শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতার জ্ঞান বুঝতে হলে গীতা পাঠকের যে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

  • হরেকৃষ্ণ।
    শ্রীল প্রভুপাদ রচিত -

    পূর্ববর্তী পৃষ্ঠা'র পর -

    মনের কাজই হচ্ছে সর্বদা এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ানো, তাই অভ্যাস করতে হবে মনকে একাগ্র করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম ও রূপে নিবদ্ধ করতে। মন স্বভাবতই চঞ্চল, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের নামের শব্দতরঙ্গে একে স্থির করা যায়। এভাবে পরব্যোমে চিন্ময় জগতে পরম পুরুষ ভগবানের ধ্যান করে তাঁর করুণা লাভ করা সম্ভব। ভগবদ্গীতায় চরম উপলব্ধির পন্থা ও উপায় বা পরম প্রাপ্তির কথা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এবং এই জ্ঞান-ভান্ডারের দ্বার সকলের জন্যই উন্মুক্ত হয়ে আছে। কাউকেই নিষিদ্ধ করা হয়নি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে সকল শ্রেণীর মানুষই তাঁর সমীপবর্তী হতে পারে, কেন না শ্রীকৃষ্ণের নাম শ্রবণ ও স্মরণ সকলের পক্ষেই সম্ভব।

    ভগবান আরও বলেছেন (ভঃ গীঃ ৯/৩২-৩৩)—
    মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যেহপি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ ।
    স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তেহপি যান্তি পরাং গতিম্ ॥
    কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রজর্ষয়স্তথা ।
    অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্ ॥

    এভাবে ভগবান বলেছেন যে, এমন কি বৈশ্য, পতিতা স্ত্রীলোক অথবা শূদ্র কিংবা নিম্নস্তরের মানুষেরাও পরম গতি লাভ করতে পারে। ভগবানের কৃপা লাভ করতে হলে যে উচ্চমানের বুদ্ধিমত্তা-সম্পন্ন হতে হবে, এমন কোন কথা নেই। আসল কথা হচ্ছে, যদি কেউ ভক্তিযোগের দ্বারা ভগবানের সেবায় ব্রতী হন এবং ভগবানকে জীবনের পরম আশ্রয় বলে মনে করেন, তবে তিনি অপ্রাকৃত জগতে উত্তীর্ণ হয়ে ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করতে সক্ষম হন। কেউ যদি ভগবদ্ গীতার উপদেশবাণীকে সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করে তার অনুশীলন করেন, তবে তিনি তাঁর জীবনকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে তুলতে পারেন এবং এই জড়া প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার ফলে যে সমস্ত জাগতিক সমস্যার উদ্ভব হয়, তার সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারেন। এই হচ্ছে ভগবদ্গীতার মূল কথা।

    উপসংহারে বলা যায়, ভগবদ্গীতা হচ্ছে এক অপ্রাকৃত সাহিত্য, যা অতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অধ্যায়ন করা উচিত। গীতাশাস্ত্রমিদং পুণ্যং যঃ পঠেৎ প্রযতঃ পুমান্-- ভগবদ্গীতার নির্দেশকে যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পারলে, অতি সহজেই সমস্ত ভয় ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এই জীবনে ভয় ও শোকাদি বর্জিত হয়ে পরবর্তী জীবনে চিন্ময় সত্তা অর্জন করা যায়। (গীতা-মাহাত্ম্য ১) আরও একটি সুবিধা হচ্ছে—

    গীতাধ্যায়্নশীলস্য প্রাণায়্মপরস্য চ ৷
    নৈব সন্তি হি পাপানি পূর্বজন্ম কৃতানি চ ॥

    “কেউ যদি আন্তরিকভাবে এবং অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ভগবদগীতা পাঠ করে, তা হলে ভগবানের করুণায় তার অতীতের সমস্ত পাপ কর্মের ফল তাকে প্রভাবিত করে না ৷” (গীতা-মাহাত্ম্য ২)

    ভগবদগীতার শেষ পর্যায়ে (১৮/৬৬) অতি উচ্চস্বরে ভগবান বলেছেন--
    সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
    অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥

    “সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। তুমি শোক করো না।” এভাবে ভগবানের পাদপদ্মে যিনি সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেন, ভগবান তাঁর সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সেই মানুষের সকল পাপকর্মের প্রতিক্রিয়া থেকে তাকে রক্ষা করেন।

