শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ৩১
    তেনাত্মনাত্মানমুপৈতি শান্ত—
    মানন্দমানন্দময়োঽবসানো ।
    এতাং গতিং ভাগবতীং গতো যঃ
    স বৈ পুনর্নেহ বিষজ্জতেঽঙ্গ ৷৷ ৩১ ৷৷

  • অনুবাদ : সম্পূর্ণরূপে যিনি পবিত্র হয়েছেন , কেবল তিনিই তার স্বরূপ প্রাপ্ত হয়ে পূর্ণ আনন্দ এবং তৃপ্তির সঙ্গে পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গলাভ করতে পারেন । যিনি ভগবদ্ভক্তির এই পুর্ণতার স্তর লাভ করেছেন , তিনি আর কখনও এই জড় জগতের প্রতি আকৃষ্ট হন না এবং এখানে ফিরে আসেন না ।
  • তাৎপর্যঃ- এই শ্লোকে গতিং ভাগবতীম্ শব্দটির বর্ণনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । পরমব্রহ্ম পরমেশ্বর ভগবানের দেহ নির্গত রশ্মিতে লীন হয়ে যাওয়ার যে বাসনা নির্বিশেষ ব্রহ্মবাদীরা করে , তা ভাগবতী সিদ্ধি বা পূর্ণতা নয় । ভাগবতেরা কখনোই ভগবানের নির্বিশেষ রশ্মিচ্ছটায় লীন হয়ে যেতে চান না , পক্ষান্তরে তারা সর্বদা চিজ্জগতে বৈকুণ্ঠলোকে পরমেশ্বর ভগবানের ব্যক্তিগত সান্নিধ্যলাভের আকাঙ্ক্ষা করেন । সমগ্র চিদাকাশ , যার একটি নগণ্য অংশ হচ্ছে এই জড় জগৎ , তা অগণিত বৈকুণ্ঠলোকে পূর্ণ , এবং ভগবদ্ভুক্ত বা ভাগবতদের চরম লক্ষ্য হচ্ছে কোন এক বৈকুণ্ঠলোকে , যেখানে পরমেশ্বর ভগবান অনস্তরূপে নিজেকে বিস্তার করে তার অস্তহীন শুদ্ধ ভক্তদের সঙ্গে নিত্যলীলা আস্বাদন করেন , সেখানে প্রবেশ করা । জড় জগতে বদ্ধজীবেরা ভগবদ্ভক্তির প্রভাবে জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার পর এই সমস্ত লোকে উন্নীত হন । কিন্তু নিত্যযুক্ত জীবেদের সংখ্যা এই জড় জগতের বন্ধ জীবেদের থেকে অনেক অনেক গুণ বেশি , এবং বৈকুণ্ঠলোকের নিত্যমুক্ত জীবেরা এই দুর্দশাগ্রস্ত জড় জগতে কখনো আসতে চান না।

        যে সমস্ত নির্বিশেষবাদীর চিজ্জগতে পরমেশ্বর ভগবানের প্রেমময়ী সেবা সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই , এবং যারা পরমেশ্বর ভগবানের নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতিতে লীন হয়ে যাওয়ার বাসনা করে , তাদের নদীর মাছের সঙ্গে তুলনা করা যায় নদীর মাছ কখনো কখনো মহাসাগরে গেলেও সেখানে দীর্ঘকাল থাকতে চায় না , তাদের ইন্দ্রিয় - তৃপ্তির বাসনা পুনরায় তাদের নদীতে ফিরিয়ে আনে । তেমনই , জড় বিষয়াসক্ত মানুষেরা যখন ইন্দ্রিয় তৃপ্তি সাধনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয় , তখন তাদের নৈরাশ্যের বশে তারা কখনো কখনো কারণ সমুদ্রে অথবা নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতিতে লীন হয়ে গিয়ে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষা করে । কিন্তু , কারণ সমুদ্র এবং নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতি যেহেতু ইপ্রিয় - তৃপ্তি সাধনের কোন রকম উন্নততর বিকল্প প্রদান করতে পারে না , তাই নির্বিশেষবাদীরা পুনরায় এই জড় জগতে অধঃপতিত হয়ে জন্ম - মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে থাকে । তাদের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির দুর্বার বাসনা তাদেরকে এইভাবে জড় জগতের আবর্তে টেনে আনে । কিন্তু ভগবদ্ভক্ত যখন ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে তাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবানের অপ্রাকৃত সেবায় যুক্ত করার মাধ্যমে ভগবদ্ধামে প্রবেশ করেন , তখন আর তিনি এই জড় জগতের সীমিত পরিবেশের প্রতি আকৃষ্ট হন না ।

        শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতেও ( ৮/১৫ ) এই তত্ত্ব প্রতিপন্ন হয়েছে , যেখানে ভগবান বলেছেন , “ মহাত্মারা বা ভক্তিযোগীরা আমার সঙ্গলাভ করার পর কখনো আর এই অনিত্য দুঃখ - দুর্দশাপূর্ণ জড় জগতে ফিরে আসেন না । ” এই জীবনের পরম পূর্ণতা হচ্ছে তার সঙ্গ লাভ করা এবং তা ছাড়া আর অন্য কিছু নয় । ভক্তিযোগীরা সম্পূর্ণরূপে ভগবৎ - সেবায় নিযুক্ত হওয়ার ফলে জ্ঞান অথবা যোগ আদি মুক্তির অন্যান্য পন্থার প্রতি আকৃষ্ট হন না । ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত সম্পূর্ণরূপে ভগবানের সেবায় যুক্ত থাকেন এবং তা ছাড়া তার আর কোন আকাঙ্ক্ষা নেই ।

        এই শ্লোক টিতে শান্তম্ এবং আনন্দম্ শব্দ দুটি দ্রষ্টব্য , যা ব্যক্ত করে যে ভগবদ্ভক্তি শাস্তি এবং আনন্দ দান করে থাকে । নির্বিশেষবাদীরা পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে এক হয়ে যেতে চায় , অর্থাৎ তারা নিজেরাই পরমেশ্বর হতে চায় , যা প্রকৃতপক্ষে অসম্ভব । যোগীরা নানারকম যোগ - সিদ্ধি লাভ করতে চায় , আর তার ফলে তারা কখনোই শান্তি এবং তৃপ্তি লাভ করতে পারে না । তাই নির্বিশেষবাদী অথবা যোগী এরা উভয়ই প্রকৃত শাস্তি এবং আনন্দ লাভ করতে পারে না । কিন্তু ভগবদ্ভক্ত সম্পূর্ণরূপে শান্ত এবং আনন্দময় , কেননা তিনি পরম পুর্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত । তাই ভক্তরা নির্বিশেষ ব্রহ্মে লীন হয়ে যাওয়ার প্রতি অথবা যোগসিদ্ধি লাভের প্রতি কখনো আকৃষ্ট হন না । ।

        ভগবৎ - প্রেম লাভ করার অর্থ হচ্ছে অন্য সমস্ত আকর্ষণ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হওয়া । বদ্ধজীবেদের নানারকম আকর্ষণ রয়েছে , যেমন ধার্মিক হওয়া , ধনী হওয়া বা প্রথম শ্রেণীর ভোগী হওয়া অথবা ভগবান হওয়া , অথবা যোগসিদ্ধি লাভ করে যা ইচ্ছা তাই পাওয়া অথবা যা ইচ্ছা তাই করা ; কিন্তু ভগবানের সঙ্গে তার সুপ্ত প্রেমকে বিকশিত করতে আকাঙ্ক্ষী যে ভক্ত তার কর্তব্য হচ্ছে এই সমস্ত বাসনাগুলি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা । অশুদ্ধ ভক্ত ভক্তির প্রভাবে উপরোক্ত সমস্ত বিষয়াদি লাভের আকাঙ্ক্ষা করতে পারেন , কিন্তু শুদ্ধ ভক্তের মধ্যে জড় ভোগ , নির্বিশেষ জ্ঞান এবং যোগসিদ্ধির আদি কলুষসমূহের বিন্দুমাত্রও বর্তমান থাকে না । শুদ্ধভক্তির প্রভাবে , বা পরম প্রেমাস্পদ পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি তার প্রেমপ্রসূত শ্রমের প্রভাবে ভক্তের ভগবৎ - প্রেম লাভ ১৬ হয় । আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে , কেউ যদি ভগবৎ - প্রেম লাভ করতে চান তা হলে তাকে অবশ্যই সমস্ত জড় ভোগের বাসনা পরিত্যাগ করতে হবে , অন্যান্য দেবদেবীর পূজা থেকে বিরত হতে হবে এবং কেবল পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনায় নিজেকে সর্বতোভাবে যুক্ত করতে হবে । তাকে অবশ্যই ভগবানের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার অসৎ ধারণা ত্যাগ করতে হবে এবং ক্ষণস্থায়ী জাগতিক যশ - প্রতিষ্ঠা অর্জনের জন্য অলৌকিক সমস্ত শক্তি অর্জনের দুর্বাসনা ত্যাগ করতে হবে । ভগবদ্ভুক্ত সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে কেবল পরমেশ্বর ভগবানের সেবাতেই যুক্ত থাকেন । তার ফলে ভগবৎ - প্রেমের উদয় হয় , বা তিনি এই শ্লোকে উল্লিখিত শান্তম্ এবং আনন্দম্ স্তর প্রাপ্ত হন ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।