শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতার জ্ঞান বুঝতে হলে গীতা পাঠকের যে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

  • হরেকৃষ্ণ।
    শ্রীল প্রভুপাদ রচিত -

    পূর্ববর্তী পৃষ্ঠা'র পর -

    পক্ষান্তরে তিনি বলেছেন যে, সব সময় সকল কর্মের মাঝে তাঁকে স্মরণ করে, (মামনুস্মর) তাঁর পাদপদ্মে মন ও বুদ্ধি অর্পণ করে কর্তব্যকর্ম করে যেতে। দৈনন্দিন জীবনে জীবন-সংগ্রামের সময় যদি শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ না করা যায়, তবে মৃত্যুর মুহূর্তে তাঁকে স্মরণ করা সম্ভব হবে না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও এই উপদেশ দিয়ে গেছেন। তিনি বলে গেছেন যে, কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ— সর্বক্ষণ ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তনের অভ্যাস করা উচিত। ভগবানের নাম তাঁর রূপের থেকে ভিন্ন নয়; তাই যখন আমরা তাঁর নাম কীর্তন করি, তখন আমরা তাঁর পবিত্র সান্নিধ্য লাভ করে থাকি। তাই অর্জুনের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ, “সব সময় আমাকে স্মরণ কর” এবং এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ “সর্বদাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম কীর্তন কর” –এই দুটি একই উপদেশ। ভগবানের দিব্য রূপকে স্মরণ করা এবং তাঁর দিব্য নামের কীর্তন করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অপ্রাকৃত স্তরে নাম ও রূপ অভিন্ন। তাই আমাদের সর্বক্ষণ চব্বিশ ঘন্টাই ভগবানকে স্মরণ করার অভ্যাস করতে হবে। তাঁর পবিত্র নাম কীর্তন করে আমাদের জীবনের কার্যকলাপ এমনভাবে চালিত করতে হবে যাতে আমরা সর্বদাই তাঁকে স্মরণ করতে পারি।

    এটা কিভাবে সম্ভব? এই প্রসঙ্গে উদাহরণস্বরূপ আচার্যরা বলেন যে, যখন কোন বিবাহিতা স্ত্রীলোক পর-পুরুষে আসক্ত হয় কিংবা কোন পুরুষ পরস্ত্রীতে আকৃষ্ট হয়, তখন সেই আসক্তি অত্যন্ত প্রবল হয়। তখন সে সারাক্ষণ উৎকন্ঠিত হয়ে থাকে কিভাবে, কখন সে তার প্রেমিকের সাথে মিলিত হবে, এমন কি যখন তার গৃহকর্মে সে ব্যস্ত থাকে, তখনও তার মন প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হবার আশায় আকুল হয়ে থাকে। সে তখন অতি নিপুণতার সঙ্গে তার গৃহকর্ম সমাধা করে, যাতে তার স্বামী তাকে তার আসক্তির জন্য কোন রকম সন্দেহ না করে। ঠিক তেমনই, আমাদের সর্বক্ষণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাবনায় মগ্ন থাকতে হবে এবং সুষ্ঠুভাবে আমাদের সমস্ত কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করতে হবে। এই জন্য ভগবানের প্রতি গভীর অনুরাগের একান্ত প্রয়োজন। ভগবানের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকলেই মানুষ জাগতিক কর্তব্যগুলি সম্পাদন করার সময়েও তাঁকে বিস্মৃত হয় না। তাই আমাদের চেষ্টা করতে হবে যাতে ভগবানের প্রতি এই গভীর ভালোবাসা আমাদের অন্তরে জাগিয়ে তুলতে পারি। অর্জুন যেমন সব সময়ই ভগবানের কথা চিন্তা করতেন, আমাদেরও তেমন ভগবানের চিন্তায় মগ্ন থাকা উচিত। অর্জুন ছিলেন ভগবানের নিত্যসঙ্গী এবং তিনি ছিলেন যোদ্ধা। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে যুদ্ধ করা থেকে বিরত হয়ে বনে গিয়ে ধ্যান করতে উপদেশ দেননি। যোগ সম্বন্ধে যখন তিনি বিশদ ব্যাখ্যা করে অর্জুনকে শোনান, তখন অর্জুন তাঁকে স্পষ্ট বলেন যে, তা অনুশীলন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। অর্জুন বলেছিলেন—

    যোহয়ং যোগোস্ত্বয়া প্রোক্তঃ সাম্যেন মধুসূদন ৷
    এতস্যাহং ন পশ্যামি চঞ্চলত্বাৎ স্থিতিং স্থিরাম্ ॥

    “হে মধুসূদন! যোগ সম্বন্ধে তুমি আমাকে যা বললে তা থেকে আমি বুঝতে পারছি যে, এর অনুশীলন করা আমার পক্ষে অসম্ভব ও অসহনীয়, কারণ আমার মন অত্যন্ত চঞ্চল ও অস্থির।” (ভঃ গীঃ ৬/৩৩)

    কিন্তু ভগবান তখন তাঁকে বলেছিলেন,--

    যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্ গতেনান্তরাত্মনা ৷
    শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ ॥

