শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-৩, (শুদ্ধ ভক্তিঃ হৃদয়ের পরিবর্তন )

    শ্লোক: ১০
    অকামঃ সর্বকামো বা মোক্ষকাম উদারধীঃ
    তীব্রেণ ভক্তিযোগেন যজেত পুরুষং পরম্ ॥ ১০।।

  • অনুবাদ : ব্যক্তির বুদ্ধি উদার, তিনি সব রকম জড় কামনাযুক্তই হোন , অথবা সমস্ত জড় বাসনা থেকে মুক্তই হোন , অথবা জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভের প্রয়াসীই হোন, তাঁর কর্তব্য সৰ্বতোভাবে পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করা।
  • তাৎপর্যঃ- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে পুরুষোত্তম বলে বর্ণনা করা হয়েছে । তিনিই কেবল তার দেহনির্গত রশ্মিটা ব্ৰহ্মজ্যোতিতে নির্বিশেষবাণীদের আত্মসাৎ করে মুক্তিদান করতে পারেন । ব্রহ্মজ্যোতি ভগবানের থেকে ভিন্ন নয় , ঠিক যেমন সূর্যের উজ্জ্বল কিরণ সূর্যমণ্ডল থেকে স্বতন্ত্র নয় । তাই যিনি নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতিতে লীন হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষী , তারও কর্তব্য ভক্তিযোগের দ্বারা ভগবানের আরাধনা করা , যে কথা এখানে শ্রীমদ্ভাগবতে নির্দিষ্ট হয়েছে । এখানে সর্ব প্রকার সিদ্ধিলাভের উপায় স্বরূপ ভক্তিযোগের পন্থাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ।

        পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে কর্মযোগ এবং জ্ঞানযোগ উভয়েরই চরম লক্ষ্য হচ্ছে ভক্তিযোগ , তেমনই এই অধ্যায়ে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে যে ভক্তিযোগ হচ্ছে বিভিন্ন দেবতাদের বিভিন্ন প্রকার পূজার চরম লক্ষ্য । ভক্তিযোগকে এখানে আত্মোপলব্ধির চরম উপায় বলে বর্ণনা করা হয়েছে । তাই নিষ্ঠা সহকারে এই ভক্তিযোগের পন্থা অবলম্বন করা সকলেরই কর্তব্য । এমন কি যারা জড় সুখভোগের আকাঙ্ক্ষী অথবা জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষী , তাদেরও নিষ্ঠা সহকারে ভগবদ্ভক্তির এই পন্থা অবলম্বন করা কর্তব্য ।

        অকাম হচ্ছেন তিনি , যাঁর কোন জড় বাসনা নেই । পুরুষং পূর্ণং বা পূর্ণ পুরুষের বিভিন্ন অংশ হওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই জীবের প্রবৃত্তি হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করা , ঠিক যেমন দেহের বিভিন্ন অঙ্গগুলি স্বাভাবিকভাবে পূর্ণ দেহের সেবা করে । তাই কামনাশূন্য হওয়া মানে পাথরের মতো জড় হয়ে যাওয়া নয় , পক্ষান্তরে প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমেই কেবল সন্তুষ্ট হওয়ার বাসনা করা । শ্রীল জীব গোস্বামী তার সন্দর্ভে এই অকামভাবের ব্যাখ্যা করে বলেছেন , ভজনীয় পরম পুরুষ সুখমাত্র স্ব - সুখত্বম্ । অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবানের প্রসন্নতা অনুভব করে মানুষের প্রসন্ন হওয়া উচিত । জীবের এই স্বজ্ঞা বা স্বচেতনা ভৌতিক জগতে বদ্ধ অবস্থাতেও কখনো কখনো প্রকাশ পায় এবং এই স্বজ্ঞা অল্পজ্ঞ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবিকশিত চেতনায় পরার্থবাদ , পরোপকার , সমাজবাদ , সাম্যবাদ ইত্যাদি রূপে প্রকাশ পায় । জড়জাগতিক স্তরে সমাজ , জাতি , পরিবার , দেশ অথবা মানব সমাজের কল্যাণ সাধন করার যে প্রবৃত্তি , তা প্রকৃতপক্ষে পরমেশ্বর ভগবানের সস্তষ্টি বিধান করার মাধ্যমে জীবের তৃপ্তি লাভ করার প্রবণতারই আংশিক প্ৰকাশ।