    মলিনে মোচনাং পূংসাং জলস্নানং দিনে দিনে৷
    সকৃদ্ গীতামৃতস্নানং সংসার মলনাশনম্ ॥
    “প্রতিদিন জলে স্নান করে মানুষ নিজেকে পরিচ্ছন্ন করতে পারে, কিন্তু কেউ যদি ভগবদ্ গীতার গংগাজলে একটি বারও স্নান করে, তাহলে তার জড় জীবনের মলিনতা একেবারেই বিনষ্ট হয়ে যায়৷” (গীতা-মাহাত্ম্য ৩)

    গীতা সুগীতা কর্তব্যা কিমনৈঃ শাস্ত্রবিস্তরৈঃ৷
    যা স্বয়ং পদ্মনাভস্য মুখপদ্মাদ্ বিনিঃসৃতা॥
    যেহেতু ভগবদ্ গীতার বাণী স্বয়ং পরম পুরুষোত্তম ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী, তাই এই গ্রন্থ পাঠ করলে আর অন্য কোন বৈদিক সাহিত্য পড়বার দরকার হয় না৷ গভীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়মিতভাবে ভগবদ্ গীতা শ্রবণ ও কীর্তন করলে আমাদের অন্তর্নিহিত ভগবদ্ভক্তির স্বাভাবিক বিকাশ হয়৷ বর্তমান জগতে মানুষেরা নানা রকম কাজে এতই ব্যস্ত থাকে যে, তাদের পক্ষে সমস্ত বৈদিক সাহিত্য পাঠ করা সম্ভব নয়৷ সমস্ত বৈদিক সাহিত্য পড়বার প্রয়োজনও নেই৷ এই একটি গ্রন্থ ভগবদ্ গীতা পাঠ করলেই মানুষ সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের সারমর্ম উপলব্ধি করতে পারবে, কারণ ভগবদ্ গীতা হচ্ছে বেদের সার এবং এই গীতা স্বয়ং ভগবানের মুখনিঃসৃত উপদেশ বাণী৷ (গীতা-মাহাত্ম্য ৪)

    ভারতামৃতসর্বস্বং বিষ্ণুবক্ত্রাদ্ বিনিঃসৃতম্৷
    গীতাগঙ্গোদকং পীত্বা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে॥

    গঙ্গাজল পান করলে অবধারিত ভাবে মুক্তি পাওয়া যায়, আর যিনি ভগবদ্ গীতার পুণ্য পীযুষ পান করেছেন, তাঁর কথা আর কি বলবার আছে? ভগবদ্ গীতা হচ্ছে মহাভারতের অমৃত রস, যা আদিবিষ্ণু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলে গেছেন৷ ভগবদ্ গীতা পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত, আর গঙ্গা ভগবানের চরণপদ্ম থেকে উদ্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ ভগবানের মুখ ও পায়ের মধ্যে অবশ্য কোন পার্থক্য নেই৷ তবে আমাদের এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ভগবদ্ গীতার গুরুত্ব গঙ্গার চেয়েও বেশি৷ (গীতা-মাহাত্ম্য ৫)

    সর্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপালনন্দনঃ৷
    পার্থো বৎসঃ সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ॥

    এই গীতোপনিষদ্ ভগবদ্ গীতা সমস্ত উপনিষদের সারাতিসার এবং তা ঠিক একটি গাভীর মতো এবং রাখাল বালকরূপে প্রসিদ্ধ ভগবান শ্রীকৃষ্ণই এই গাভীকে দোহন করেছেন৷ অর্জুন যেন গোবৎসের মতো এবং জ্ঞানীগুণী ও শুদ্ধ ভক্তেরাই ভগবদ্ গীতার সেই অমৃতময় দুগ্ধ পান করে থাকেন৷ (গীতা-মাহাত্ম্য ৬)

    একং শাস্ত্রং দেবকীপুত্রগীতম্
    একো দেবো দেবকীপুত্র এব৷
    একো মন্ত্রস্তস্য নামানি যানি
    কর্মাপ্যেকং তস্য দেবস্য সেবা ॥

    বর্তমান জগতে মানুষ আকুল ভাবে আকাংক্ষা করছে একটি শাস্ত্রের, একক ভগবানের, একটি ধর্মের এবং একটি বৃত্তির৷ তাই, একং শাস্ত্রং দেবকীপুত্রগীতম্- সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য সেই একক শাস্ত্র হোক ভগবদ্ গীতা৷ একো দেবো দেবকীপুত্র এব- সমগ্র বিশ্বচরাচরের একক ভগবান হোন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ৷
    একো মন্ত্রস্তস্য নামানি- একক মন্ত্র, একক প্রার্থনা, একক স্তোত্র হোক তাঁর নাম কীর্তন-
    হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে৷
    হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥

    এবং কর্মাপ্যেকং তস্য দেবস্য সেবা- সমস্ত মানুষের একটিই বৃত্তি হোক- পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করা৷ প্রথম পৃষ্ঠা
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.