয়ে মানুষেরা নগ্ন হয়ে জঙ্গলে বাস করবে । বুদ্ধিমান মানুষ কখনও পশুর মতো জীবন যাপন করতে পারে না ; পক্ষান্তরে , মানুষের কর্তব্য হচ্ছে শিল্পকলা , বিজ্ঞান , কাব্য এবং দর্শনে তার বুদ্ধিমত্তার যথার্থ সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করা । এইভাবে মানুষ মানব সভ্যতার প্রগতি সাধন করতে পারে । কিন্তু এখানে শ্রীল শুকদেব গোস্বামী যে ধারণাটি প্রদান করেছেন , সেটি হচ্ছে পশুদের থেকে অনেক উন্নত মানুষের সংরক্ষিত শক্তি কেবল আত্মতত্ত্ব উপলব্ধির জন্যই ব্যবহার করা উচিত । মানব সভ্যতার প্রগতির লক্ষণ হওয়া উচিত ভগবানের সঙ্গে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা , কেননা মানব ব্যতীত অন্য কোন জীবনে তা সম্ভব নয় । আকাশ কুসুম সদৃশ জড় জগতের নিরর্থকতা সম্বন্ধে মানুধের যথাযথভাবে অবগত হওয়া উচিত , এবং তাই মানুষের কতব্য হচ্ছে জীবনের সমস্ত দুঃখ - দুদর্শার সমাধান করা ।
        ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধনের উদ্দেশ্যে চাকচিক্যপূর্ণ পাশবিক সভ্যতার প্রগতিতে আত্মতৃপ্ত হয়ে থাকা একটি মস্ত বড় ভ্রম , এবং এই প্রকার ' সভ্যতাকে' সভ্যতা বলা যায় না । এই প্রকার অর্থহীন কার্যকলাপের ফলে মানুষ মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে । পুরাকালে মহান্ মুনি - ঋষিরা সুন্দর আসবাবপত্র এবং জীবনের সুযোগ - সুবিধায় পরিপূর্ণ প্রাসাদোপম গৃহে বাস করতেন না , তারা পর্ণকুটিরে অথবা উপবনে বাস করতেন এবং ভূমিতে উপবেশন করতেন , তথাপি তারা সর্বতোভাবে পূর্ণ জ্ঞানের অন্তহীন ভাণ্ডার রেখে গেছেন । শ্রীল রূপ গোস্বামী এবং শ্রীল সনাতন গোস্বামী ছিলেন উচ্চপদস্থ রাজমন্ত্রী , কিন্তু তারা এক - একটি বৃক্ষের নীচে এক - একটি রাত্রি যাপন করে অপ্রাকৃত জ্ঞানের এক অন্তহীন রচনা - ভাণ্ডার রেখে গেছেন । সুন্দর আসবাবপত্রে সজ্জিত এবং আধুনিক সুযোগ - সুবিধায় পরিপূর্ণ গৃহে বাস করা তো দূরের কথা , তারা একটি গাছের নীচে দুই রাত্রি পর্যন্ত থাকতেন না । কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা আত্মতত্ত্ব উপলব্ধির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী আমাদের দিয়ে গেছেন । জীবনের তথাকথিত সুযোগ - সুবিধাগুলি প্রকৃতপক্ষে সভ্যতার প্রগতির অনুকূল নয় ; পক্ষান্তরে তারা এই প্রগতিশীল জীবনের প্রতিবন্ধক । চতুর্বর্ণ এবং চতুরাশ্রমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সনাতন ধর্মের প্রথায় জীবনের সুখময় সমাপ্তির জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সেই প্রথার অনুশীলনকারী ব্যক্তি তার জীবনের বাঞ্ছিত লক্ষ্য প্রাপ্ত হওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করেন । কেউ যদি জীবনের শুরু থেকেই ত্যাগ এবং নিঃস্বার্থের জীবন যাপনে অভ্যস্ত না হন , তবে শ্রীল শুকদেব গোস্বামীর নির্দেশ অনুসারে তার জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে তা অনুশীলন করার চেষ্টা করা উচিত , তা হলে তা ঈপ্সিত সাফল্য লাভের সহায়ক হবে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।