শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ২৭
    ন যত্র শোকো ন জরা ন মৃত্যু
    র্নার্তিন চোদ্বেগ ঋতে কুতশ্চিত ।
    যচ্ছিত্ততোঽদঃ কৃপয়ানিদংবিদং
    দুরন্তদুঃখপ্রভবানুদর্শনাৎ ॥ ২৭ ॥

  • অনুবাদ : সত্যলোকে শোক , জরা , মৃত্যু , দুঃখ , উদ্বেগ এই সমস্ত কিছুই নেই , কেবল চেতনা জনিত এক প্রকার দুঃখ রয়েছে । সেই দুঃখের কারণ এই যে , ভগবদ্ভক্তি সম্বন্ধে অজ্ঞ জড় জগতের বদ্ধ জীবদের অশেষ দুঃখ দর্শন করে তাদের প্রতি তাদের করুণার উদ্রেক হয় ।
  • তাৎপর্যঃ- জড় বিষয়াসক্ত মূর্খ মানুষেরা প্রামাণিক জ্ঞানের সদ্ব্যবহার করতে পারে না । বৈদিক জ্ঞান প্রামাণিক এবং তা পরীক্ষা - নিরীক্ষার মাধ্যমে অর্জন হয় না , পক্ষান্তরে তা মহাজন কর্তৃক প্রদত্ত বৈদিক শাস্ত্রের প্রামাণিক নির্দেশ কেবল পুঁথিগত পাণ্ডিত্য অর্জন করার মাধ্যমে বেদের নির্দেশ উপলব্ধি করা যায় না , তা লাভ করতে হয় গুরু - পরম্পরার ধারায় বৈদিক জ্ঞান লাভ করেছেন যে তত্ত্বদ্রষ্টা পুরুষ তার শরণাগত হওয়ার মাধ্যমে , যে কথা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ( ৪/২ ) স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রতিপন্ন করেছেন যে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় তিনি যে জ্ঞান দান করেছেন তা পুর্বে তিনি সূর্যদেব বিবস্বানকে দান করেছিলেন , এবং বিবস্বান তার পুত্র মনুকে সেই জ্ঞান দান করেন এবং মনু মহারাজ ইক্ষ্বাকুকে ( শ্রীরামচন্দ্রের পূর্ব পুরুষ ) সেই জ্ঞান দান করেন । এইভাবে মহর্ষিদের মাধ্যমে পরম্পরা ধারায় সেই জ্ঞান প্রবাহিত হয়েছে । কিন্তু কাল - প্রভাবে সেই পরম্পরা ছিন্ন হয় , এবং তাই সেই জ্ঞানের প্রকৃত মর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য ভগবান তা পুনরায় অর্জুনের কাছে বিশ্লেষণ করেছিলেন , কেননা ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত হওয়ার ফলে অর্জুন ছিলেন সেই জ্ঞান লাভের উপযুক্ত পাত্র । শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মর্মার্থ অর্জুন যেভাবে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন তা ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শ্লোকে বর্ণিত হয়েছে , কিন্তু মূর্খ মানুষেরা অর্জুনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভগবদ্গীতার মমার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে চায় না । পক্ষান্তরে তারা তাদের মনগড়া অর্থ বিশ্লেষণ করে , যা তাদের মূর্খতারই পরিচায়ক , এবং তার ফলে প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার পথে সেগুলি এক - একটি বিরাট প্রতিবন্ধকস্বরূপ হয়ে দাড়ায় । এইভাবে তারা তাদের অনুসরণকারীদের , যারা হচ্ছে অল্প বুদ্ধিসম্পন্ন বা শুদ্র , তাদের বিপথগামী করে । শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে বৈদিক জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করতে হলে সর্ব প্রথমে ব্রাহ্মণ হতে হবে । যেমন আইন পরীক্ষায় পাশ করে উপযুক্ত যোগ্যতা অর্জন না করা পর্যন্ত কেউ আইনজ্ঞ হতে পারে না , ঠিক তেমনি ব্রাহ্মণোচিত গুণাবলী অর্জন না করে বৈদিক তত্ত্বজ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করা যায় না । এই প্রকার কঠোরতা পারমার্থিক জীবনে অগ্রসর হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার জন্য নয় , পক্ষান্তরে এই বিশেষ জ্ঞানটি যাতে অযোগ্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে কলুষিত না হয় সেই জন্য । যারা গুণগতভাবে ব্রাহ্মণ নয় তারা বৈদিক জ্ঞানের কদর্থ করে । প্রকৃত ব্রাহ্মণ হচ্ছেন তিনি , যিনি সদ্গুরুর নির্দেশনায় যথাযথ ভাবে পারমার্থিক শিক্ষা লাভ করেছেন ।

        বৈদিক জ্ঞান পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হৃদয়ঙ্গম করতে এবং আমাদের প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার পথে আমাদের পরিচালিত করে । কিন্তু জড় বিষয়াসক্ত মানুষেরা তা বুঝতে পারে না । তারা এমন একটি স্থানে সুখী হওয়ার পরিকল্পনা করে , যেখানে কোনরকম সুখ নেই । সুখ ভোগের ভ্রান্ত প্রচেষ্টায় তারা বৈদিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অথবা অন্তরীক্ষযানের সাহায্যে অন্যান্য গ্রহে যাওয়ার চেষ্টা করে , কিন্তু তাদের নিশ্চিতভাবে জেনে রাখা উচিত যে , দুঃখের আলয়ে সুখভোগের জন্য যতই চেষ্টা করা হোক না কেন , তাদের সে সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে । কেননা চরমে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড সমস্ত উপকরণসহ একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে । তখন জড়বাদীদের সুখভোগের সমস্ত পরিকল্পনা স্বাভাবিকভাবেই শেষ হয়ে যাবে । তাই বুদ্ধিমান মানুষেরা স্বীয় আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন । এই প্রকার বুদ্ধিমান মানুষেরা জন্ম - মৃত্যু - জরা - ব্যাধি সমন্বিত জড় জগতের সব রকম দুঃখ অতিক্রম করেন । প্রকৃতপক্ষে তিনি সুখী , কেননা , তার কোন রকম জড়জাগতিক উদ্বেগ নেই । কিন্তু সমস্ত জীবের প্রতি তাঁর ঐকান্তিক করুণা এবং সহানুভূতির ফলে বিষয়াসক্ত মানুষদের দুঃখ - দুর্দশা দেখে তিনি দুঃখ অনুভব করেন এবং তাই ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে সেই সমস্ত বিষয়াসক্ত মানুষদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তারা এখানে আসেন । সমস্ত আচার্যেরা ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার শিক্ষা প্রচার করেন , এবং তারা সাধারণ মানুষদের এই বলে সতর্ক করে দেন যে , এই দুঃখের আলয়ে , যেখানে সুখ কেবল আকাশ কুসুম মাত্র , সেখানে সুখী হওয়ার ভ্রান্ত পরিকল্পনা না করতে।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।