শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-৩, (শুদ্ধ ভক্তিঃ হৃদয়ের পরিবর্তন )

    শ্লোক: ২-৭
    ব্রহ্মবর্চসকামস্তু যজেত ব্ৰহ্মণঃ পতিম্ ৷
    ইন্দ্ৰমিন্দ্ৰিয়কামস্ত প্রজাকামঃ প্রজাপতীন্ ॥২ ॥
    দেবীং মায়ান্তু শ্রীকামস্তেজস্কামো বিভাবসুম্ ।
    বসুকামো বসুন্ রুদ্রান্ বীৰ্যকামোঽথ বীর্যবান্ ॥ ৩ ॥
    অন্নাদ্যকামস্ত্বদিতিং স্বর্গকামোঽদিতেঃ সুতান্ ।
    বিশ্বান্দেবান রাজ্যকামঃ সাধ্যান সংসাধকো বিশাম্ ॥৪ ॥
    আয়ুষ্কামোঽশ্বিনৌ দেবৌ পুষ্টিকাম ইলাং যজেৎ ।
    প্রতিষ্ঠাকামঃ পুরুষো রোদসী লোকমাতরৌ ॥৫ ॥
    রূপাভিকামো গন্ধর্বান্ স্ত্রীকামোহপ্সর উর্বশীম্ ।
    আধিপত্যকামঃ সর্বেষাং যজেত পরমেষ্ঠিনম্ ৷৷ ৬ ৷৷
    যজ্ঞং যজেদ্ যশস্কামঃ কোষকামঃ প্রচেতসম্
    বিদ্যাকামস্তু গিরিশং দাম্পত্যার্থ উমাং সতীম্ ॥৭ ॥

  • অনুবাদ : যে ব্যক্তি ব্রহ্মতেজ কামনা করেন , তার বেদপতি ( ব্রহ্মা অথবা বৃহস্পতির ) আরাধনা করা উচিত । যিনি ইন্দ্রিয় - তর্পণের পটুতা কামনা করেন , তার দেবরাজ ইন্দ্রের আরাধনা করা উচিত এবং যিনি পুত্রাদি কামনা করেন , তার প্রজাপতিদের আরাধনা করা উচিত । যিনি শ্রী কামনা করেন , তার প্রকৃতির অধিষ্ঠাত্রী দুর্গাদেবীর আরাধনা করা উচিত । যিনি তেজ কামনা করেন তার অগ্নিকে আরাধনা করা উচিত , এবং যিনি ধন কামনা করেন , তার অষ্টবসুর আরাধনা করা উচিত । যিনি বল এবং বীর্য কামনা করেন , তার শিবের অংশ রুদ্রের আরাধনা করা উচিত । যিনি প্রচুর পরিমাণে শস্য কামনা করেন , তার অদিতির আরাধনা করা উচিত । যিনি স্বর্গ কামনা করেন , তার আদিত্যদের উপাসনা করা উচিত । যিনি রাজ্য কামনা করেন , তার বিশ্বদেবের উপাসনা করা উচিত , এবং যিনি জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করতে চান , তার সাধ্যদেবের পুজা করা উচিত । যিনি দীর্ঘায়ু কামনা করেন , তার অম্বিনী কুমারদ্বয়ের আরাধনা করা উচিত , এবং যিনি দেহের পুষ্টি কামনা করেন , তার পৃথিবীকে পূজা করা উচিত । যিনি প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ স্বপদে স্থিত থাকার কামনা করেন , তার অন্তরীক্ষ ও পৃথিবীর আরাধনা করা উচিত । যিনি রূপ কামনা করেন , তার গন্ধর্বরূপ আরাধনা করা উচিত । যিনি স্ত্রী কামনা করেন , তার উর্বশী অপ্সরার আরাধনা করা উচিত । যিনি সকলের উপর আধিপত্য কামনা করেন , তার ব্রহ্মাকে আরাধনা করা উচিত । যিনি যশ আকাঙ্ক্ষা করেন , তার পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করা উচিত এবং মিনি ধন সঞ্চয়ের অভিলাষী , তার কুবেরের আরাধনা করা উচিত । যিনি বিদ্যালাভের অভিলাষ করেন , তার শিবের আরাধনা করা উচিত , এবং তিনি দাম্পত্য প্রেম কামনা করেন , তার সতী উমাদেবীর আরাধনা করা উচিত ।
  • তাৎপর্যঃ- বিভিন্ন বিষয়ে সাফল্য লাভ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন রকম পূজার বিধি রয়েছে । জড় জগতের সীমার মধ্যে আবদ্ধ জীবেরা সব রকম ভোগের বিষয়ে দক্ষ না হতে পারে , কিন্তু উপরোক্ত বিশেষ বিশেষ দেবতাদের আরাধনা করার মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ বিষয়ে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে পারে । শিবের আরাধনা করার ফলে রাবণ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়েছিল এবং সে শিবের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য মাথাগুলি কেটে তাকে তা নিবেদন করত । শিবের কৃপায় সে এত শক্তিশালী হয়েছিল যে , স্বর্গের সমস্ত দেবতারা পর্যন্ত তার ভয়ে ভীত ছিল । অবশেষে সে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এবং তার ফলে বিনাশ প্রাপ্ত হয়েছিল । অর্থাৎ , এই সমস্ত ব্যক্তিরা যারা সামগ্রিকভাবে অথবা আংশিকভাবে জড় সুখভোগ করতে চায় , অর্থাৎ স্থূল জড়বাদীরা প্রকৃতপক্ষে স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন একথা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ( ৭/২০ ) প্রতিপন্ন হয়েছে । সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে , কামনার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে , অর্থাৎ মায়ার প্রভাবে যাদের বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়েছে , তারাই বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করার মাধ্যমে জড়জাগতিক সুখভোগ করতে চায় অথবা বৈজ্ঞানিক প্রগতির মাধ্যমে জাগতিক উন্নতি সাধন করতে চায় ।

