সনাতন ধর্মের সুনির্বাচিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থ ।

আপনার মোবাইলে ভালোভাবে দেখার জন্য মোবাইলটি রোটেন করুন ( ঘুরান) ।

  • প্রকৃতির নিয়ম

    কর্মের অবশ্যম্ভাবী ফল

    কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক রচিত ইংরেজী The Laws of Nature : An Infallible Justice গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ
  • ভূমিকা ,    ১ম অধ্যায়, ভগবান এবং কর্মনীতি => কর্মবন্ধন ছিন্ন করার পন্থা ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সব কিছুর নিয়ন্তা এবং প্রভু ,    ভগবান এবং তাঁর শক্তিরাশি ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মর্যাদা ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ —আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব ,   ভগবান এবং তাঁর শক্তি — এক এবং ভিন্নও ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম শুদ্ধ ,   শরীরের পরিসীমার ওপরে ,    পারমার্থিক এবং জড়জাগতিক শিক্ষা ,   জ্ঞান বনাম অজ্ঞানতা ,    শ্রীভগবানকে জানার পন্থা ,   ব্রহ্মজ্যোতির ঊর্ধ্বে । ,   দ্বিতীয় অধ্যায় , খারাপ কর্ম ,   তৃতীয় অধ্যায় , শান্তির সূত্র ,  
  • ভগবান শ্রীকৃষ্ণ — আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব


          ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে , “ পরমেশ্বর ভগবান সচল এবং অচল । তিনি বহুদূরে নাগালের বাইরে বিরাজমান , তবু তিনি আমাদের কাছেই রয়েছেন । তিনি সব কিছুর মাঝেই অবস্থান করেন , তা সত্ত্বেও তিনি প্রত্যেকটি বস্তুর বাইরেও বিরাজ করছেন ” । কিভাবে কৃষ্ণ সচল এবং অচল । একটি খুব সাধারণ উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজে বোঝা যাবে । ভরদুপুরে সূর্য যখন আমাদের মাথার ওপর উঠে আসে সেইসময় হাঁটতে শুরু করলে দেখা যাবে , সূর্যও আমাদের সঙ্গে চলেছে । চল্লিশ বছর আগে , আমি যখন গৃহস্থ ছিলাম , তখন একদিন সন্ধ্যেবেলা আমার মেজো ছেলেকে নিয়ে হাঁটছিলাম । তখন ওর বয়স মাত্র চার । হঠাৎ সে বলল , “ বাবা , চাঁদটা কেন আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে " ? তাহলে ব্যাপারটা দেখলেন তো ? চাঁদ আর সূর্য আকাশে স্থির হয়ে রয়েছে । তবু মনে হচ্ছে ওরা আমাদের সাথে সাথে চলেছে । একইভাবে লক্ষ্য করবেন , বিমান বা ট্রেনে চেপে কোথাও গেলে মনে হবে চাঁদ ও সূর্যও আমাদের সাথে চলেছে । ঠিক একইভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও আমাদের সাথেই নিয়ত বিরাজ করেন । অর্থাৎ যদিও তিনি বহু দূরে বিরাজমান , তবুও তিনি আমাদের খুব কাছেই রয়েছেন । অন্যভাবে বলা যায় , যদিও গোলোক বৃন্দাবনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সমাদের সাথে লীলাবিলাস উপভোগ করছেন , তবুও সেই সঙ্গে তিনি বিশ্বজগতের সর্বত্র বিরাজমান । অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একইসাথে " সচল এবং অচল " ।

          যদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে অথবা গোলোকধামে বিরাজ না করতেন , তাহলে তাঁর উদ্দেশ্যে ভক্তদের নিবেদিত ভোগ তিনি কেমন করে গ্রহণ করতেন ? এটা কখনই ভাববেন না যে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তবৃন্দের নিবেদন গ্রহণ করেন না । ভক্তিভরে যদি কেউ তাঁকে কিছু নিবেদন করেন , তবে তৎক্ষণাৎ তিনি দুই বাহু বাড়িয়ে তা গ্রহণ করেন । ভগবদ্গীতায় ( ১/২৬ ) শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন , তদহা ভক্ত্যুপহৃতমপ্লামি — অর্থাৎ “ ভক্তি সহকারে ভক্ত আমাকে পত্র , পুষ্প , ফল ও জল অর্পণ করলে আমি তা গ্রহণ করি । ” কেউ প্রশ্ন করতে পারেন , “ শ্রীকৃষ্ণ তো বহুদূরে গোলোক বৃন্দাবনে রয়েছেন । তাহলে কিভাবে তিনি আপনার নৈবেদ্য গ্রহণ করেন ? " উত্তর হল , অবশ্যই তিনি তা গ্রহণ করেন । তিনি তা আহারও করেন তবে অবশ্যই যেন সেটি প্রেমভক্তি সহকারে নিবেদন করা হয় ।

          এর থেকে সহজেই বোঝা যায় , ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সর্বত্র বিরাজমান । তিনি যে কোনও সময়ে যে কোনও স্থানে প্রকাশিত হতে পারেন , কিন্তু তাঁকে আহ্বান করার মতন যোগ্যতা অবশ্যই আপনার থাকতে হবে । যদি আপনি প্রকৃতই একজন ভক্ত হন , তবে যেকোন মুহূর্তে আপনাকে রক্ষা করার জন্য শ্রীভগবান প্রকাশিত হতে পারেন । যেমনটি হয়েছিল প্রহ্লাদ মহারাজের ক্ষেত্রে । দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু তার পুত্র ভগবানের পরম ভক্ত প্রহ্লাদকে তাচ্ছিল্যের সাথে বলেছিল , “ কোথায় তোমার ভগবান ? তুমি বলছ , ভগবান সবখানেই আছে । তাহলে আমার প্রাসাদের এই স্তম্ভের মধ্যেও আছে কি ? তুমি মনে করছ যে তোমার ভগবান ওখানে আছে ? বেশ , তবে আমি তাকে এখন বধ করব । ” তঙ্কুনি হিরণ্যকশিপু প্রাসাদের স্তম্ভটি ভেঙে ফেলছিল । আর তখনই স্তম্ভ থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্ধেক নর এবং অর্ধেক সিংহ অর্থাৎ নৃসিংহ রূপে বেরিয়ে এসে দৈত্য হিরণ্যকশিপুকে বধ করেছিলেন । শ্রীকৃষ্ণ এরকমই ।

          অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেকোনও স্থানেই আবির্ভূত হতে পারেন । কারণ তিনি সর্বত্র বিরাজ করেন । ঈশোপনিষদে এটিই বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে । : তদম্ভবসা সর্বসা তদু সর্বস্যাস্য বাহ্যতঃ— ' “ পরমেশ্বর ভগবান সবকিছুরই অন্তরে রয়েছেন । তবুও তিনি সবকিছুর বাইরে বিরাজ করছেন ” । এই বৈদিক মন্ত্রটি থেকে প্রমাণিত হয় যে , শ্রীভগবান সর্বত্রই বিরাজমান । বেদে যা কিছু বলা হয়েছে তা সবই বাস্তব সত্য । স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলে বেদকে গ্রহণ না করলে কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদন করা সম্ভব হবে না । যেমন গণিত শাস্ত্রেও অনেক স্বতঃসিদ্ধ সত্য রয়েছে একটি বিন্দুর কোনও দৈর্ঘ্য বা গ্রন্থ থাকে । না , পরস্পর সমধর্মী দুটি বস্তুর একটি অন্যটির সমান হয় ইত্যাদি । এই গুলো হল সিদ্ধ সত্য । গণিত শিখতে হলে এগুলোকে আমাদের মেনে নিতে হবে । সেরকমই বৈদিক শাস্ত্রে ও কিছু স্বতঃসিদ্ধ সতা রয়েছে । পারমার্থিক উন্নতি লাভ করতে হলে আমাদের বৈদিক শাস্ত্রের স্বতঃসিদ্ধ সত্যগুলোকে মেনে নিতে হবে।

