সনাতন ধর্মের সুনির্বাচিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থ ।

আপনার মোবাইলে ভালোভাবে দেখার জন্য মোবাইলটি রোটেন করুন ( ঘুরান) ।

  • প্রকৃতির নিয়ম

    কর্মের অবশ্যম্ভাবী ফল

    কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক রচিত ইংরেজী The Laws of Nature : An Infallible Justice গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ
  • ভূমিকা ,    ১ম অধ্যায়, ভগবান এবং কর্মনীতি => কর্মবন্ধন ছিন্ন করার পন্থা ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সব কিছুর নিয়ন্তা এবং প্রভু ,    ভগবান এবং তাঁর শক্তিরাশি ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মর্যাদা ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ —আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব ,   ভগবান এবং তাঁর শক্তি — এক এবং ভিন্নও ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম শুদ্ধ ,   শরীরের পরিসীমার ওপরে ,    পারমার্থিক এবং জড়জাগতিক শিক্ষা ,   জ্ঞান বনাম অজ্ঞানতা ,    শ্রীভগবানকে জানার পন্থা ,   ব্রহ্মজ্যোতির ঊর্ধ্বে । ,   দ্বিতীয় অধ্যায় , খারাপ কর্ম ,   তৃতীয় অধ্যায় , শান্তির সূত্র ,  
  • দ্বিতীয় অধ্যায়

    খারাপ কর্ম


          শ্লোক ১৯ : মৃত্যুর সময় , সক্রোধনেত্র ভয়ঙ্কর যমদূতদের সে তার কাছে । আসতে দেখে , এবং তখন মহাভয়ে সে মল - মূত্র ত্যাগ করতে থাকে ।

          তাৎপর্য : বর্তমান শরীর ত্যাগ করার পর , জীবের দুই প্রকার দেহান্তর হয় । এক প্রকার দেহান্তর হচ্ছে পাপকর্মের নিয়ন্ত্রণকারী যমরাজের কাছে যাওয়া , এবং অন্যটি হচ্ছে বৈকুণ্ঠলোক পর্যন্ত উচ্চতর লোকে যাওয়া । এখানে ভগবান কপিলদেব বর্ণনা করেছেন , ইন্দ্রিয় সুখভোগ পরায়ণ যে - সমস্ত মানুষ পরিবার প্রতিপালনের কাজে ব্যস্ত থাকে , তাদের সঙ্গে যমদূতেরা কিভাবে আচরণ করে । যে সমস্ত মানুষ প্রবলভাবে ইন্দ্রিয় তৃপ্তি সাধন করেছে , মৃত্যুর সময় যমদূতেরা তাদের তত্ত্বাবধায়ক হয় । তারা মৃত ব্যক্তিকে যমালয়ে নিয়ে যায় । সেখানকার অবস্থা পরবর্তী শ্লোকগুলিতে বর্ণনা করা হয়েছে ।

          শ্লোক ২০ : রাজ্যের পাহারাদারেরা যেমন অপরাধীকে দণ্ড দেওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করে , তেমনই যে - ব্যক্তি অপরাধজনক ইন্দ্রিয় - তৃপ্তির কার্যে যুক্ত ছিল , তাকে যমদূতেরা একটি শক্ত দড়ি দিয়ে তার গলায় বাঁধে এবং তার সূক্ষ্ম দেহকে আবৃত করে , যাতে তাকে অত্যন্ত কঠোর দণ্ড দেওয়া যায় ।

