শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ৩৫
    ভগবান্ সর্বভূতেষু লক্ষিতঃ স্বাত্মনা হরিঃ ৷
    দৃশ্যৈর্বুদ্ধ্যাদিভির্দ্রষ্টা লক্ষণৈরনুমাপকৈঃ ৷৷ ৩৫ ৷৷

  • অনুবাদ : পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রতিটি জীবের হৃদয়ে অন্তর্যামীরূপে বিরাজ করেন । দর্শন দ্বারা এবং বুদ্ধি দ্বারা বিচারপূর্বক সেই সত্য অনুভব করা যায় ।
  • তাৎপর্যঃ- সাধারণ মানুষেরা অনেক সময় তর্ক করে যে , ভগবানকে যেহেতু চক্ষুর দ্বারা দর্শন করা যায় না , তাই কিভাবে তার শরণাগত হওয়া সম্ভব অথবা ভক্তিযোগে তার সেবা করা সম্ভব ? সেই সমস্ত সাধারণ মানুষদের জন্য শ্রীল শুকদেব গোস্বামী কিভাবে বিচার এবং বুদ্ধির দ্বারা ভগবানকে অনুভব করা যায় তার একটি ব্যবহারিক উপদেশ এখানে দিয়েছেন । আসলে আমাদের জড় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ভগবানকে কখনোই দর্শন করা সম্ভব নয় , কিন্তু কেউ যখন ভগবানের প্রতি সেবা - বৃত্তির প্রভাবে ভগবানের অস্তিত্ব সম্বন্ধে দৃঢ়প্রত্যয় হন , তখন ভগবানের কৃপায় সেই শুদ্ধ ভক্ত সর্বদা সর্বত্র ভগবানের উপস্থিতি অনুভব করতে পারেন । তখন তিনি অনুভব করতে পারেন যে , তার বুদ্ধিমত্তা পরমেশ্বর ভগবানের অংশ প্রকাশ পরমাত্মারই নির্দেশস্বরূপ । পরমাত্মা যে সকলের হৃদয়েই বিরাজ করেছেন তা হৃদয়ঙ্গম করা খুব একটা কঠিন নয় । তাকে হৃদয়ঙ্গম করার পন্থাটি হচ্ছে এই রকমসকলেই তার ব্যক্তিগত সত্তা অনুভব করতে পারে এবং নিশ্চিতভাবে তার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে । আকস্মিকভাবে সেই অনুভূতির প্রকাশ নাও হতে পারে , কিন্তু বুদ্ধির দ্বারা বিচার করলে সে সহজেই অনুমান করতে পারে যে সে তার দেহ নয় । সে অনুভব করতে পারে যে তার হাত , তার পা , তার মাথা , তার চুল এবং তার দেহের অন্যান্য সমস্ত অঙ্গ - প্রত্যঙ্গ তার দেহের বিভিন্ন অংশ , কিন্তু তার হাত , পা , মাথা ইত্যাদি তার প্রকৃত স্বরূপ নয় । এইভাবে বুদ্ধির দ্বারা সে তার আত্মা এবং দৃশ্য বস্তুর পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে । এইভাবে সহজেই স্থির করা যায় যে জীব , তা সে মানুষই হোক বা পশুই হোক , হচ্ছে দ্রষ্টা , এবং সে নিজেকে ছাড়া অন্য সবকিছুই দর্শন করছে । অতএব দ্রষ্টা এবং দৃশ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে । এখন একটু বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের দ্বারা সহজেই বুঝতে পারা যায় যে সাধারণ দৃষ্টিতে আত্মা ছাড়া অন্য আর যা কিছু দর্শন হয় , তাদের স্বতন্ত্রভাবে দর্শন করার বা চলাফেরা করার কোন শক্তি নেই ।

        আমাদের সমস্ত সাধারণ কার্যকলাপ এবং অনুভূতি নির্ভর করে প্রকৃতি কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন প্রকার শক্তির মাধ্যমে । আমাদের পাচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়— ( ১ ) চক্ষু , ( ২ ) কর্ণ , ( ৩ ) নাসিকা , ( ৪ ) জিহ্বা , ( ৫ ) ত্বক । পাচটি কর্মেন্দ্রিয়– ( ১ ) বাক্ , ( ২ ) পাণি , ( ৩ ) পাদ , ( ৪ ) পায়ু , ( ৫ ) উপস্থ এবং তিনটি অন্তরেন্দ্রিয় যথা —– ( ১ ) মন , ( ২ ) বুদ্ধি , ( ৩ ) অহঙ্কার – এই তেরটি ইন্দ্রিয় প্রকৃতির সূক্ষ্ম এবং স্থূল উপাদানের মাধ্যমে আমাদের সরবরাহ করা হয়েছে । তেমনই , আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সমস্ত বিষয়গুলি