শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতার জ্ঞান বুঝতে হলে গীতা পাঠকের যে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

  • হরেকৃষ্ণ।
    শ্রীল প্রভুপাদ রচিত -

    পূর্ববর্তী পৃষ্ঠা'র পর -
    ভগবদ্ গীতায় ঈশ্বর, জীব, প্রকৃতি, কাল ও কর্ম- এই সব কিছুরই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই পাঁচটির মধ্যে ঈশ্বর, জীব, জড়া প্রকৃতি ও কাল হচ্ছে নিত্য। প্রকৃতির অভিপ্রকাশ অনিত্য হতে পারে, কিন্তু তা মিথ্যা নয়। কোন কোন দার্শনিক বলে থাকেন যে, জড়া প্রকৃতির প্রকাশ মিথ্যা, কিন্তু ভগবদ্ গীতার দর্শন বৈষ্ণব দর্শন তা স্বীকার করে না। প্রকৃতির প্রকাশ যদিও সাময়িক, তবুও তা সত্য। তাকে আকাশে ভাসমান মেঘ অথবা শস্যের পুষ্টি সাধনকারী বর্ষা ঋতুর সঙ্গে তুলনা করা চলে। যখন বর্ষা ঋতু শেষ হয়ে যায় এবং মেঘে ভেসে চলে যায়, তখন সমস্ত শস্যকণা যা বৃষ্টির ফলে পুষ্ট হয়েছিল, তা শুকিয়ে যায়। তেমনই কোনো এক সময়ে এই জগতের প্রকাশ হয়, কিছুকালের জন্য তার স্থিতি হয় এবং তারপর তা অন্তর্হিত হয়ে যায়। প্রকৃতি এভাবে কাজ করে চলে। এভাবে অনন্তকাল ধরে প্রকৃতির প্রকাশ, স্থিতি ও অন্তর্ধান হয়ে চলেছে ।

    তাই প্রকৃতি নিত্য, প্রকৃতি মিথ্যা নয়। ভগবান তাই একে বলেছেন, “আমার প্রকৃতি।” এই জড়া প্রকৃতি হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের ভিন্না প্রকৃতি। তেমনই জীবও হচ্ছে ভগবানের শক্তি, তবে তারা বিচ্ছিন্ন নয়, ভগবানের সঙ্গে নিত্য সম্পর্কযুক্ত। তাই ঈশ্বর, জীব, জড়া প্রকৃতি ও কাল একে অপরের সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং সকলেই নিত্য। কিন্তু অন্য বিষয় কর্ম নিত্য নয়। বস্তুত কর্মের ফল অতি প্রাচীন হতে পারে। স্মরণাতীত কাল থেকে কর্মের ফলস্বরূপ আমরা সুখ অথবা দুঃখ ভোগ করছি। কিন্তু আমরা আমাদের কর্ম ফলকে পরিবর্তিত করতে পারি এবং এই পরিবর্তন নির্ভর করে আমাদের জ্ঞানের পূর্ণতার উপর। আমরা নানা রকমের কর্ম সম্পাদন করি। নিঃসন্দেহে আমরা জানিনা, কোন্ কর্ম আমাদের করা উচিত এবং কোন্ কর্ম করা উচিত নয়। বিশেষ করে আমরা জানি না, কোন্ কর্ম করলে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায়। ভগবদ্ গীতায় ভগবান তার ব্যাখ্যা করে আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন কোন্ কর্ম করা আমাদের কর্তব্য।

    ঈশ্বর হচ্ছেন পরম চেতনার উৎস। জীব ঈশ্বরের অপরিহার্য অংশ, তাই সেও চেতন। জীব ও জড়া প্রকৃতি উভয়কেই প্রকৃতি বা ভগবানের শক্তি বলা হয়। কিন্তু তার মধ্যে জীবই কেবল চেতন- জড়া প্রকৃতি অচেতন। সেটি হচ্ছে পার্থক্য। তাই জীব-প্রকৃতিকে উৎকৃষ্টতর প্রকৃতি বলা হয়, কেননা জীব ভগবানের মতো চৈতন্যময়। ঈশ্বর কিন্তু পরম চৈতন্যময়, কেউ যদি বলে যে, জীবও পরম চৈতন্যময়, তবে তা ভুল হবে। জীব কোন অবস্থাতেই সমস্ত চেতনার উৎস হতে পারে না। জীব তার সিদ্ধিলাভের কোন অবস্থাতেই পরম চৈতন্যময় হতে পারে না, এবং জীব তা হতে পারে কোন মতবাদে যদি বলে, তবে সেটি বিভ্রান্তিকর মতবাদ। সে চৈতন্যময় বটে, কিন্তু পরম চৈতন্যময় নয়। জীব ও ঈশ্বরের পার্থক্য গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, জীবের মত ভগবানও ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ চেতন, তবে জীব কেবল তার নিজের দেহটি সম্বন্ধে সচেতন, কিন্তু ভগবান সমস্ত দেহ সম্বন্ধে সচেতন। যেহেতু তিনি সকলের হৃদয়ে অবস্থান করেন তাই তিনি সকলের অন্তরতম প্রদেশের কথা জানেন। এই কথা আমাদের ভুললে চলবে না। এই সম্বন্ধে আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, পরম পুরুষোত্তম ভগবান পরমাত্মা রূপে সর্বজীবের অন্তরে অধিষ্ঠিত এবং জীবের বাসনা অনুসারে তিনিই তাদের পরিচালিত করেন। মোহাচ্ছন্ন হয়ে জীব তার কর্তব্যকর্ম ভুলে যায়। প্রথমত তার স্বাধীন ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে সে কোন কিছু করার সংকল্প করে, এবং তারপর সে নিজের কর্মের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সে এক দেহ পরিত্যাগ করে আরেক দেহ ধারণ করে- যেমন আমরা পুরাতন কাপড় ফেলে দিয়ে নতুন কাপড় পড়ি এভাবে পূর্বকৃত কর্মের ফলস্বরূপ আত্মা এক দেহ থেকে আর এক দেহে দেহান্তরিত হয় এবং তার বিগত কর্ম অনুসারে সে নানা রকম কষ্ট পায়। কিন্তু জীব যখন সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রকৃতিস্থ হয় এবং তার কর্তব্যকর্ম সম্বন্ধে সচেতন হয়, তখনই সে তার পূর্বকৃত কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়। তখন আর তাকে তার পূর্বকৃত কর্মের ফল ভোগ করতে হয় না। এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, কর্ম নিত্য নয়। তাই ভগবদ্ গীতায় বলা হয়েছে ঈশ্বর, জীব, প্রকৃতি ও কাল হচ্ছে নিত্য, কিন্তু কর্ম অনিত্য।

