শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-৩, (শুদ্ধ ভক্তিঃ হৃদয়ের পরিবর্তন )

    শ্লোক: ২২
    বৰ্হায়িতে নয়নে নরাণাং
    লিঙ্গানি বিষ্ণোর্ন নিরীক্ষতো যে ।
    পাদৌ নৃণাং তৌ দ্রুমজন্মভাজৌ
    ক্ষেত্রাণি নানুব্রজতো হরের্যৌ ॥ ২২ ॥

  • অনুবাদ : যে নয়ন গ্রীবিষ্ণুর শ্রীবিগ্রহ দর্শন করে না তা ময়ূর পুচ্ছে অঙ্কিত চক্ষুর মতো, এবং যে পদ পরমেশ্বর ভগবানের লীলাভূমি বা তীর্থসমূহে বিচরণ করে না তা বৃক্ষের মতো স্থাবর ।
  • তাৎপর্যঃ- বিশেষ করে গৃহস্থ ভক্তদের জন্য অর্চা-বিগ্রহের পূজা করার পন্থা অনুমোদন করা হয়েছে । যতদূর সম্ভব প্রতিটি গৃহস্থের কর্তব্য শ্রীগুরুদেবের নির্দেশ অনুসারে শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ, লক্ষ্মী-নারায়ণ অথবা সীতা-রামের, অথবা নৃসিংহ, বরাহ, গৌর-নিতাই, মৎস্য, কূর্ম, শালগ্রাম বা বিষ্ণুর ত্রিবিক্রম, কেশব, অচ্যুত, বাসুদেব, নারায়ণ, দামোদর আদি বৈষ্ণব-তন্ত্র বা পুরাণে বর্ণিত ভগবানের শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে নিষ্ঠা সহকারে অৰ্চন-বিধি পালনপূর্বক সপরিবারে সেই বিগ্রহের পূজা করা। বার বছর বা বেশি বয়ঃপ্রাপ্ত পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সদ্গুরু কর্তৃক দীক্ষিত হওয়া উচিত, এবং ভোর চারটা থেকে শুরু করে রাত দশটা পর্যন্ত মঙ্গল-আরাত্রিক, নিরঞ্জন, অৰ্চন, পূজা, কীর্তন, শৃঙ্গার, বৈকালিক-ভোগ, সন্ধ্যা-আরাত্রিক, পাঠ, সান্ধ্য-ভোগ, শয়ন-আরাত্রিক ইত্যাদি ভগবানের দৈনন্দিন সেবায় যুক্ত হওয়া উচিত। সদ্গুরুর নির্দেশনায় এইভাবে ভগবানের অর্চা-বিগ্রহের আরাধনায় যুক্ত হওয়ার ফলে গৃহস্থ ভক্ত অনায়াসে পবিত্র হতে পারবে এবং অতি দ্রুত পারমার্থিক উন্নতি সাধন করবে । পুঁথিগত জ্ঞান কেবল ধারণাগত, কিন্তু অর্চনের পন্থা ব্যবহারিক ধারণাগত এবং ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয়ের মাধ্যমে পারমার্থিক উন্নতি সাধিত হয়। কনিষ্ঠ ভক্তের ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে সুদক্ষ গুরুর উপর, যিনি জানেন কিভাবে তাঁর শিষ্যকে ধীরে ধীরে তাঁর প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হয় । পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য অর্থ উপার্জনের মানসে কপটতাপূর্বক গুরুগিরি করা উচিত নয় ; পক্ষান্তরে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে শিষ্যকে উদ্ধার করার জন্য গুরু হওয়ার গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত । সদ্গুরুর গুণাবলী বর্ণনা করে শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর তার গুর্বাষ্টক রচনা করেন । তার একটি শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে—
    শ্রীবিগ্রহারাধন-নিত্য-নানা
    শৃঙ্গার-তন্মন্দির-মার্জনাদৌ।
    যুক্তস্য ভক্তাংশ্চ নিযুঞ্জতোঽপি
    বন্দে গুরোঃ শ্রীচরণারবিন্দম্ ॥