        জড়জাগতিক জীবনের প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে জন্ম , মৃত্যু , জরা এবং ব্যাধি , এবং সেই সমস্যাগুলির সমাধান করাই হচ্ছে মানব জীবনের প্রকৃত কর্তব্য । কেউই চায় না তার জন্মগত অধিকার ত্যাগ করতে , কেউই চায় না মরতে , কেউই চায় না জরাগ্রস্ত হতে বা ব্যাধিগ্রস্ত হতে । কিন্তু কোন দেবতার কৃপায় অথবা জড় বিজ্ঞানের তথাকথিত উন্নতি সাধনের মাধ্যমে এই সমস্ত সমস্যাগুলির সমাধান করা সম্ভব হয় না ।

        শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় এবং শ্রীমদ্ভাগবতে এই সমস্ত অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিদের সব রকম সদ্গুণবর্জিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে । শুকদেব গোস্বামী বলেছেন যে ৮৪,০০,০০০ বিভিন্ন প্রকার জীবের মধ্যে মানব জীবন হচ্ছে অত্যন্ত দুর্লভ এবং মূল্যবান , এবং এই সমস্ত মানুষদের মধ্যে জড় জগতের সমস্যাগুলির সমাধানে সচেষ্ট ব্যক্তির সংখ্যা আরও দুর্লভ ; তার থেকেও দুর্লভ হচ্ছে সেই প্রকার মানুষেরা যারা শ্রীমদ্ভাগবতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন , কেননা শ্রীমদ্ভাগবতে ভগবান এবং তার শুদ্ধভক্তদের বাণী রয়েছে । বুদ্ধিমান এবং মূর্খ নির্বিশেষে সকলের জন্যই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী । কিন্তু শ্রীল শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিতকে মনীষী বলে বর্ণনা করেছেন , অর্থাৎ তার অনুভব অত্যন্ত উন্নত , কেননা মৃত্যুর ঠিক পূর্বে তিনি সমস্ত জড়ভোগ ত্যাগ করে শ্রীল শুকদেব গোস্বামীর মতো উপযুক্ত ব্যক্তির শ্রীমুখ থেকে ভগবানের কথা শ্রবণ করে তার শ্রীপাদপদ্মে সম্পূর্ণরূপে শরণাগত হয়েছেন ।

        জড় সুখভোগের প্রচেষ্টার সব সময়ই নিন্দা করা হয়েছে । সেই সমস্ত আকাঙ্ক্ষা পতিত মানব সমাজের নেশার মতো । বুদ্ধিমান মানুষদের কর্তব্য হচ্ছে সেই সমস্ত প্রচেষ্টা সর্বতোভাবে ত্যাগ করে তাদের প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে গিয়ে নিত্য জীবন লাভের চেষ্টা করা ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।