    পরম চৈতন্যময় ঈশ্বর ও জীব গুণগতভাবে এক। ঈশ্বরের পরম চৈতন্য এবং জীবের অণুচেতনা, উভয়েই অপ্রাকৃত। এমন নয় যে, জড় বস্তুর স্পর্শে আসার ফলে জীবের চেতনার বিকাশ হয়। এই ধারণাটি ভ্রান্ত। কোন বিশেষ প্রাকৃতিক পরিবেশে জড়ের মধ্য থেকে চেতনের উদ্ভব হয়, সেই কথা গীতায় স্বীকার করা হয়নি। জড়া প্রকৃতির প্রভাবে চেতনার বিকৃত প্রতিফলন হতে পারে এবং তা হচ্ছে রঙিন কাঁচের মাধ্যমে প্রতিফলিত রঙিন আলোকের মতো। কিন্তু পরমেশ্বরের চেতনা কখনোই জড়া প্রকৃতির দ্বারা প্রভাবিত বা কলুষিত হয় না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ- “আমার দ্বারা পরিচালিত প্রকৃতি।” তিনি যখন এই জড় জগতে অবতরণ করেন, তখন তার চেতনা জড়া প্রকৃতির দ্বারা প্রভাবান্বিত হয় না। তাই যদি হতো, তবে তিনি পরম তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত ভগবদ্গীতার জ্ঞান দান করতে পারতেন না। জড়া প্রকৃতির দ্বারা চেতনা যতক্ষণ কলুষিত থাকে, ততক্ষণ অপ্রাকৃত জগৎ সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান ব্যক্ত করা যায় না। ভগবান পরম চৈতন্যময় এবং তিনি জড়া প্রকৃতির কলুষ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। তাই, অপ্রাকৃত জগতের পূর্ণ জ্ঞান কেবল তিনিই দান করতে পারেন। আমাদের চেতনা এখন জড়া প্রকৃতির প্রভাবে কলুষিত হয়ে আছে। তাই, ভগবত গীতার মাধ্যমে ভগবান আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন কিভাবে আমাদের চেতনা কলুষমুক্ত হয়ে পবিত্র হলে আমাদের অন্তর ভগবন্মুখী হয়ে ওঠে এবং তখন আমাদের সমস্ত কর্তব্যকর্মই ভগবানের ইচ্ছানুসারে সাধিত হয়, ফলে আমরা সুখী হতে পারি। এমন নয় যে, কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে হলে আমাদের সমস্ত কর্তব্যকর্ম ত্যাগ করতে হবে। কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হবার উপায় হচ্ছে কর্তব্যকর্মকে পবিত্র করা। এই পবিত্র কর্মেরই নাম ভক্তি। ভক্তির বশবর্তী হয়ে যে কর্ম করা হয়, আপাতদৃষ্টিতে তাকে সাধারণ কর্ম বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এই কর্মকে কোনরকম কলুষতা স্পর্শ করতে পারে না। ভগবানের ভক্তকে দেখে একজন মূর্খ লোক মনে করতে পারে যে, তিনি সাধারণ মানুষের মতোই কাজ করে চলেছেন, কিন্তু সেটি তার নির্বুদ্ধিতা। সে বুঝতে পারে যে, ভগদ্ভক্ত অথবা ভগবানের কার্যকলাপ অপবিত্র চেতনা বা জড়ের দ্বারা কলুষিত হয় না। সেই সমস্ত ত্রিগুণাতীত। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে, আমাদের চেতনা এখন কলুষিত এবং তাই ভক্তিযোগ সাধন করার মাধ্যমে আমাদের চেতনাকে কলুষমুক্ত করতে হবে। পরবর্তী পৃষ্ঠা
  • Add_6

    * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.