          তাৎপর্য : প্রতিটি জীবই সূক্ষ্ম এবং স্থূল শরীরের দ্বারা আচ্ছাদিত । সূক্ষ্ম দেহটি হচ্ছে মন , বুদ্ধি , অহঙ্কার এবং চিত্তের আবরণ । শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে , যমদূতেরা অপরাধীর সূক্ষ্ম দেহ আচ্ছাদিত করে যমালয়ে নিয়ে যায় , যেখানে তাকে এমনভাবে দণ্ড দেওয়া হয় , যা সে সহ্য করতে পারে । সেই দণ্ডভোগের ফলে তার মৃত্যু হয় না , কারণ যদি সে মরে যায় , তা হলে সেই দণ্ড কে ভোগ করবে ? কাউকে হত্যা করা যমদূতদের কার্য নয় । প্রকৃত পক্ষে , জীবকে করা কখনই সম্ভব নয় , কারণ বাস্তবে সে হচ্ছে নিত্য । তাকে কেবল তার ইন্দ্রিয় সুখভোগের কর্মের ফল ভোগ করতে হয় । চৈতন্য - চরিতামৃতে দণ্ডদানের বিধি বর্ণিত হয়েছে । পুরাকালে রাজার প্রহরীরা কয়েদিকে একটি নৌকায় করে মাঝনদীতে নিয়ে যেত , এবং সেখানে তার চুলের মুঠি ধরে সম্পূর্ণরূপে জলের নীচে তাকে ডোবানো হত , এবং যখন তার দম প্রায় বন্ধ হয়ে যেত , তখন রাজার প্রহরীরা তাকে জল থেকে তুলে অল্প ক্ষণের জন্য কেবল শ্বাস নিতে দিত এবং তার পর আবার তাকে জলে ডোবানো হত । ভগবৎ বিস্মৃত জীবেদের যমরাজ এইভাবে দণ্ড দেন , যা পরবর্তী শ্লোকগুলিতে বর্ণিত হবে ।

          শ্লোক ২১ : এইভাবে যমদূতেরা যখন তাকে নিয়ে যায় , তখন তার হৃদয় বিদীর্ণ হয় এবং তার সর্ব শরীর কাঁপতে থাকে । পথিমধ্যে কুকুরেরা তাকে কামড়াতে থাকে এবং তখন সে তার সমস্ত পাপকর্মের কথা স্মরণ করে । এইভাবে সে অত্যন্ত ব্যথিত হয় ।

          তাৎপর্য : এই শ্লোক থেকে মনে হয় যে , এই লোক থেকে যমলোকে যাওয়ার সময় , যমদূতদের দ্বারা বন্দি অপরাধীর সঙ্গে অনেক কুকুরের সাক্ষাৎ হয় এবং তারা তাকে তার ইন্দ্রিয় তৃপ্তির অপরাধজনক কার্যকলাপের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গর্জন করে এবং তাকে কামড়ায় । ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে যে , যখন কেউ ইন্দ্রিয় - তৃপ্তির বাসনায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে , তখন সে অন্ধ হয়ে যায় । এবং তার সমস্ত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে । সে সব কিছু ভুলে যায় । কামৈস্তৈস্তৈ হার্তজ্ঞানাঃ । কেউ যখন ইন্দ্রিয় তৃপ্তির প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয় , তখন সে তার সমস্ত বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে , এবং সে ভুলে যায় যে , তার পরিণাম তাকে ভোগ করতে হবে । এখানে যমরাজের কুকুরদের দ্বারা সে তার ইন্দ্রিয় - তৃপ্তির কার্যকলাপের কথা মনে করার সুযোগ পায় । আমাদের স্কুল দেহে জীবিত থাকার সময় , আধুনিক সরকারও ইন্দ্রিয় - তৃপ্তির এই সমস্ত কার্যকলাপে অনুপ্রাণিত করে । সারা পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রে , জনগণ জন্ম - নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির দ্বারা এই ধরনের কার্যকলাপে সরকার কর্তৃক অনুপ্রাণিত হচ্ছে । মেয়েদের জন্ম - নিয়ন্ত্রণের পিল সরবরাহ করা হচ্ছে , এবং তাদের হাসপাতালে ও ডাক্তারখানায় গর্ভপাত করতে অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে । ইঞ্জিয় - তৃপ্তির ফলে এই সমস্ত হচ্ছে । প্রকৃত পক্ষে , যৌন জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সুসন্তান উৎপাদন করা , কিন্তু মানুষের যেহেতু তাদের ইন্দ্রিয়ের উপর কোন সংযম নেই এবং ইন্দ্রিয় সংযমের শিক্ষা দেওয়ার কোন প্রতিষ্ঠান নেই , তাই সেই সমস্ত দুর্ভাগা ব্যক্তিরা ইঞ্জিয় - তৃপ্তির অপরাধের শিকার হয় , এবং মৃত্যুর পর তাদের দণ্ডভোগ করতে হয় , যার বর্ণনা শ্রীমদ্ভাগবতের এই শ্লোকগুলিতে করা হয়েছে ।

