শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-৩, (শুদ্ধ ভক্তিঃ হৃদয়ের পরিবর্তন )

    শ্লোক: ২৩
    জীবঞ্ছবো ভাগবতাঙ্ ঘ্রিরেণুং
    ন জাতু মর্ত্যোঽভিলভেত যস্তু।
    শ্রীবিষ্ণুপদ্যা মনুজস্তুলস্যাঃ
    শ্বসঞ্জবো যস্তু ন বেদ গন্ধম্ ৷৷ ২৩ ৷৷

  • অনুবাদ : যে ব্যক্তি কখনো তার মস্তকে ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের চরণরেণু ধারণ করেনি, সে জীবিত থাকলেও তার দেহটি মৃত । আর যে ব্যক্তি ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের তুলসীদলের সুগন্ধ আঘ্রাণ করেনি, সে শ্বাস গ্রহণ করলেও তার দেহটি মৃত ।
  • তাৎপর্যঃ- শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুরের মতে যে মৃতদেহ শ্বাস গ্রহণ করে তা হচ্ছে প্রেতাত্মা । কেউ যখন দেহত্যাগ করে, তখন তাকে বলা হয় মৃত, কিন্তু সে যদি পুনরায় আমাদের দৃষ্টির অগোচরে সূক্ষ্মদেহে আবির্ভূত হয় এবং নানারকম কার্যকলাপ করতে থাকে, তখন তাকে বলা হয় প্রেতাত্মা । ভূত বা প্রেতেরা অত্যন্ত খারাপ বস্তু, এবং তারা সর্বদাই ভীতিজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে । তেমনই, ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত এবং মন্দিরে বিষ্ণু-বিগ্রহের প্রতি শ্রদ্ধাহীন প্রেতবৎ অভক্তেরা সর্বদাই ভক্তদের জন্য ভীতিজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করে । এই প্রকার অপবিত্র প্রেতাত্মাদের নিবেদন ভগবান কখনো গ্রহণ করেন না । একটি প্রবাদ আছে যে, প্রিয়তমার প্রতি প্রেমভাব প্রদর্শন করার পূর্বে তার কুকুরের প্রতি প্রেম প্রদর্শন করতে হয়। নিষ্ঠা সহকারে ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের সেবা করার ফলে শুদ্ধ ভক্তির স্তর প্রাপ্ত হওয়া যায়। তাই ভগবদ্ভক্তির প্রথম শর্ত হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তের সেবক হওয়া এবং তার সার্থকতা ব্যক্ত করে বলা হয়, “শুদ্ধ ভক্তের সেবা করেছেন যে শুদ্ধ ভক্ত তাঁর চরণরেণু গ্রহণ করা।” সেইটিই হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তের পরম্পরা।

        মহারাজ রহুগণ মহাভাগবত জড়ভরতকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, কিভাবে তিনি পরমহংসের মুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছিলেন, এবং তার উত্তরে সেই মহাত্মা বলেছিলেন—
    রহূগণৈতত্তপসা ন যাতি
    ন চেজ্যয়া নির্বপনাদ গৃহাদ্বা
    নচ্ছন্দসা নৈব জলাগ্নি সূর্য়ৈর
    বিনা মহৎ পাদরজোঽভিষেসম্॥ ২৩ ॥ ( ভাঃ ৫/১২/১২ )
    “ হে মহারাজ রহুগণ, মহান ভগবদ্ভক্তের পদরজের দ্বারা অভিষিক্ত না হলে শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তির স্তর বা পরমহংস স্তর লাভ করা যায় না । তপস্যা, বৈদিক প্রথায় পূজা-অৰ্চনা, সন্ন্যাস গ্রহণ, গৃহস্থ আশ্রমের কর্তব্য পালন, বৈদিক মন্ত্র পাঠ, অথবা প্রচণ্ড সূর্য কিরণে বা শীতল জলের ভিতর অথবা জ্বলন্ত অগ্নির সম্মুখে কৃষ্ণসাধন করার মাধ্যমে তা লাভ করা যায় না । ”

        পক্ষান্তরে বলা যায় যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন তাঁর শুদ্ধ ভক্তের সম্পত্তি, এবং শুদ্ধ ভক্তই কেবল অন্য ভক্তদের সেই শ্রীকৃষ্ণকে দিতে পারেন । কৃষ্ণকে কখনো সরাসরিভাবে পাওয়া যায় না । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাই গোপীভর্তুঃ পদকময়োর্দাসদাসানুদাসঃ বা “ ব্রজগোপিকাদের পালনকর্তা শ্রীকৃষ্ণের দাসের অনুদাসের দাস ” বলে নিজের পরিচয় দিয়েছেন । ভগবানের শুদ্ধভক্ত তাই কখনো সরাসরিভাবে ভগবানের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন না, পক্ষান্তরে তিনি ভগবানের দাসের অনুদাসের সন্তুষ্টিবিধান করার চেষ্টা করেন, এবং তার ফলে ভগবান তাঁর প্রতি প্রসন্ন হন, এবং তখনই কেবল ভক্ত ভগবানের শ্রীচরণের তুলসীদলের সুগন্ধ আম্রাণ করে আনন্দিত হন । ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছে যে, বৈদিক শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করার মাধ্যমে ভগবানকে পাওয়া যায় না, কিন্তু তাঁর শুদ্ধ ভক্তের মাধ্যমে— তাঁর কাছে যাওয়া যায় । বৃন্দাবনে সমস্ত শুদ্ধ ভক্তেরা শ্রীকৃষ্ণের আনন্দদায়িনী শক্তি শ্রীমতী রাধারাণীর কৃপাভিক্ষা করেন । শ্রীমতী রাধারাণী হচ্ছেন পরম পূর্ণ শ্রীকৃষ্ণের কোমলহৃদয়া অর্ধাঙ্গিনী । তিনি সারা জগতের স্ত্রীরূপা প্রকৃতির সিদ্ধ অবস্থার অনুরূপা । তাই নিষ্ঠাপরায়ণ ভক্ত অনায়াসে শ্রীমতী রাধারাণীর কৃপা লাভ করতে পারেন, এবং তিনি যদি একবার শ্রীকৃষ্ণের কাছে সেই ভক্তের জন্য অনুমোদন করেন, শ্রীকৃষ্ণ তৎক্ষণাৎ তাকে তাঁর সঙ্গী করে নেন । তাই যথার্থ সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে, সরাসরিভাবে ভগবানের কাছে যাওয়ার চেষ্টা না করে ভগবদ্ভক্তের কৃপা লাভের জন্য ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী হতে হয়, এবং তার ফলে ( ভগবানের ভক্তের শুভেচ্ছার প্রভাবে ) ভগবানের সেবা করার প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ পুনরায় জাগরিত হবে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।