শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্দ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ৩
    অতঃ কবিনামসু যাবদর্থঃ
    স্যাদপ্রমত্তো ব্যবসায়বুদ্ধিঃ ।
    সিদ্ধেঽন্যথার্থে ন যতেত তত্র
    পরিশ্রমং তত্র সমীক্ষমাণঃ ॥ ৩ ॥

  • অনুবাদ : অতএব তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি উপাধিসমন্বিত এই জগতে কেবল ন্যূনতম আবশ্যকতাগুলির জন্য প্রয়াস করবেন । তার কর্তব্য বুদ্ধিমত্তা সহকারে স্থির হওয়া এবং কখনো অবাঞ্ছিত বস্তুর জন্য কোন রকম প্রয়াস না করা , কেননা তিনি ব্যবহারিকভাবে উপলব্ধি করেছেন যে , সেই সমস্ত প্রচেষ্টা কেবল অর্থহীন পরিশ্রম মাত্র ।
  • তাৎপর্যঃ- ভাগবদ্ধর্ম বা শ্রীমদ্ভাগবত প্রদর্শিত পন্থা সকাম কর্মের পন্থা থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক ; ভগবদ্ভক্তেরা সকাম কর্মের পন্থাকে কেবল সময়ের অনর্থক অপচয় বলে মনে করেন । সমগ্ৰ ব্ৰহ্মাণ্ড , তথা সমগ্র জড় জগৎ কেবল সুখ - স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তার পরিকল্পনায় আবর্তিত হচ্ছে , যদিও সকলেই দেখতে পায় যে , এই জগতে কারও অস্তিত্বই সুখ - স্বাচ্ছন্দ্যময় অথবা নিরাপদ নয় জীবনের কোন অবস্থাতেই মানুষ সুখ - স্বাচ্ছন্দ্যময় অথবা নিরাপদ হতে পারে না । যারা অলীক জড় সভ্যতার মোহময়ী প্রগতির দ্বারা মোহিত , তারা অবশ্যই উন্মাদ । জড় সৃষ্টি কেবল নামের ভোজবাজি ; প্রকৃতপক্ষে , তা কেবল মাটি , জল , আগুন ইত্যাদি জড় পদার্থের বিভ্রান্তিকর সমন্বয় ছাড়া আর কিছু নয় । বাড়িঘর , আসবাবপত্র , গাড়ি , কলকারখানা , শাস্তি , যুদ্ধ , এমন কি জড় বিজ্ঞানের সর্বোত্তম সাফল্য , যথা আণবিক শক্তি এবং ইলেকট্রনিক্স , এসবই প্রকৃতির তিনটি গুণের প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে উদ্ভূত জড় উপাদানগুলির বিভ্রান্তিকর নাম মাত্র । যেহেতু ভগবানের ভক্তেরা সে সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে অবগত , তাই তারা সমুদ্রের তরঙ্গে বুদবুদের অবাস্তব বস্তুসমূহের দ্বারা অবাঞ্ছিত বিষয় সৃষ্টির ব্যাপারে উৎসাহী নন । মহান রাজা , নেতা এবং সৈনিকেরা ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম লিপিবদ্ধ করার জন্য পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করে । কালের প্রভাবে ইতিহাসের আর একটি যুগকে স্থান দেওয়ার জন্য তারা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায় । কিন্তু ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিরা যে প্রবহমান কালের কিরকম অর্থহীন উৎপাদন , সে সম্বন্ধে ভক্তরা উপলব্ধি করতে পারেন । সকাম কর্মীরা প্রভূতভাবে ধন - সম্পদ স্ত্রী রত্ন এবং জাগতিক যশ লাভের আকাঙ্ক্ষা করে , কিন্তু যারা বাস্তব জ্ঞান লাভ করেছেন , তাদের এই সমস্ত অলীক বস্তুর প্রতি কোন রকম আগ্রহ নেই । তাদের কাছে তা কেবল সময়ের অপচয় মাত্র । যেহেতু মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষণই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ , তাই তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তিদের কর্তব্য হচ্ছে অত্যস্ত সতর্কতার সঙ্গে তাদের সময়ের সদ্ব্যবহার করা । মানব জীবনের এক মুহূর্তও যদি জড় জগতের সুখ ভোগের পরিকল্পনায় নষ্ট করা হয় , তা হলে কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়েও তা ফিরে পাওয়া যাবে না । তাই মায়ার বন্ধন থেকে বা জীবনের মোহময়ী কার্যকলাপ থেকে মুক্ত হতে ইচ্ছুক অধ্যাত্মবাদীকে এখানে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে যে , তিনি যেন সকাম কর্মের বাহ্যিক রূপে মোহিত না হন । ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধন করা কখনই মানব জীবনের উদ্দেশ্য নয় ; মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মতত্ত্বজ্ঞান লাভ করা । শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সেই উপদেশ দেওয়া হয়েছে । আত্ম - উপলব্ধি করাই হচ্ছে মানব জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য । যে সভ্যতা এই পরম সিদ্ধিকে লক্ষ্যরূপে গ্রহণ করে , তা কখনো অর্থহীন বস্তু তৈরির কাজে লিপ্ত হয় না , এবং সেই প্রকার সর্বাঙ্গসুন্দর সভ্যতা মানুষকে কেবল জীবনের ন্যূনতম আবশ্যকতাগুলি গ্রহণ করতে শেখায় , বা খারাপ সওদার সর্বোত্তম উপযোগ করার সিদ্ধান্ত পালন করার ব্যাপারে প্রস্তুত করে । আমাদের জড় দেহ এবং সেই দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত আমাদের জীবন হচ্ছে একটি খারাপ সওদা , কেননা প্রকৃতপক্ষে জীব হচ্ছে চিন্ময় আত্মা , এবং পারমার্থিক প্রগতি হচ্ছে জীবের পরম প্রয়োজন । মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উপলব্ধি করা , এবং সেই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অন্য উদ্দেশ্যে শক্তির অপচয় না করে ও জড় সুখভোগের প্রতি উন্মত্ত না হয়ে ভগবানের দানের উপর নির্ভরশীল থেকে জীবন ধারণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই গ্রহণ করা । জড় সভ্যতার প্রগতিকে বলা হয় “ আসুরিক সভ্যতা " , যা পরিণামে যুদ্ধ এবং অভাবে পর্যবসিত হয় । পরমার্থবাদীদের এখানে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে , তারা যেন তাদের মনকে স্থির করেন যাতে উচ্চতর চিন্তাধারা সমন্বিত সরল জীবন যাপনেও যদি প্রতিকূলতা আসে , তা হলেও যেন তারা তাদের দৃঢ় সংকল্প থেকে একটুও বিচলিত না হন । জড়জাগতিক ইন্দ্রিয় - তৃপ্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকা অধ্যাত্মবাদীদের পক্ষে আত্মহত্যার পন্থা , কেননা এই প্রকার পন্থা জীবনের চরম উদ্দেশ্য সাধনে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে । শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন , যখন মহারাজ পরীক্ষিৎ সেই সাক্ষাতের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন । অধ্যাত্মবাদীদের কর্তব্য হচ্ছে প্রকৃত মুক্তির অভিলাষী ব্যক্তিদের সাহায্য করা এবং মুক্তির উদ্দেশ্য সাধনে সহযোগিতা করা । এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে যে , মহারাজ পরীক্ষিৎ যখন একজন মহান রাজা রূপে রাজ্য শাসন করছিলেন , তখন শুকদেব গোস্বামী তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি । অধ্যাত্মবাদীদের কার্যকলাপ পরবর্তী শ্লোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.