          শ্লোক ২২-২৪ : অপরাধীকে তীব্র সূর্য - কিরণে , তপ্ত বালুকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে হয় , যার দুপাশে দাবানল জ্বলে । সে যখন হাঁটতে অসমর্থ হয় , তখন যমদূতেরা তার পিঠে চাবুক দিয়ে আঘাত করে , এবং সে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় পীড়িত হলেও দুর্ভাগ্যবশত সেখানে কোন জল নেই , আশ্রয় নেই এবং বিশ্রামের কোন স্থান নেই । যমালয়ের পথে যেতে যেতে সে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে যায় , এবং কখনও কখনও সে অচেতন হয়ে পড়ে , কিন্তু তাকে জোর করে উঠতে বাধ্য করা হয় । এইভাবে শীঘ্রই তাকে যমরাজের সামনে নিয়ে আসা হয় ।
    “ এইভাবে দুই - তিন মুহূর্তের মধ্যে তাকে নিরানব্বই হাজার যোজন পথ অতিক্রম করতে হয় , এবং তার পর তাকে তৎক্ষণাৎ ঘোর যন্ত্রণাদায়ক দণ্ড দান করা হয় , যা ভোগ করতে সে বাধ্য হয় । "

          তাৎপর্য : এক যোজন হচ্ছে আট মাইল , অতএব তাকে ৭,৯২,০০০ মাইল দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয় । এই দীর্ঘ দূরত্ব কেবল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অতিক্রম করতে হয় । যমদূতেরা সূক্ষ্ম শরীরকে আচ্ছাদিত করে , যাতে জীব এই দীর্ঘ পথ শীঘ্রই অতিক্রম করতে পারে এবং সেই সঙ্গে সমস্ত যন্ত্রণাও সহ্য করতে পারে । সেই আবরণটি যদিও জড় , তা এত সূক্ষ্ম উপাদান দিয়ে তৈরি , যা জড় বৈজ্ঞানিকেরা বুঝতে পারে না , এই আবরণটি কি বস্তু । কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ৭,৯২,০০০ মাইল পথ অতিক্রম করা আধুনিক অন্তরীক্ষ যাত্রীদের কাছে আশ্চর্যজনক বলে মনে হতে পারে । তারা এখন পর্যন্ত কেবল ঘণ্টায় ১৮,০০০ মাইল গতিতে ভ্রমণ করতে সক্ষম হয়েছে , কিন্তু এখানে আমরা দেখতে পাই যে , যমদূতেরা যখন পাপীদের যমালয়ে নিয়ে যায় , তখন তারা কেবল কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ৭,৯২,০০০ মাইল পথ অতিক্রম করে , যদিও এই পন্থাটি চিন্ময় নয় , জড় ।

          শ্লোক ২৫ : তাকে জ্বলন্ত অঙ্গারের মধ্যে রেখে , তার অঙ্গ - প্রত্যঙ্গ দগ্ধ করা হয় , কখনও কখনও তার নিজের মাংস তাকে খেতে বাধ্য করা হয় অথবা অন্যেরা তার মাংস খায় ।