প্রকৃতির উপাদানগুলির অন্তহীন সমন্বয়ের প্রকাশ মাত্র । এইভাবে প্রমাণিত হয় যে জীবের স্বতন্ত্রভাবে দর্শন করার অথবা চলাফেরা করার কোন ক্ষমতা নেই এবং যতই আমরা নিশ্চিতভাবে অনুভব করতে পারি যে আমাদের অস্তিত্ব প্রকৃতির শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে , ততই আমরা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে যিনি দর্শন করেন তিনি হচ্ছেন চেতন আত্মা , আর ইন্দ্রিয়সমূহ এবং ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলি হচ্ছে জড় । দ্রষ্টার চিন্ময় গুণাবলী প্রকাশ পায় সীমিত জড়া প্রকৃতির বদ্ধ অবস্থায় তার অতৃপ্তির মাধ্যমে । চেতন এবং জড়ের মধ্যে এটিই হচ্ছে পার্থক্য । কিছু মূর্খ লোক তর্ক করে , জড়ের মধ্যে দর্শন করার এবং গমনাগমন করার শক্তি বিকশিত হয়েছে । যেমন অনেক সময় প্রকৃতিতে প্রাণীদের ক্রমবিকাশ হতে দেখা যায় কিন্তু এই প্রকার যুক্তি স্বীকার করা যায় না , কেননা এমন কোন প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায় না যে জড় পদার্থ থেকে জীবনের উদ্ভব হয়েছে অথবা জড় পদার্থ জীবন সৃষ্টি করেছে । এই সমস্ত মূর্খ লোকেরা প্রতিশ্রুতি দেয় যে ভবিষ্যতে তারা দেখাবে কিভাবে জড় থেকে জীবনের উদ্ভব হয় । কিন্তু তাদের এই মূর্খ এবং প্রবঞ্চনাপূর্ণ প্রতিশ্রুতি কোন দিনই সফল হবে না , কেননা পৃথিবীর কোথাও জড় পদার্থ থেকে দর্শন করার অথবা চলাফেরা করার ক্ষমতা উদ্ভব হয়েছে বলে শোনা যায়নি । অতএব নিশ্চিতভাবে স্থির করা যায় যে জড় এবং চেতন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু , এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের দ্বারা । এখন আমরা বিচার করে দেখতে পারি যে বুদ্ধিমত্তার অল্প প্রয়োগের দ্বারা যে দর্শন হয় তা আপনা থেকেই হয় না , পক্ষাস্তরে কেউ নিশ্চয়ই সেই বুদ্ধির ব্যবহার করছেন অথবা প্রয়োগ করছেন । বুদ্ধি আমাদের পরিচালিত করে , এবং এই বুদ্ধির প্রয়োগ ব্যতীত জীব কিছুই দেখতে পারে না অথবা চলাফেরা করতে পারে না অথবা খেতে রে না অথবা অন্য কোন কিছুই করতে পারে না । কেউ যখন যথাযথভাবে তার বুদ্ধির ব্যবহার করতে পারে না , তখন সে বিকৃত মস্তিষ্ক হয়ে যায় । এইভাবে দেখা যায় যে জীব তার বুদ্ধির উপর নির্ভরশীল অথবা উন্নত কোন সত্তার পরিচালনার উপর নির্ভরশীল । এই বুদ্ধি সর্বব্যাপ্ত । প্রতিটি জীবেরই নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা রয়েছে , এবং এই বুদ্ধি কোন উন্নততর নিয়স্তা কর্তৃক পরিচালিত হয় , ঠিক যেমন পিতা তার পুত্রকে পরিচালিত করেন । সেই পরিচালক , যিনি সমস্ত জীবের হৃদয়ে বিরাজ করছেন , তিনিই হচ্ছেন পরমাত্মা ।

        আমাদের অনুসন্ধানের এই পর্যায়ে আমরা নিম্নলিখিত প্রশ্নটি বিবেচনা করতে পারি । একদিক দিয়ে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে আমাদের সমস্ত অনুভূতি বা কার্যকলাপ জড়া প্রকৃতির দ্বারা পরিচালিত , তথাপি সাধারণত আমাদের অনুভব হয় বা আমরা বলি , ' আমি দেখছি ' অথবা ' আমি করছি । ' অতএব আমরা বলতে পারি যে আমাদের জড় কর্মেন্দ্রিয় এবং জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি ক্রিয়া করছে , কেননা আমরা আমাদের জড় দেহকে আমাদের আত্মা বলে মনে করছি এবং পরমাত্মা আমাদের পরিচালিত করছেন এবং আমাদের বাসনা অনুসারে সবকিছু সরবরাহ করছেন । বুদ্ধিরূপে পরমাত্মা