        এই অপূর্ব অনুভূতি ভগবানের আনন্দ বিধান করার মাধ্যমে ব্রজবালারা প্রদর্শন করেছিলেন । কোন কিছু প্রত্যাশা না করেই গোপিকারা ভগবানকে ভালবেসেছিলেন , এবং অকামভাবের এটিই হচ্ছে আদর্শ দৃষ্টান্ত । কামভাব , বা নিজের সত্তষ্টি বিধানের বাসনা পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয় এই জড় জগতে , কিন্তু অকাম ভাব পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয় চিজ্জগতে ।

        ভগবানের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার বাসনা , বা ব্রহ্মজ্যোতিতে লীন হয়ে যাওয়ার বাসনা কামভাবেরই প্রকাশ , কেননা তা জড় জগতের দুঃখ - দুর্দশা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের সুখভোগের বাসনারই প্রকাশ । শুদ্ধভক্ত কখনো মুক্তি কামনা করেন না , যার ফলে তিনি জীবনের দুঃখ - দুর্দশা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারেন । তথাকথিত মুক্তি ব্যতীতই শুদ্ধ ভক্ত ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের অভিলাষ করেন । কামভাবের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অর্জুন কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে প্রথমে যুদ্ধ করতে অসম্মত হয়েছিলেন , কেননা তিনি যার নিজের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য তার আত্মীয় - স্বজনদের রক্ষা করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু ভগবানের শুদ্ধভক্ত হওয়ার ফলে তিনি তার মত পরিবর্তন করে ভগবানের নির্দেশ অনুসারে যুদ্ধ করতে সম্মত হয়েছিলেন , কেননা তিনি প্রকৃতিস্থ হয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে , নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টি বিধান করাই ছিল তার পরম কর্তব্য । এইভাবে তিনি অকাম হয়েছিলেন । সেইটিই হচ্ছে জীবের শুদ্ধ পরম অবস্থা ।

        উদারধীঃ শব্দটির অর্থ হচ্ছে যার দৃষ্টিভঙ্গী উদার । জড় সুখভোগের আকাঙ্ক্ষী মানুষেরা ক্ষুদ্র দেবতাদের পূজা করে , এবং সেই প্রকার বুদ্ধির নিন্দা করে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ( ৭/২০ ) তাদের হৃতজ্ঞান বলা হয়েছে , অর্থাৎ যার বিচার - বুদ্ধি হারিয়ে গেছে । পরমেশ্বর ভগবানের অনুমোদন ব্যতীত দেবতাদের কাছ থেকে কোন ফল লাভ করা যায় না । তাই উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মানুষ বুঝতে পারেন যে , পরমেশ্বর ভগবানই হচ্ছেন পরম নিয়ন্তা, এমন কি জড়জাগতিক লাভের জন্যও । তাই উদার দৃষ্টিভঙ্গী বা বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষদের কর্তব্য হচ্ছে সর্ব অবস্থাতেই , তা তিনি জড় সুখভোগের আকাঙ্ক্ষীই হোন অথবা মুক্তির আকাঙ্ক্ষীই হোন , সরাসরিভাবে পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করা । অকাম বা সকাম বা মোক্ষকাম , সকলেরই কর্তব্য হচ্ছে অচিরেই পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনায় যুক্ত হওয়া । এর অর্থ এই যে , যথাযথভাবে ভক্তিযোগের অনুশীলন করার জন্য কর্ম এবং জ্ঞানের মিশ্রণ থেকে মুক্ত হতে হবে । অবিমিশ্রিত সূর্যের কিরণ অত্যন্ত তীব্র , তেমনই অন্তরের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নিরপেক্ষ হয়ে সকলেই শ্রবণ , কীর্তন আদি অবিমিশ্রিত ভক্তিযোগ অনুশীলন করতে পারে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।