ভক্তসঙ্গে তীর্থ দর্শন, পূণ্যভূমী- তীর্থক্ষেত্র , গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রের মহিমা ও এসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ।

গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র গুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত, সেখানে কীভাবে যাবেন? তীর্থক্ষেত্র দর্শনে যেয়ে কোথায় থাকবেন, কি খাবেন ইত্যাদি বিষয়ে ভগবদ্ভক্তদের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ।

  • ভূমিকা

    শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হয়েও তাঁর নিজেরই ভক্তরূপে ৫২৪ বছর আগে পৃথিবীতে উপস্থিত হন , তখন প্রায়ই তিনি পুণ্যস্থানগুলিতে , অর্থাৎ তীর্থভ্রমণে যেতেন। তিনি কেবল দক্ষিণ ভারতেই পরিভ্রমণ করেছিলেন তা নয় , ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যধাম বৃন্দাবনেও তীর্থপরিক্রমা করেন। যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বৃন্দাবনধাম থেকে তীর্থভ্রমণ যাত্রা শুরু করেন , তখন মহাপ্রভুর যাত্রাপথ সুগম করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাজা প্রতাপরুদ্র তাঁর ভৃত্যবর্গ এবং সৈন্যদলকে আদেশ দিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন , যাতে পথিমধ্যে মহাপ্রভুর বিশ্রাম লাভের স্থানগুলিতে প্রত্যেক জায়গায় যেন বিশেষভাবে স্মৃতিচিহ্ন তথা স্মারক - মন্দির স্থাপন করা হয়ে থাকে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যেসব জায়গায় ক্ষণকালের জন্যও অবস্থান করছিলেন , সেই সমস্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ তীর্থস্থানগুলি কেউ দর্শন করলে প্রভূত কল্যাণ লাভ হয়ে থাকে।

    কোনও পুণ্যতীর্থের যোগ্যতাবলী

    কোনও জায়গা পুণ্যতীর্থ হয়ে ওঠার প্রধান যোগ্যতা হল এই যে , ভগবান কিংবা তাঁর শুদ্ধ ভক্ত সেখানে আবির্ভূত হয়েছিলেন অথবা সেখানে লীলাবিলাস করে গেছেন। ` গৌড়ীয় বৈষ্ণবজন তথা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুগামীদের কাছে , শ্রীবৃন্দাবন এবং শ্রীমায়াপুর হল প্রধান তীর্থক্ষেত্র। বর্তমান কলিযুগে পবিত্র তীর্থক্ষেত্রগুলি জড়জাগতিক অশুভ অপবিত্র শক্তিরাজির কবলিত হয়ে যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে বলে মনে হয় , তাই কখনও - বা এই সকল তীর্থস্থানের পবিত্রভাব উপলব্ধি করা বেশ কঠিন হয়ে ওঠে ।

        কোনও পুণ্যপবিত্র স্থান দর্শন করে আমরা যদি কিছু অর্জন করতে চাই , তা হলে যথার্থ পারমার্থিক মনোভাব এবং বিনয়নম্র শ্রদ্ধার মানসিকতা নিয়েই অবশ্য সেখানে আমাদের যেতে হবে।
       

    অনেকগুলি বিষয় মিললে তবে একটা তীর্থ হয়ে ওঠে:

    ১। সেই স্থানটিতে ভগবদ্ভক্তেরা অবশ্যই পারমার্থিক ক্রিয়াকর্মাদির অনুষ্ঠান করেছিলেন কিংবা করে থাকেন , আর সেই তীর্থস্থানে অবশ্যই সাধুসজ্জন ব্যক্তিরা দর্শন করতে আসেন। বাস্তবিকই , বৈদিক শাস্ত্রাদিতে বলা হয়েছে যে , কোনও মানুষ ইতিহাস - বিখ্যাত তীর্থস্থানগুলিতে গিয়ে যদি কেবল স্নান করেই চলে আসে , তবে সে গরু - গাধার চেয়ে ভাল কিছু নয়। তীর্থদর্শন বলতে বোঝায় — সেখানে উপস্থিত সাধুসজ্জনদের সঙ্গলাভ করা। চাণক্য পণ্ডিতও বলে গেছেন যে , সাধুসজ্জনবর্জিত কোনও জায়গা পরিহার করে চলতে হয়। আর , যে - জায়গায় কৃষ্ণকথা তথা ভগবৎ - বিষয়ক আলোচনা কিছুই হয় না এবং ভগবানের সেবা - ভক্তি অনুশীলনের আয়োজন যেখানে নেই , সেই জায়গাটি পবিত্র তীর্থভূমির মর্যাদা দাবি করতেই পারে না।