          কখনও কখনও বেদে দেখা যায় কিছু পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব রয়েছে । তা সত্ত্বেও বৈদিক অনুশাসন আমাদের মেনে নিতে হয় । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় , বৈদিক অনুশাসন মেনে আপনি প্রাণীর অস্থি স্পর্শ করলে অশুদ্ধ হয়ে যাবেন । তাই তৎক্ষণাৎ আপনাকে স্নান করতে হবে । এখন শঙ্খ একটি প্রাণীর অস্থি । কিন্তু ঠাকুর ঘরে তা ব্যবহার করা হয় । আপনি এখানে কোন তর্ক করতে পারবেন না । আপনাকে মেনে নিতেই হবে যে প্রাণীর অস্থি অশুদ্ধ হলেও শব্দ শুদ্ধ । যার ফলে এটি ঠাকুর ঘরে রাখা চলে ।

          ঠিক এভাবেই আপনাকে পারমার্থিক গুরুদেবের নির্দেশ স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নিতে হবে । সেখানে কোন তর্ক বিতর্ক চলতে পারে না । তাহলেই আপনার পারমার্থিক উন্নতি সম্ভব । আপনার কাছে বোধগম্য নয় এমন বিষয়ও আপনাকে মানতে হবে । নইলে আপনি ব্যর্থ হবেন । অর্থাৎ বৈদিক অনুশাসন ও পারমার্থিক গুরুর আদেশ আপনাকে স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলেই মানতে হবে । এটা কোনও গোঁড়ামি নয় । আমাদের পূর্বতন পারমার্থিক গুরুবর্গও এই নীতি মেনে চলেছিলেন । আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল গুরুদেবের সাথে তর্ক করে আপনি কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবেন না । কারণ তর্ক বিতর্ক চলতেই থাকে । তা থেকে কোনও সিদ্ধান্তে আসা যায় না । তাই এটি কোনও পদ্ধতিই নয় ।

          মহাভারতে বলা হয়েছে , তর্কোহপ্রতিষ্ঠঃ শ্ৰুতয়ো বিভিন্না— শুধুমাত্র তর্ক বিতর্ক করে কোন সুদৃঢ় সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না । বিভিন্ন দেশ আর পরিস্থিতিতে শাস্ত্র ভেদও বিভিন্ন । নাসাবৃষির্যস্যমতং ন ভিন্নম্ – দার্শনিক তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে বলা যায় – কোনও এক দার্শনিক একরকম তত্ত্ব উপস্থাপন করলেন আবার আরেকজন দার্শনিক আরেক রকম তত্ত্ব উপস্থাপন করলেন । এইভাবে বিভিন্ন তত্ত্ব কথার মধ্যে সব সময়ই পারস্পরিক বিরোধিতা তৈরি হয় । এক দার্শনিককে পরাজিত না করে আরেকজন বিখ্যাত হতে পারেন না । এটাই দর্শনের নিয়ম । তাহলে মানুষ কিভাবে দার্শনিক সত্যের চরম সিদ্ধান্ত শিখবে ? এইজন্য বলা হয় । ধর্মস্য তত্ত্বৎ নিহিতং গুহায়া । অর্থাৎ ধর্ম সম্বন্ধীয় প্রক্রিয়ার প্রকৃত গূঢ় তত্ত্ব রয়েছে কেবলমাত্র আত্মজ্ঞান সম্পন্ন শুদ্ধাত্মা মানুষের অন্তরে । তাহলে কিভাবে সেটি উপলব্ধি করা যাবে ? মহাজনো যেন গতঃ সপছাঃ – অর্থাৎ মহান পারমার্থিক ব্যক্তিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে । এইজন্য আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবকে অনুসরণ করার চেষ্টা করছি । এজন্য আপনাকেও বৈদিক শাস্ত্রের অনুশাসন ও সদগুরুর নির্দেশ মেনে চলতে হবে । তবেই আপনার সার্থকতা সুনিশ্চিত হবে ।

    এর পরবর্তী পৃষ্ঠা

  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।