শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ৬
    এবং স্বচিত্তে স্বত এব সিদ্ধ
    আত্মা প্রিয়োঽর্যো ভগবাননন্তঃ ।
    তং নিৰ্বৃতো নিয়তার্থো ভজেত
    সংসারহেতূপরমশ্চ যত্ৰ ॥৬ ॥

  • অনুবাদ : এইভাবে স্থির হয়ে তাঁর সর্বশক্তিমত্তার প্রভাবে সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরমাত্মার সেবা করা কর্তব্য । যেহেতু তিনি সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর ভগবান , নিত্য এবং অন্তহীন , তিনিই জীবনের পরম লক্ষ্য এবং তার আরাধনার ফলে মানুষ সংসারের হেতুরূপা অবিদ্যাকে দূর করতে পারে ।
  • তাৎপর্যঃ- শ্রীমদ্ভগবদগীতায় (১৮/৬১) প্রতিপন্ন করা হয়েছে যে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বব্যাপ্ত পরমাত্মা । তাই যিনি যোগী তিনি কেবল তারই আরাধনা করতে পারেন , কেন না তিনি অলীক নন , পক্ষান্তরে তিনি হচ্ছেন বাস্তব বস্তু । প্রতিটি জীবই কারও না কারও সেবায় যুক্ত । জীবের স্বরূপগত বৃত্তি হচ্ছে সেবা করা । কিন্তু সে যখন মায়ার দ্বারা প্রভাবিত থাকে অথবা বদ্ধ অবস্থায় থাকে , তখন সে মায়ার সেবা করতে চায় । বন্ধ জীব তার অনিত্য দেহের সেবায় , স্ত্রী , পুত্র আদি দেহ সম্বন্ধীয় আত্মীয় - স্বজনদের সেবায় , এবং গৃহ , ভূমি , ধন - সম্পদ , সমাজ , দেশ ইত্যাদি দেহ এবং দেহ সম্বন্ধীয় বিষয়সমূহের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে সর্বদা যুক্ত থাকে । কিন্তু সে বুঝতে পারে না যে , তার এই সমস্ত সেবার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণরূপে মায়িক । আলোচনা করেছি যে , এই জড় জগৎ হচ্ছে মরুভূমির মরীচিকার মতো অলীক । মরুভূমিতে মরীচিকাকে জল বলে ভ্রম হয় , এবং নির্বোধ পশু সেই ভ্রমের শিকার হয়ে তার পেছনে ধাবিত হয় , যদিও সেখানে কোন জলই নেই । মরুভূমিতে জল নেই ঠিকই , কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে , জল নামক বস্তুটি কোথাও নেই । বুদ্ধিমান ব্যক্তি জানেন যে কোথাও না কোথাও জল অবশ্যই রয়েছে , সমুদ্রে এবং মহাসাগরে জল রয়েছে , কিন্তু সেই প্রকার বিশাল জলাশয় মরুভূমি থেকে অনেক দূরে । তাই সমুদ্র এবং মহাসাগরেই জলের অন্বেষণ করা উচিত , মরুভূমিতে নয় । আমরা সকলেই প্রকৃত সুখের অন্বেষণ করছি , যথা নিত্য জীবন , নিত্য ও অন্তহীন জ্ঞান এবং অন্তহীন আনন্দ । কিন্তু যারা মূর্খ তারা মায়ার জগতে এই বাস্তব বস্তুর অন্বেষণ করে । এই জড় দেহ নিত্য নয় , এবং এই অনিত্য দেহের সম্পর্কে সম্পর্কিত যা কিছু যথা স্ত্রী , পুত্র , সমাজ , দেশ ইত্যাদি সব কিছুই অনিত্য — এই দেহের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও পরিবর্তন হয় । একে বলা হয় সংসার , অথবা জন্ম - মৃত্যু - জরা - ব্যাধির আবর্ত । আমরা জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে চাই , কিন্তু কিভাবে যে তা সম্ভব , তা আমরা জানি না । এখানে বলা হয়েছে যে যদি কেউ জন্ম - মৃত্যু - জরা - ব্যাধি সমন্বিত জীবনের ক্লেশগুলি থেকে অব্যাহতি লাভ করতে চায় , তা হলে তাকে অবশ্যই পরমেশ্বর ভগবানকে আরাধনার পন্থা অবলম্বন করতে হবে , এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই ।