        ২। তীর্থ দর্শনের মাধ্যমে আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের সঞ্জীবনী অর্জনের অনুভূতি লাভ হওয়া চাই ; তীর্থভূমিতে সেই মর্যাদার প্রাধান্য থাকতে হবে — ভগবদ্ভক্তির অনুপ্রেরণার উৎসস্থল হতে হবে।
       

    তীর্থযাত্রার পথে বাধাবিঘ্ন

    কোনও বিশেষ পুণ্যস্থান দর্শন করতে না যাওয়ার কোনও কারণ থাকতে পারে কিনা , তাই নিয়ে অনেক সময় ভক্তরা চিন্তা - ভাবনা করে থাকে। অবশ্য , পর্যটনের ব্যাপারটা তো সব সময়ে নানা অসুবিধায় পূর্ণ থাকেই।

        একটা অসুবিধা হতে পারে — সেটা হল রাজনৈতিক ব্যাপার। পুণ্যস্থানগুলি হয়ত অকস্মাৎ রাজনৈতিক কারণে দেশ - বিভাজনের মধ্যে পড়ে যায় , যাতে সেই স্থান দর্শনে যাওয়া কষ্টকর , এমনকি অসম্ভব হয়ে উঠতেও পারে। এক সময়ে যেসব জায়গা ভারতবর্ষের অংশ ছিল , পরে পূর্বপাকিস্তানের অংশ হয়ে যায় , আবার পরে হয় বাংলাদেশ।

        দুই দেশের মধ্যে যদি রাজনৈতিক বিবাদ চলে , তাহলে আমরা তীর্থভ্রমণের নাম করেও সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে ঢুকতে পারি না। রাজনৈতিক দেশবিভাগের ফলে একটা তীর্থস্থান লুপ্ত হয়ে যেতেও পারে। গঙ্গানদীর গতি পরিবর্তনের ফলেও যেমন মহাপ্রভুর লীলাময় বিস্তীর্ণ অঞ্চল আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেছে।

        হয়ত বংশানুক্রমে আজ থেকে বহুদিন পরে ভগবান অথবা তাঁর শুদ্ধভক্তবৃন্দের কৃপায় সেইগুলির পুনরুদ্ধার হবে এবং তীর্থযাত্রীরা আত্মশুদ্ধির বাসনায় আবার তখন সেইসব স্থান দর্শন করতে পারবে।

        আরও একটি অসুবিধা হতে পারে — সেটি হল পরিভ্রমণের ব্যাপারে আমাদের নিজেদের কোনও অক্ষমতা। এছাড়া অন্য একটি ব্যাপার হল— তীর্থক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য নিজেদের যোগ্যতার বিষয়ে দ্বিধা - দ্বন্দ্বের মনোভাব। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তবৃন্দ কোনদিন গোবর্ধন পর্বতের মন্দিরগুলি দর্শন করতে যাননি , এবং শ্রীরাধাকুণ্ডের সরোবরে কোনদিন শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর স্নান করেছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নবদ্বীপ - অনুগামীদের কেউ কখনই শ্রীবৃন্দাবন তীর্থদর্শন করেননি।

        তীর্থদর্শন করতে গেলে যোগ্যতাবলী থাকা চাই। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁর রচিত ' নবদ্বীপ ভাবতরঙ্গ ' গ্রন্থে এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। ঈশোদ্যানের বর্ণনা দিয়ে সেটিকে তিনি ' ভগবানের উদ্যান ' বলেন , এবং তারপরে তিনি লিখেছিলেন যে , নবদ্বীপে কেউ যদি এই স্থানটি দেখতে আসে , তবে শুধুই কাঁটা ঝোপ দেখতে পাবে। তবু যাঁদের যোগ্য দৃষ্টিক্ষমতা আছে , তাঁরা সেখানে ভগবানের উদ্যানই দেখতে পাবে — যেমনটি তিনি বর্ণনা করে গেছেন , তেমনই। যথার্থ যোগ্য দৃষ্টি না থাকলে , বাস্তবিকই কোনও পুণ্যভূমি দর্শন হয় না।

        পুণ্যস্থানগুলিতে যেমন বাস্তবিকই জড়জাগতিক কিছু সমতা লক্ষ্য করা যেতেই পারে , তা ছাড়াও ভক্তিমূলক শাস্ত্রাদির মধ্য দিয়ে সেইগুলির যেমন বর্ণনা পাওয়া যায় , তার মধ্যেও একটা বৈধ্যতা অবশ্য লক্ষণীয়। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সময়ে , ভারতীয় লোকেরা একজন ব্রিটিশ অফিসারকে হত্যা করার ঘটনা নিয়ে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল এবং তার ফলে ইংরেজরা তাদের কামান - বন্দুক সব যেভাবে তাক করেছিল একটা মন্দির ধ্বংস করে দেবার মতলবে , তাই দেখে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর মন্তব্য করেছিলেন যে , ব্রিটিশরা যদিও মনে করেছিল , তারা শ্রীকৃষ্ণকে চূর্ণ - বিচূর্ণ করে দিয়েছে , তারা কিন্তু নিছক একটা মন্দিরকেই ধূলিসাৎ করে দিতে পেরেছিল।