    শ্রীবিগ্রহ হচ্ছেন ভগবানের পুজনীয় অর্চাবিগ্রহ এবং শিষ্যের কর্তব্য হচ্ছে নিয়মিতভাবে সেই বিগ্রহকে শৃঙ্গার করার মাধ্যমে, মন্দির মার্জন করার মাধ্যমে তাঁর আরাধনায় যুক্ত হওয়া । সদ্গুরু কৃপা করে নবীন ভক্তকে স্বয়ং এই সমস্ত বিষয় শিক্ষা দেন এবং ভগবানের দিব্য নাম, গুণ, রূপ ইত্যাদি উপলব্ধি করতে সাহায্য করেন ।

        কেবল নিষ্ঠা সহকারে ভগবানের সেবায় যুক্ত হওয়ার ফলে, বিশেষ করে ভগবানের শৃঙ্গার মন্দির সজ্জা, কীর্তন এবং শাস্ত্র গ্রন্থ পাঠ করার মাধ্যমে পারমার্থিক উপদেশ অর্জনপূর্বক নিয়মিতভাবে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করার ফলে সাধারণ মানুষ নারকীয় সিনেমার আকর্ষণ এবং বেতারে পরিবেশিত জঘন্য আধুনিক গানের আকর্ষণ থেকে রক্ষা পেতে পারে । কেউ যদি বাড়িতে মন্দির প্রতিষ্ঠা না করতে পারে, তা হলে তার উচিত যে সমস্ত মন্দিরে নিয়মিতভাবে উপরোক্ত অনুষ্ঠানগুলি পালন করা হয় সেখানে যাওয়া । মন্দিরে গিয়ে পবিত্র পরিবেশে সুন্দর শৃঙ্গারে সজ্জিত ভগবানের শ্রীবিগ্রহ দর্শন করার ফলে বিষয়াসক্ত মন স্বাভাবিক ভাবেই চিন্ময় চেতনায় অনুপ্রাণিত হবে । মানুষের কর্তব্য বৃন্দাবন আদি ধামে যাওয়া যেখানে এই রকম মন্দিরে বিশেষভাবে ভগবানের শ্রীবিগ্রহের আরাধনা হয় । পুরাকালে রাজা-মহারাজা এবং ধনী বণিকেরা ষড় গোস্বামীর মতো ভগবানের সুদক্ষ ভক্তদের নির্দেশনায় এই প্রকার মন্দির নির্মাণ করতেন । সাধারণ মানুষের কর্তব্য হচ্ছে মহান ভক্তদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ( অনুব্রজ ) পবিত্র ধামে তীর্থ করতে গিয়ে এই সমস্ত মন্দিরে এবং সেখানে অনুষ্ঠিত মহোৎসবে যোগদান করার মাধ্যমে সেই সুযোগের যথার্থ সদ্বব্যবহার করা । এই সমস্ত পবিত্র তীর্থে কেবল ভ্রমণের মনোভাব নিয়ে যাওয়া উচিত নয়, পক্ষান্তরে ভগবানের দিব্য লীলা অনুষ্ঠানের ফলে অমর হয়ে রয়েছে বলে জেনে এবং ভগবত্তত্ব ব্যক্তির নির্দেশনায় এই সমস্ত স্থান দর্শন করতে হয় । তাকে বলা হয় অনুব্রজ । অনু মানে অনুসরণ করা । তাই শ্রেষ্ঠ পন্থা হচ্ছে সদ্গুরুর নির্দেশ অনুসরণ করা, এমন কি মন্দির দর্শন এবং তীর্থপর্যটনের ক্ষেত্রেও । যে ব্যক্তি এইভাবে বিচরণ না করে, সে একটি জড় বৃক্ষের মতো, যাকে ভগবান চলচ্ছক্তির ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেছেন । কেবল প্রাকৃত দৃশ্য দর্শন করার জন্য ভ্রমণ করা হলে মানুষের চলচ্ছক্তির অপব্যবহার হয় । ভ্রমণের প্রবণতার সবচাইতে সুন্দর সদ্ব্যবহার হয় মহান্ আচার্যদের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন পবিত্র স্থান ভ্রমণের ফলে, এবং তা হলে পারমার্থিক জ্ঞান রহিত ধন উপার্জনের আকাঙ্ক্ষী নাস্তিকদের অপপ্রচারের দ্বারা বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।