       এই সত্য শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতেও ( ১৮/৬৫ ) প্রতিপন্ন হয়েছে । আমরা যদি যথার্থই আমাদের বদ্ধ জীবনের সমাপ্তি সাধন করতে চাই , তা হলে আমাদের অবশ্যই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনায় যুক্ত হতে হবে , তিনি প্রতিটি জীবের প্রতি তার স্বাভাবিক স্নেহের বশে সকলের হৃদয়ে বিরাজমান ; কেননা প্রতিটি জীব হচ্ছে তার বিভিন্ন অংশ ( ভ : গী : ১৮/৬১ ) / মাতৃক্রোড়ে স্থিত শিশু স্বাভাবিকভাবেই মায়ের প্রতি আসক্ত । কিন্তু শিশু যখন বড় হয় এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে , তখন সে ধীরে ধীরে তার মায়ের থেকে দূরে সরে যায় , কিন্তু মা সর্বদাই প্রত্যাশা করেন যে , তার উপযুক্ত সন্তান কোন না কোন ভাবে তার সেবা করবে , আর তার সন্তান তাকে ভুলে গেলেও তিনি সর্বদাই তার প্রতি সমভাবে স্নেহশীল । তেমনই , পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন অংশ হওয়ার ফলে ভগবান সর্বদাই আমাদের প্রতি স্নেহপরায়ণ , এবং তিনি সর্বদাই আমাদের প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামেই আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান । কিন্তু আমরা , বদ্ধ জীবেরা তার কথা না ভেবে অনিত্য দেহের মায়িক সম্পর্কের পিছনে ধাবিত হই । তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে জড় জগতের সমস্ত মায়িক সম্পর্ক থেকে নিজেদের মুক্ত করে পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা এবং এইভাবে তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা , কেননা তিনি হচ্ছেন পরম সত্য । শিশু যেমন তার মায়ের জন্য আকুল হয় , আমরাও প্রকৃতপক্ষে তার জন্য আকুলতা বোধ করি । আর পরমেশ্বর ভগবানকে খুঁজতে হলে আমাদের অন্য কোথাও যেতে হবে না , কেননা তিনি আমাদের হৃদয়ের অভ্যন্তরে রয়েছেন । তার অর্থ অবশ্য এই নয় যে , ভগবানের আরাধনার স্থল মন্দির , মসজিদ বা গীর্জায় যেতে আমাদের নিষেধ করা হচ্ছে । এই সমস্ত পবিত্র স্থানে ভগবান অবশ্যই রয়েছেন , কেননা তিনি সর্বব্যাপ্ত সাধারণ মানুষদের জন্য এই সমস্ত পবিত্র স্থানগুলি ভগবত্তত্ব বিজ্ঞান অধ্যয়নের কেন্দ্র । মন্দিরগুলি যখন পারমার্থিক কার্যকলাপ থেকে ভ্রষ্ট হয় , তখন সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেইসব স্থানের প্রতি বিমুখ হয়ে ওঠে , এবং পরিণামে জনসাধারণ ধীরে ধীরে ভগবদ্বিমুখ হয়ে পড়ে এবং তার ফলে ভগবদ্বিহীন সভ্যতার প্রকাশ হতে দেখা যায় । এই প্রকার নারকীয় সভ্যতা কৃত্রিমভাবে জীবনের বদ্ধ অবস্থা বর্ধিত করে এবং তখন সকলের পক্ষেই বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে । ভগবদ্বিহীন সমাজের মূর্খ নেতারা জড় বাদের নামে ঈশ্বর বিহীন জগতে শান্তি এবং সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করার নানা রকম পরিকল্পনা করে , কিন্তু তাদের সেই ভ্রমাত্মক পরিকল্পনা কখনো সার্থক হয় না । জনসাধারণ ভোট দিয়ে একের পর এক অযোগ্য অন্ধ নেতা নির্বাচন করে , যারা তাদের সমস্যার সমাধানে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম । আমরা যদি ভগবদ্বিহীন সভ্যতার এই অসঙ্গতি দূর করতে চাই , তা হলে আমাদের শ্রীমদ্ভাগবত আদি শাস্ত্রের নির্দেশ পালন করতে হবে এবং জড় বিষয়ে সম্পূর্ণ অনাসক্ত শ্রীল শুকদেব গোস্বামীর মতো মহাত্মার উপদেশ পালন করতে হবে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।