শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-৩, (শুদ্ধ ভক্তিঃ হৃদয়ের পরিবর্তন )

    শ্লোক: ১৮
    তরবঃ কিং ন জীবন্তি ভস্ত্রাঃ কিং ন শ্বসন্ত্যুত।
    ন খাদন্তি ন মেহন্তি কিং গ্রামে পশবোঽপরে ॥ ১৮ ॥

  • অনুবাদ : বৃক্ষসমূহ কি বেঁচে থাকে না ? কামারের হাপর কি শ্বাসগ্রহণ ও পরিত্যাগ করে না ? আমাদের চতুর্দিকে পশুরা কি আহার ও স্ত্রী সম্ভোগ করে না ?
  • তাৎপর্যঃ- আধুনিক যুগের জড়বাদীরা তর্ক করবে যে, জীবন বা জীবনের একটি অংশেরও উদ্দেশ্য অধ্যাত্মবিদ্যা বা ধর্মশাস্ত্র বিষয়ক আলোচনার জন্য নয় । তাদের মতে, জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আহার, পান, স্ত্রী সম্ভোগের মাধ্যমে জীবন উপভোগ করার জন্য দীর্ঘায়ু লাভ করা । আধুনিক যুগের মানুষেরা জড়-বিজ্ঞানের প্রগতির মাধ্যমে চিরকাল বেঁচে থাকতে চায় । দীর্ঘতম আয়ু লাভ করার জন্য তাদের অনেক মূর্খতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত রয়েছে । কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবতে প্রতিপন্ন হয়েছে যে, আহার, স্ত্রী সম্ভোগ, আসব পান এবং মজা উপভোগ করার ভোগবাদী দর্শনের চরিতার্থতা সাধনের জন্য তথাকথিত অর্থনৈতিক উন্নতি অথবা জড় বিজ্ঞানের প্রগতি জীবনের উদ্দেশ্য নয় । জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে জড় কলুষ থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র হওয়ার জন্য তপস্যা করা, যাতে এই জীবনের অন্তে শাশ্বত জীবনে প্রবেশ করা যায় ।

        জড়বাদীরা দীর্ঘায়ু লাভ করতে চায়, কেননা পরবর্তী জীবন সম্বন্ধে তারা কিছুই জানে না । এই জীবনে তারা যতদূর সম্ভব সুখ-সুবিধা লাভ করতে চায়, কেননা তারা মনে করে যে, মৃত্যুর পর আর জীবন নেই । মানবের নিত্য অস্তিত্ব সম্বন্ধে অজ্ঞতা এবং জড়দেহের পরিবর্তন সম্বন্ধে অজ্ঞতা আধুনিক মানব সমাজে এক প্রচণ্ড উৎপাত সৃষ্টি করেছে । তার ফলে বহু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, এবং আধুনিক মানুষের পরিকল্পনাগুলি যত বাড়ছে সেই সমস্ত সমস্যাগুলিও সেই পরিমাণে বাড়ছে । সমস্যাগুলির সমাধানের পরিকল্পনা সমস্যাগুলি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে । মানুষ যদি একশ বছরেরও অধিক আয়ু লাভ করে, তার অর্থ এই নয় যে, তার ফলে মানব সভ্যতার বিকাশ হবে । শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে যে, কিছু বৃক্ষ আছে যেগুলি শত সহস্র বছর বেঁচে থাকে । বৃন্দাবনে ( ইমলিতলা নামক স্থানে ) একটি তেঁতুল গাছ আছে, যা শ্রীকৃষ্ণের লীলা-বিলাসকালে বর্তমান ছিল । কলকাতায় বোটানিকাল গার্ডেনে একটি বটগাছ আছে, যার বয়স পাঁচশ বছরেরও অধিক । পৃথিবীর সর্বত্রই এ রকম বহু বৃক্ষ রয়েছে । অপর পক্ষে আমরা দেখতে পাই, শঙ্করাচার্য প্রকট ছিলেন কেবল বত্রিশ বছরের জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রকট ছিলেন কেবল আটচল্লিশ বছর । তার অর্থ কি এই যে, উপরোক্ত বৃক্ষগুলি শঙ্করাচার্য বা চৈতন্য মহাপ্রভুর থেকে অধিক মাহাত্ম্যপূর্ণ ? আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য ব্যতীত দীর্ঘ জীবনের কোন গুরুত্ব নেই ।

        অনেকে সন্দেহ পোষণ করে যে, গাছ-পালা যেহেতু শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে না, তাই তাদের প্রাণ নেই । কিন্তু জগদীশ বসু প্রমুখ আধুনিক বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন যে গাছ-পালারও জীবন আছে । অতএব শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করাটাই জীবনের প্রকৃত লক্ষণ নয় । শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে যে কামারের হাপর খুব ভালভাবে শ্বাস গ্রহণ ও পরিত্যাগ করে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, হাপরের জীবন আছে । জড়বাদীরা তর্ক করবে যে, মানুষের জীবনের সঙ্গে বৃক্ষের জীবনের তুলনা করা চলে না, কেননা বৃক্ষ সুস্বাদু খাদ্য আহার করে অথবা মৈথুন সুখের মাধ্যমে তাদের জীবন উপভোগ করতে পারে না । তার পরিপ্রেক্ষিতে শ্রীমদ্ভাগবত প্রশ্ন করছে, কুকুর, শূকর ইত্যাদি পশুরা কি মানুষদের সঙ্গে এক গ্রামে থেকে আহার এবং মৈথুন সুখ উপভোগ করে না ? শ্রীমদ্ভাগবত এই সম্পর্কে “ অন্যান্য পশুরা ” —এই বিশেষ শব্দ দুটি উল্লেখ করেছে, অর্থাৎ যে সমস্ত মানুষেরা কেবল আহার, শ্বাস গ্রহণ এবং মৈথুনের পরিকল্পনা করে জীবন যাপন করে, তারা প্রকৃতপক্ষে মনুষ্যরূপী পশু মাত্র এই প্রকার চাকচিক্যপূর্ণ পশুরা দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত মানব সমাজের কোন উপকার করতে পারে না । কারণ— পশুরা অনায়াসে অন্য পশুদের ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু সাধারণত কোন উপকার করতে পারে না ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।