          তাৎপর্য : এই শ্লোকটি থেকে পরবর্তী তিনটি শ্লোকে যমালয়ে দণ্ডের বর্ণনা করা হবে । প্রথম বর্ণনাটি হচ্ছে , অপরাধীকে আগুনে দগ্ধ হয়ে , নিজের মাসে খেতে হয় অথবা সেখানে তার মতো যারা উপস্থিত , তারা তার মাংস খায় । গত মহাযুদ্ধের সময় , কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কখনও কখনও নিজেদের বিধা মানুষকে খেতে হয়েছিল , সুতরাং যারা অন্যের মাংস খেয়ে অত্যন্ত আনন্দদায়ক জীবন যাপন করেছিল , যমালয়ে তাদের যে নিজেদের মাংস খেতে হয় , তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই ।

          শ্লোক ২৬-২৮ : নরকের কুকুর এবং শকুনিরা তার নাড়ি সকল টেনে বার করে , এবং তা সত্ত্বেও সে জীবিত থাকে এবং তা দেখে । সৰ্প , বৃশ্চিক , দংশক ইত্যাদি প্রাণী তাকে দংশন করে এবং তার ফলে সে অত্যন্ত বেদনা অনুভব করে । তার পর তার অঙ্গ - প্রত্যঙ্গগুলি খণ্ড খণ্ড করে কাটা হয় এবং হস্তীর দ্বারা বিদীর্ণ করা হয় । তাকে পর্বতশৃঙ্গ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয় , এবং জলে অথবা গুহায় তাকে অবরুদ্ধ করা হয় । 69 “ পুরুষ এবং স্ত্রী , যাদের জীবন অবৈধ যৌন আচরণের মাধ্যমে অতিবাহিত হয়েছিল , তাদের তামিশ্র , অন্ধতামিশ্র এবং রৌরব নামক নরকে নানা প্রকার যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় । ”

          তাৎপর্য : জড় - জাগতিক জীবন যৌন জীবনের উপর প্রতিষ্ঠিত । জীবন সংগ্রামে নানা প্রকার যন্ত্রণা ভোগ করছে যে - সমস্ত জড়বাদী ব্যক্তি , তাদের অস্তিত্ব যৌন সুখভোগের উপর প্রতিষ্ঠিত । তাই , বৈদিক সভ্যতায় কেবল সীমিত যৌন জীবনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ; তা কেবল বিবাহিত দম্পতির সন্তান উৎপাদনের জন্য । কিন্তু যখন ইন্দ্রিয় সুখভোগের জন্য অন্যায়ভাবে এবং অবৈধভাবে যৌন সংযোগ হয় , তখন পুরুষ এবং স্ত্রী উভয়কেই এই জগতে অথবা মৃত্যুর পর কঠোর দণ্ডভোগের জন্য প্রতীক্ষা করতে হয় । এই পৃথিবীতেও সিফিলিস , গনোরিয়া আদি তীব্র যন্ত্রণাদায়ক রোগে তাদের শাস্তিভোগ করতে হয় , এবং পরবর্তী জীবনে , যন্ত্রণা ভোগের জন্য তাদের নানাবিধ নরকে নিক্ষেপ করা হয় , যার বর্ণনা শ্রীমদ্ভাগবতের এই অধ্যায়ে করা হয়েছে । ভগবদগীতার প্রথম অধ্যায়েও অবৈধ যৌন জীবনের তীব্রভাবে নিন্দা করা হয়েছে । সেখানে বলা হয়েছে , যারা অবৈধ যৌন জীবনের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন করে , তাদের নরকে নিক্ষেপ করা হয় । শ্রীমদ্ভাগবতের এখানেও প্রতিপন্ন হয়েছে যে , সেই সমস্ত অপরাধীদের তামিশ্র , অন্ধতামিস্র এবং রৌরব নরকে নিক্ষেপ করা হয় ।

    এর পরবর্তী পৃষ্ঠা

  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।