শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-৩, (শুদ্ধ ভক্তিঃ হৃদয়ের পরিবর্তন )

    শ্লোক: ১৪
    এতচ্ছুশ্রূষতাং বিদ্বন্ সূত নোহর্হসি ভাষিতুম্ ।
    কথা হরিকথোদর্কাঃ সতাং স্যুঃ সদসি ধ্রুবম্ ॥১৪॥

  • অনুবাদ : হে বিদ্বান সূত গোস্বামী! দয়া করে আপনি আমাদের বলুন তারপর কি হয়েছিল, কেননা আমরা তা শুনতে ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী । ভগবদ্ভক্তের সভায় যে কথা হয় তা নিশ্চয়ই হরিকথা ব্যতীত আর কিছু হতে পারে না ।
  • তাৎপর্যঃ- আমরা পূর্বে শ্রীল রূপ গোস্বামীর ভক্তিরসামৃত-সিন্ধু গ্রন্থ থেকে উল্লেখ করেছি যে, জড় বস্তুও যদি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিয়োগ করা হয়, তা হলে তা অপ্রাকৃত বস্তুতে পর্যবসিত হয় । যেমন, মহাকাব্য বা রামায়ণ এবং মহাভারতের ইতিহাস, যা অল্পজ্ঞ ব্যক্তিদের জন্য (স্ত্রী, শূদ্র এবং দ্বিজবন্ধুদের) জন্য রচিত হয়েছিল, তাও বৈদিক শাস্ত্র বলে স্বীকার করা হয়, কেননা তাতে ভগবানের কার্যকলাপ বর্ণিত হয়েছে । মহাভারতকে বলা হয় পঞ্চম বেদ । অন্য চারটি বেদ হচ্ছে সাম, যজুঃ, এবং অথর্ব। অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা মহাভারতকে বেদের অংশ বলে স্বীকার করে না, কিন্তু মহর্ষিরা এবং মহাজনেরা তাকে পঞ্চম বেদ বলে স্বীকার করেছেন । শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মহাভারতের অংশ এবং তাতে অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের জন্য ভগবানের পূর্ণ নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা বলতে পারে যে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা গৃহস্থদের জন্য নয়, কিন্তু সেই সমস্ত মূর্খ মানুষেরা ভেবে দেখে না যে, এই গ্রন্থটি গৃহস্থ লীলাবিলাসকারী ভগবান গৃহস্থ অর্জুনকে বিশ্লেষণ করেছিলেন । তাই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, যদিও বৈদিক জ্ঞানের সর্বোচ্চ দর্শন বিশ্লেষণ করেছে, তা হচ্ছে অপ্রাকৃত বিজ্ঞানের নবীন অধ্যয়নকারীদের জন্য । আর শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে সেই বিজ্ঞানের স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণীর অধ্যয়নকারীদের জন্য । তাই মহাভারত, পুরাণ এবং অন্যান্য যে সমস্ত গ্রন্থে ভগবানের লীলা পূর্ণরূপে বর্ণিত হয়েছে, তা সবই অপ্রাকৃত শাস্ত্র, এবং পূর্ণ শ্রদ্ধা সহকারে মহান ভক্তদের সভায় তা আলোচনা করা উচিত ।

        এই বিষয়ে সবচাইতে অসুবিধা হল এই যে, এই সমস্ত শাস্ত্র যখন পেশাদারী পাঠকেরা পাঠ করে, তখন তা জাগতিক ইতিহাস বলে মনে হয়, কেননা তাতে বহু ঐতিহাসিক তত্ত্ব রয়েছে । তাই এখানে বলা হয়েছে যে, এই সমস্ত শাস্ত্র ভক্তদের সভায় আলোচনা করা উচিত । ভক্তদের সভায় যদি তা আলোচনা না করা হয়, তা হলে উচ্চস্তরের মানুষেরা তার স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন না ।

        অতএব চরম সিদ্ধান্ত হচ্ছে এই যে, পরমেশ্বর ভগবান নির্বিশেষ বা নিরাকার নন । তিনি হচ্ছেন পরম পুরুষ, এবং তাঁর বিভিন্ন লীলা রয়েছে । তিনি হচ্ছেন সমস্ত জীবের পরম গুরু এবং তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর আত্মমায়ার প্রভাবে এই জগতে অবতরণ করেন বদ্ধ জীবদের উদ্ধার করার জন্য । তার ফলে তিনি ঠিক একজন সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নেতার মতো আচরণ করেন । যেহেতু এই সমস্ত বিষয়ের আলোচনা চরমে ভগবানের কথায় পর্যবসিত হয়, তাই সেই সমস্ত বিষয়ের প্রাথমিক আলোচনাগুলিও অপ্রাকৃত । মানব সমাজের সামাজিক কার্যকলাপকে পারমার্থিক স্তরে পর্যবসিত করার এইটিই হচ্ছে পন্থা ।

        ইতিহাস, গল্প, উপন্যাস, নাটক, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদি পাঠ করার স্বাভাবিক প্রবণতা মানুষের রয়েছে । তাই যদি এই প্রবণতাকে ভগবানের সেবায় রূপান্তরিত করা হয়, তা হলে সেগুলি ভগবানের ভক্তদের আস্বাদ্য বিষয়ে পর্যবসিত হবে ।

        নির্বিশেষবাদের অপপ্রচারের ফলে মানুষ নাস্তিক এবং শ্রদ্ধাহীন অসুরে পরিণত হচ্ছে ; সকলকে শেখানো হচ্ছে যে, ভগবান নিরাকার, তার কোন কার্যকলাপ নেই এবং তিনি নাম-রূপ বিহীন একটি জড় পাথর মাত্র । মানুষ যতই ভগবানের লীলার বিমুখ হয়, ততই তারা বৈষয়িক কার্যকলাপে লিপ্ত হয় । তার ফলে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে তাদের নরকে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হয় ।

        শ্রীমদ্ভাগবতের শুরু হচ্ছে ( প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক এবং সামাজিক কার্যকলাপ সমন্বিত ) পাণ্ডবদের ইতিহাস থেকে, কিন্তু তা সত্ত্বেও শ্রীমদ্ভাগবতকে বলা হয় পরমহংস-সংহিতা, বা সর্বোচ্চ স্তরের মহাত্মাদের জন্য বৈদিক শাস্ত্র, এবং তাতে পরম জ্ঞান বা সর্বোচ্চ স্তরের পারমার্থিক জ্ঞান বর্ণিত হয়েছে । ভগবানের শুদ্ধ ভক্তেরা সকলেই পরমহংস এবং হংসেরা যেমন জল থেকে দুধ আলাদা করে পান করতে পারে, তাঁরাও সেই রকম সদস্যদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে সক্ষম ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।