    “যোগীদের মধ্যে যে গভীর শ্রদ্ধা সহকারে মদ্গতচিত্তে নিজের অন্তরাত্মায় আমাকে চিন্তা করে এবং আমার অপ্রাকৃত সেবায় নিয়োজিত থাকে, সে-ই যোগসাধনায় অন্তরঙ্গভাবে আমার সঙ্গে যুক্ত এবং সেই হচ্ছে যোগীশ্রেষ্ঠ এবং সেটিই আমার অভিমত ।” (ভঃ গীঃ ৬/৪৭) সুতরাং যিনি সব সময় ভগবদ্ভাবনায় মগ্ন, তিনিই হচ্ছেন যোগীশ্রেষ্ঠ, তিনি হচ্ছেন পরম জ্ঞানী এবং তিনিই হচ্ছেন শুদ্ধ ভক্ত। ভগবান অর্জুনকে আরও বলেছেন যে, ক্ষত্রিয় হবার ফলে তাঁকে যুদ্ধ করতেই হবে, কিন্তু তিনি যদি শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে যুদ্ধ করেন, তবে সেই যুদ্ধে জয়লাভ তো হবেই, উপরন্তু অন্তকালে তিনি শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে সমর্থ হবেন। এভাবে আমরা দেখতে পাই, যিনি ভগবানের কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন, তিনিই পারেন ভগবানের কৃপা লাভ করতে।

    আমরা সাধারণত আমাদের দেহ দিয়ে কাজ করি না, মন ও বুদ্ধি দিয়ে কাজ করি। তাই, যদি মন ও বুদ্ধি ভগবানের ভাবনায় মগ্ন থাকে, তা হলে ইন্দ্রিয়গুলি আপনা থেকে ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হয়ে যায়। তখন আপাতদৃষ্টিতে ইন্দ্রের কর্মগুলি অপরিবর্তিত থেকে যায়, কিন্তু মনোবৃত্তির আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। ভগবদ্গীতা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে, কিভাবে মন ও বুদ্ধিকে ভগবানের ভাবনায় মগ্ন করতে হয়। এভাবে সর্বতোভাবে ভগবানের ভাবনায় মগ্ন হবার ফলেই আমরা ভগবানের আলয়ে প্রবেশ করবার যোগ্যতা অর্জন করি। মন যদি কৃষ্ণসেবায় নিযুক্ত হয়, তা হলে ইন্দ্রিয়গুলি আপনা থেকেই তাঁর সেবায় নিয়োজিত থাকে। এটিই হচ্ছে কৌশল এবং এটি ভগবদ্গীতা রহস্যও-- শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় সর্বতোভাবে নিমগ্ন থাকা।

    আধুনিক মানুষ চাঁদে পৌঁছানোর জন্য অনেক পরিশ্রম করে চলেছে, কিন্তু তার পারমার্থিক উন্নতির জন্য সে কোন রকম চেষ্টাই করেনি। পঞ্চাশ-ষাট বছরের অল্প আয়ু নিয়ে আমরা এখানে এসেছি, তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ভগবানকে স্মরণ করবার জন্য এই সময়টি পুরোপুরিভাবে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করা এবং তার পদ্ধতি হচ্ছে—

    শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবনম্ ।
    অর্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যমআত্মনিবেদনম্ ।। (শ্রীমদ্ভাগবত ৭/৫/২৩)

    ভক্তিযোগ সাধনের নয়টি প্রণালীর মধ্যে সবচেয়ে সহজ হচ্ছে শ্রবণম্ অর্থাৎ আত্মতত্ত্বজ্ঞ পুরুষের কাছে ভগবদ্গীতা শ্রবণ করা এবং এর ফলে মন ভগবান্মুখী হয়ে উঠবে। তখন পরমেশ্বর ভগবানকে স্মরণ করা সহজ হবে এবং এই জড় দেহ ত্যাগ করার পর চিন্ময় দেহ লাভ করে ভগবানের আলয়ে উন্নীত হয়ে আমরা ভগবানের সাহচর্য লাভ করতে সক্ষম হব।

    ভগবান আরও বলেছেন—

    অভ্যাসযোগযুক্তেন চেতসা নান্যগামিনা ।
    পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থানুচিন্তয়ন্ ॥

    “অভ্যাসের দ্বারা যে সর্বদা ভগবানরূপে আমার ধ্যানে মগ্ন, বিপথগামী না হয়ে যার মন সর্বদা আমাকে স্মরণ করে, হে পার্থ! সে নিঃসন্দেহে আমার কাছে ফিরে আসবে। ” (গীঃ ৮/৮)

    এই পদ্ধতি মোটেই কঠিন নয়। তবে আসল কথা হচ্ছে, এর অনুশীলনের শিক্ষা তাঁর কাছ থেকেই নিতে হবে, যিনি অভিজ্ঞ ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞ। তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুমেবাভিগচ্ছেৎ-- যিনি ইতিমধ্যেই অনুশীলনে প্রবৃত্ত হয়েছেন, তাঁর সমীপবর্তী হতে হবে। পরবর্তী পৃষ্ঠা
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    এ সময় যারা যারা আছেন বা ছিলেন। Website Tracking

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.