যে আমাদের পরিচালনা করছেন , তা স্বীকার করার ফলে আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত — ' আমি এই দেহ নই ' সম্বন্ধে অধ্যয়ন করতে পারি এবং ব্যবহারিক ভাবে সেই উপলব্ধি অনুশীলন করতে পারি , অথবা নিজেদের কর্তা এবং ভোক্তা বলে অভিমান করে জড় জগতে মিথ্যা পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারি । জড় জগতের ভ্রান্ত ধারণার অভিমুখে অথবা প্রকৃত পারমার্থিক উপলব্ধির অভিমুখে আমাদের বাসনা পরিচালিত করার স্বাধীনতা আমাদের রয়েছে । পরমাত্মাকে আমাদের প্রকৃত বন্ধু এবং পরিচালকরূপে হৃদয়ঙ্গম করার মাধ্যমে এবং আমাদের বুদ্ধি দিয়ে পরমাত্মার উন্নত বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হওয়ার মাধ্যমে আমরা অনায়াসে প্রকৃত পারমার্থিক স্তরে উন্নীত হতে পারি । পরমাত্মা এবং আত্মা উভয়েই চিন্ময় , এবং তাই গুণগতভাবে পরমাত্মা ও জীবাত্মা এক এবং উভয়েই জড় পদার্থ থেকে ভিন্ন । কিন্তু তা বলে পরমাত্মা এবং জীবাত্মা সমান নন । কেননা পরমাত্মা জীবকে পরিচালিত করেন অথবা বুদ্ধিমত্তা দান করেন , আর জীব তার নির্দেশ অনুসরণ করে , এবং তখনই সমস্ত কার্য যথাযথভাবে সম্পাদিত হয় । জীব পরমাত্মার নির্দেশের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল , কেননা দর্শন , শ্রবণ , চিন্তন , অনুভব , ইচ্ছ ) ইত্যাদি সমস্ত ব্যাপারেই জীবাত্মা প্রতি পদক্ষেপে পরমাত্মার নির্দেশ অনুসরণ করছে ।

        সাধারণ জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে , জড় , আত্মা এবং পরমাত্মা এই তিনটি পরিচিতি রয়েছে । আমরা যদি শ্রীমদ্ভগবদগীতা বা বৈদিক বুদ্ধিমত্তার শরণ গ্রহণ করি , তা হলে আমরা দেখতে পাই যে এই তিনটি পরিচিতি পরমেশ্বর ভগবানের উপর নির্ভরশীল । পরমাত্মা হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবানের প্রতিনিধিরূপী অংশ । শ্রীমদ্ভগবদগীতায় প্রতিপন্ন হয়েছে যে , পরমেশ্বর ভগবান তার আংশিক প্রকাশের দ্বারা সমগ্র জড় জগতের উপর আধিপত্য করেন । ভগবান মহান , এবং তিনি কেবল জীবের বস্তু সরবরাহকারী হতে পারেন না , তাই পরমাত্মা পরমেশ্বর ভগবান বা পুরুষোত্তম ভগবানের পূর্ণ প্রকাশ হতে পারেন না । পরমাত্মাকে উপলব্ধির মাধ্যমে জীবাত্মার আত্মা - উপলব্ধি শুরু হয় , তারপর শাস্ত্র অধ্যয়নের ফলে এবং বিশেষ করে সদ্গুরুর কৃপার ফলে , জীব তার বুদ্ধিমত্তার দ্বারা পরমেশ্বর ভগবানকে উপলব্ধি করতে পারে । শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে প্রাথমিক জ্ঞান এবং শ্রীমদ্ভাগবত আরও গভীরভাবে এই ভগবত্ব - বিজ্ঞান বিশ্লেষণ করে । তাই আমরা যদি দৃঢ়সঙ্কল্প হয়ে আমাদের দেহরূপ বৃক্ষে ( উপনিষদে বর্ণিত ) অবস্থিত দুটি পাখির মধ্যে একটির অর্থাৎ বুদ্ধির পরিচালক পরমাত্মার কৃপা ভিক্ষা করি , তা হলে অবশ্যই বৈদিক জ্ঞান আমাদের হৃদয়ে প্রকাশিত হবে এবং তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবাসুদেবকে উপলব্ধি করতে আর কোন অসুবিধা হবে না । বুদ্ধিমান মানুষ তাই বহু জন্ম - জন্মান্তরে এইভাবে তার বুদ্ধিমত্তার সদ্ব্যবহার করার পর পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবাসুদেবের পাদপদ্মে নিজেকে সমর্পণ করেন , যে কথা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ( ৭/১৯ ) প্রতিপন্ন হয়েছে।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।