        কোনও তীর্থ যদি এইভাবে আমাদের দৃষ্টিসীমা থেকে অন্তর্হিত হয়ে যায় , রাজনীতি কিংবা কালের কবলে পড়ে , তাহলে শ্রদ্ধাভরে শাস্ত্রাদি অধ্যয়নের মাধ্যমে — সেটি স্মরণের মাধ্যমে আবার দর্শন করতে পারি। কোনও শুদ্ধ ভক্তের কৃপাতেই একটা তীর্থস্থান আত্মপ্রকাশ করে এবং শ্রবণের মাধ্যমে সেই তীর্থদর্শন করা সম্ভব হতে পারে ।

        কোনও পুণ্যস্থানের সেবা করতে হলে সেখানকার ভক্তিমূলক কার্যসূচির মধ্যে অংশগ্রহণ করতে হয় — কেবল দর্শক হয়ে সেখান থেকে ঘুরে চলে এলেই লাভ হয় না — হয় শুধু পণ্ডশ্রম আর বৃথা ব্যয়। পুণ্যভূমির বিশেষ তাৎপর্য অনুধাবনের চেষ্টা করা চাই এবং তার পরে নবজীবন লাভের আকুলতা নিয়ে। সেই তাৎপর্য নিজের কাজে - কর্মে প্রতিফলিত করার জন্য উদ্যোগী হওয়া চাই।

        প্রত্যেকটি পবিত্র স্থানের একটা অন্তর্নিহিত বাস্তব সত্য স্বরূপ থাকে। সব সময়ে আমাদের তা বোঝবার মতো যোগ্যতা থাকেই না , —বিশেষ করে দর্শনীয় বস্তুগুলি দেখবার মন নিয়ে নিছক পর্যটনকারীদের মতো ঘুরপাক দিয়ে ফিরে আসতেই চাই।

        কোনও বিশেষ জায়গার মাহাত্ম্য সম্পর্কে আমরা যদি সেখানকার ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা বিচার করতে বাস্তবিকই উদ্যোগী হতে পারি , তাহলে যথার্থ জ্ঞানচক্ষু দিয়ে সবকিছু দেখতে শেখা চাই। যখন অর্জুন আর তাঁর ভাইদের ধনুর্বিদ্যা শেখানো হচ্ছিল , তখন শুধুমাত্র অর্জুনই লক্ষ্যস্থলের পাখিটির চোখটি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। শুধুমাত্র তিনিই লক্ষ্যভেদ করতে পেরেছিলেন।

        ঠিক তেমনই , যে কোনও স্থানের অন্তস্থলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করবার মতো শিক্ষা আমাদের আয়ত্ত করতে হবে এবং শুধুমাত্র বহিরাবরণগুলি দর্শন করলেই কাজ হবে না ; উৎকট ত্রুটি - বিচ্যুতি কিংবা অভাব - অভিযোগ নিয়ে মাথা ঘামিয়েও লাভ নেই। আমাদের শুধুমাত্র দেখতে হবে — সেখানে সাধুসজ্জন কারা আসছেন এবং কোন্ উদ্দেশ্যে তাঁরা পুণ্যভূমিতে এসে কালযাপন করছেন , সেই উদ্দেশ্যটিও মনেপ্রাণে অনুভব করবার প্রয়াস থাকা চাই। কোনও তীর্থভূমির পারমার্থিক মর্যাদার সারমর্ম বুঝতে হলে , সেখানকার শুদ্ধভক্তবৃন্দের নিষ্ঠা আর ভক্তিমূলক আচরণগুলি অনুধাবন করে , অন্য সব কিছু থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া চাই।

        এমন স্বচ্ছ দৃষ্টি না থাকলে , তীর্থভূমিতে আমরা রবাহূত অবাঞ্ছিত পর্যটকদের মতোই অপাংক্তেয় হয়ে ফিরে আসব - পুণ্য পবিত্রভূমির শ্রেষ্ঠতা আমাদের কাছে কোনদিনই উপলব্ধি হবে না ।

  • এরপর দেখতে পারেন => তীর্থস্থান একচক্রা অথবা তীর্থস্থান রাজাপুর
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.